নন্দগোপাল পাত্র: ‘.‌.‌.‌The time has come when badges of honour make our shame glaring in the incongruous context of humiliation.‌.‌.‌.‌.‌ compelled me to ask Your Excellency, with due reference and regret, to relieve me of my title of Knighthood, which I had the honour to accept from His Majesty the King at the hands of your predecessor, for whose nobleness of heart I still entertain great admiration.’ 

এই হল ইতিহাসখ্যাত নাইটহুড ত্যাগের সেই চিঠি (অংশ) যা কবিগুরু জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম গুলিচালনার পর ৩১ মে ১৯১৩ লিখেছিলেন সমসময়ের গভর্নর জেনারেল (১৯১৯–২১) লর্ড চেমসফোর্ডকে। 
১৯১৭ সালের ডিসেম্বরেই ব্রিটিশ সরকার একটা কমিটি গড়ে। কমিটির উদ্দেশ্য ছিল— ‘দ্য নেচার অ্যান্ড এক্সটেন্ট অব দ্য ক্রিমিন্যাল কন্সপিরেসি কানেকটেড উইথ দ্য রেভোলিউশনারি মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’। কমিটি গঠনের নোটিফিকেশনে এরকমই লেখা ছিল। সোজা কথায় ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রকৃতি আর অপরাধমূলক চক্রান্ত সম্পর্কে অবগত হওয়া। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন জাস্টিস সিডনি রাওলাট (১৮৬২–১৯৪৫)। আরও দুজন ব্রিটিশ, দুজন ভারতীয় সদস্য ছিলেন। মাত্র চার মাসের মধ্যেই জাস্টিস রাওলাট তৈরি করে ফেললেন রিপোর্ট। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯১৯ সালের ১০ মার্চ পাশ হয় রাওলাট আইন। ইংরেজরা কোনও কারণ না দেখিয়েই যে কোনও ভারতবাসীকে গ্রেপ্তার করতে পারত ওই আইনে।
১৬৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল খালসা প্রতিষ্ঠা করেন শিখ সম্প্রদায়ের দশম গুরু গোবিন্দ সিং। প্রতি বছর এই দিনটি সারা পাঞ্জাবে বৈশাখী অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির লাগোয়া জালিয়ানওয়ালাবাগে ওই বিশেষ দিনে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার মানুষকে ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে নেমে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। নেতৃত্বে রেজিনাল্ড ডায়ার (১৮৬৪-১৯২৭), পরে যিনি ‘বুচার অব অমৃতসর’ নামে পরিচিত হন। অমৃতসর ওই গণহত্যার খবর কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাইরের দুনিয়ায় প্রচারিত হয়নি সামরিক শাসনের বজ্র আঁটুনিতে। তবে পাঞ্জাবে নানা নৃশংসতার খবর মে মাসের গোড়াতেই দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ়ের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছয়। মে–‌র শেষে কবি অ্যান্ড্রুজ়কে পাঠালেন গান্ধীজির কাছে— পাঞ্জাবে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে। গান্ধীজি রাজি হলেন না, ‘I do not want to embarrass the government now.’ কবি নিজেই গেলেন চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে, প্রতিবাদ সভার কথা বলতে। সেখানেও আগ্রহের অভাব। কবি ঠিক করলেন, ‘আমার নিজের কথা নিজের মতো করে বলাই ভাল।’ ৩১ মে বড়লাট চেমসফোর্ডকে লিখলেন উপরের সেই চিঠি— ফিরিয়ে দিলেন নাইটহুড। ১৯১৫–‌য় পাওয়া খেতাব ফিরিয়ে দেওয়া দেখল সারা বিশ্ব। দেশের সামনের সারির নেতৃত্বদের যে প্রতিবাদ করার কথা, তা করে দেখালেন কবিগুরু।
গান্ধীজি পরে পাঞ্জাব গেলেন, তাঁর রাজনীতির মোড় ঘুরে গেল। বদলাল মতিলাল–জওহরলালের মতও। প্রমাণিত হল বাঙালিরাই গোটা ভারতে ভাবনায় এগিয়ে।
১৩ এপ্রিল গুলি চলেছিল প্রায় ১৬৫০ রাউন্ড। শাসকদের হিসেবে মৃত ৩৭৯, আহত ১০০০। কংগ্রেস নেতৃত্বের হিসেবে মৃত ও আহতের সংখ্যা হল যথাক্রমে ১৬০০ ও ১১০০। ওইদিন জালিয়ানওয়ালাবাগে উপস্থিত ছিলেন এক বাঙালি ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি। আদি নিবাস হুগলি–‌র দশঘরায়। ডাক্তারি সূত্রে থাকতেন এলাহাবাদে। শিক্ষাবিদ ও ভারতের কংগ্রেসের চার বারের সভাপতি (১৯০৯, ১৯১৩, ১৯১৯ ও ১৯৩২) মদনমোহন মালব্যর (১৮৬১–‌১৯৪৬) প্রিয়পাত্র ছিলেন। মদনমোহন মালব্য পার্টির কাজে ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখার্জিকে অমৃতসর পাঠান ১৯১০–‌এ। এরপর ডাক্তার মুখার্জি আর এলাহাবাদে ফেরেননি।
অভিশপ্ত ১৩ এপ্রিল, ডাক্তার মুখার্জি ঘটনাস্থলেই ছিলেন। বুলেট বৃষ্টির সময় মঞ্চের নীচে থাকায় প্রাণ বেঁচে যায়। জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। কবিগুরুর পর আর এক বাঙালি শোকস্তব্ধ ডাক্তার মুখার্জি মনস্থির করলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগে শহিদ হওয়া নারী–পুরুষের অম্লান স্মৃতিতে গড়ে তুলবেন একটি স্মৃতিসৌধ। তিনি জাতীয় কংগ্রেসকে স্থানটি অধিগ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। অন্যদিকে শহিদের রক্তে সিক্ত পুণ্যভূমিতে ব্রিটিশরা কাপড়ের মার্কেট করতে চেয়েছিল। নেমে পড়েছিল স্থানটি অধিগ্রহণ করতে, এই নৃশংস গণহত্যার প্রমাণ লোপ করার জন্য। ১৯২০ সালে কংগ্রেসের বৈঠকে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি পাশ হয়। সাড়ে ছয় একর জমিটির মালিক ছিলেন হিম্মত সিং। দাম ঠিক হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু অত টাকা আসবে কোথা থেকে! জমিটি কেনার জন্য, গান্ধীজি ভারতবাসীকে অর্থ দান করার জন্য আবেদন জানালেন। ডাক্তার মুখার্জি নিজে দরজায় দরজায় ঘুরে সংগ্রহ করলেন, প্রায় ৯ লাখ টাকা উঠল। ১৯২০ সালের ১ আগস্ট, ডাক্তার মুখার্জি নিলামে কিনে নিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের ‘পবিত্র ভূমি’। ১ মে ১৯৫১ গঠিত হল জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। যার প্রথম সম্পাদক হলেন ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখার্জি। চেয়ারম্যান হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। স্মৃতিসৌধের নকশা বানালেন আমেরিকার স্থপতি বেঞ্জামিন পোলক। ১৯৬১–‌এর ১৩ এপ্রিল, আর এক বৈশাখীর দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উপস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতি সৌধ উদ্বোধন করলেন। আজও ট্রাস্টের সম্পাদক আছেন বাংলার ডাক্তার মুখার্জি–‌র নাতি সুকুমার মুখার্জি। বাঙালির জাতীয়তাবাদ, বাংলার ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দশঘরা–‌র মুখার্জি পরিবার। এই ভোট মরশুমের ফাঁকে আসুন স্মরণ করি ভারতের ইতিহাস বদলে দেওয়া জালিয়ানওয়ালাবাগের শতবর্ষ, সেই সঙ্গে মুখার্জি পরিবারকে।‌‌‌‌‌

জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার ১০০ বছর পরেও ওই নির্মমতার জন্য লজ্জিত বা ক্ষমাপ্রার্থী নয় ব্রিটেন। তারা শুধুই দুঃখিত!‌ ১৯৯৭ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মারকের সামনে দঁাড়িয়ে দুঃখপ্রকাশই করেছিলেন। সম্প্রতি সেই মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। 

জনপ্রিয়

Back To Top