তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: নভেম্বরের ১৭ তারিখ ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর নেবেন। তার আগে তিনি ৫ বিচারপতি বেঞ্চের তরফে বাবরি মসজিদ মামলার রায় দিয়ে যাবেন। ১৮ নভেম্বর তাঁর জায়গায় ভারতের প্রধান বিচারপতি হবেন বিচারপতি বোবদে। বর্তমানে গগৈ–‌এর পর বোবদেই বিচারালয়ের প্রবীণতম সদস্য।
আজ থেকে ৮০০ বছর আগে। তখন বৌদ্ধ পাল বংশের পর সেন বংশ ক্ষমতায়। সেনরা আবার পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী। অর্থাৎ, সাদা কথায় তাঁরা হিন্দু।
এদিকে দিল্লির দিকে তখন ঘোর সুলতান শিহাবুদ্দিন ঘুরের ঘোর দৃষ্টি পড়েছে। দিল্লি তাঁর চাই–‌ই। শিহাবুদ্দিন ঘুরি তরাইন–‌এর প্রান্তরে দিল্লিশ্বর পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে যুদ্ধে হেরে গিয়েও হাল ছেড়ে দেননি। পরের বছরই আবার আসেন। আরও বড় সৈন্যদল ও প্রচুর অস্ত্র নিয়ে। এবার পৃথ্বীরাজ পারলেন না। কারণ ভারতের অন্য কোনও রাজা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন না। এসব দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দশকের কথা। সেই শুরু হল ভারতে মুসলিম বিজয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়া থেকে শিহাবুদ্দিনের অন্যতম সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খলজি পাটলিপুত্র (‌বর্তমান পাটনা, একদা মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী)‌ পেরিয়ে সরাসরি চলে এলেন বাংলার রাজধানী গৌড়ে। মালদার গৌড়ে তিনি ঢুকতেই পারেননি। ইতিমধ্যে বংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী পাল বংশ শেষ হয়ে সেন–‌বর্মনদের রাজত্ব তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেন–‌বর্মনরা পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মে আস্থাশীল ছিলেন। এই আস্থা বল্লাল সেনের আমলে পুরোপুরি ব্রাহ্মণ্য ধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং বৌদ্ধ ধর্ম এদের বিন্দুমাত্র সাহায্য পায়নি। বরং পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অর্থাৎ বর্তমানে যা হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত, তারাই তাবৎ রাজানুগ্রহ পায়। বৌদ্ধরা হয় বঞ্চিত। এর ফলে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বৌদ্ধ ধর্মের যা খুদ–‌কুঁড়ো অবশিষ্ট ছিল, তাও বিনষ্ট হয়ে বসে।
অন্যদিকে, পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মই তখন পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় বলতে গেলে একমাত্র সাধারণে প্রচলিত ধর্ম। পৌরাণিক ধর্মাবলম্বী ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের দু’‌চোখে দেখতে পারত না। উঠতে ‌বসতে ‘‌পাষণ্ডী, কলুষিত–‌অন্তঃকরণ, উৎকোচজীবী, পরপাকান্নগ্রহণকারী’‌ বলে বৌদ্ধদের তারা গাল দিত। বলত বৌদ্ধদের সঙ্গে মিশলে হিন্দুদের নরকবাস হবে। হাজার ভাল কাজ করলেও একটি বৌদ্ধর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা ব্রাহ্মণের সর্বনাশ করে ছাড়ত। যদিও ইতিহাসে প্রমাণ নেই ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের কখনও মারধর করেছিল বলে। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ায় সেন রাজাদের পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্তে ঠেলে দিয়ে তুর্কি ইখতিয়ারউদ্দিন খলজি যখন একের পর এক হিন্দু রাজাকে শেষ করছেন, তখন দেখা গেল, বৌদ্ধদের অবশিষ্টাংশের সাহায্যও হিন্দুরা নিতে নারাজ। তখন পুরোপুরি ইসলামি আধিপত্য বাংলায় কায়েম হয়ে বসেছে।
ঠিক যেমন কনৌজরাজ জয়চন্দ্র ব্যক্তিগত রেষারেষির জন্য পৃথ্বীরাজের পাশে দাঁড়াননি, তেমনি বাংলায় পৌরাণিক ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টাও করেননি। ব্রাহ্মণ বৌদ্ধরা এক হয়ে দাঁড়ালে হয়তো পূর্ব ‌ভারতের ইতিহাস ঘুরে যেত। তা না হওয়ায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত বজায় ছিল ভারতে মুসলিম শাসন। ছয় শতাব্দী ভারত অধীনস্থ ছিল মুসলিমদের কাছে। তারপর এক শতাব্দীর সামান্য সময় মারাঠা, শিখ ও দেশি মুসলিম শাসকরা ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপ্ত ছিল। পারস্য সম্রাট নাদির শাহের ভারত আক্রমণের পর (‌১৭৩৯)‌ মুসলিমদের প্রধান শক্তি মুঘলরা একেবারেই হীনবল হয়ে পড়ে। এবং ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর শেষ মুঘল বাদশা ইংরেজদের অধীনন্থ হয়। ইংরেজরা তাঁকে (‌বাহাদুর শাহ–‌২)‌ বর্মায় (‌বর্তমানে মায়ানমারে)‌ শেষ জীবন পর্যন্ত বন্দি করে রাখে। 
কট্টর হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তার একনিষ্ঠ সেবকরা সেদিন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল। পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায় তাদের মনোমতো না হলে দেশ জুড়ে, বিশেষ করে, উত্তর ভারতে তাণ্ডব হওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ পাঁচ বিচারপতির হয়ে কী রায় দেবেন আর ক’‌দিন বাদে, গোটা দেশ সেদিকে অধীরভাবে তাকিয়ে।
মসজিদ ভাঙার আগে তদানীন্তন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাওকে যে মসজিদ ভাঙতে দেবেন না। কিন্তু মসজিদ গুঁড়ো গুঁড়ো করা হয়েছিল। আজ ২৭ বছর বাদে আবার বিজেপি–‌র মুখ্যমন্ত্রী ওই আসনেই বসে আছেন। প্রধান বিচারালয় রায়দানের আগে তিনি ‘‌দীপোৎসবে’র‌ প্রস্তুতি নিয়ে বর্তমানে ব্যস্ত। রায় যদি উল্টে যায় তাহলে কী করবেন?‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top