দীপেন্দু চৌধুরী: পুলওয়ামায় সিআরপিএফ বাহিনীর ওপর জঙ্গি হামলা এবং ৪০ জন জওয়ানের মৃত্যুর পর ভারতে অচেনা এক ‘জাতীয়তাবাদ’ সম্প্রতি জেগে উঠেছে। ভারত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হলে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু জাতীয়তাবাদের হুজুগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা?‌ পশ্চিমবঙ্গ নামক সহিষ্ণু এক জনপদ তাকেও রুখে দিতে জানে। আগলে রাখতে জানে সম্প্রীতিকে। আমাদের রবীন্দ্রনাথ–নজরুল–সুকান্তের বাংলা, আউল–বাউল, সুফি–সন্ন্যাসীর বাংলা, লালন সাঁইয়ের বাংলা ভয় পায় না। 
নদিয়ার তাহেরপুরে শাল বিক্রি করেন জাভেদ আহমেদ খান। জম্মু–কাশ্মীরের বদগামের বাসিন্দা জাভেদ। গত দশ বছর তিনি শাল বিক্রি করছেন ওই অঞ্চলে। ২০ ফেব্রুয়ারি উগ্র জাতীয়তাবাদের সমর্থক একদল যুবক জাভেদকে আক্রমণ করে। স্থানীয় কয়েকজন মানুষ প্রতিরোধে এগিয়ে এলেন। সম্প্রীতি এবং সংস্কৃতির চিরায়ত বাংলার, সহিষ্ণু বাংলার মানুষ তঁারা। এগিয়ে গেলেন। থানায় খবর দিলেন। পুলিস এসে উদ্ধার করল জাভেদ এবং তঁার তুতো ভাই মেহরাজউদ্দিনকে। এই ঘটনার পর জাভেদের বয়ান বাংলার মুখরক্ষা করেছে। জাভেদ বলেছেন, ‘‌পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ওপরে পূর্ণ আস্থা রয়েছে আমাদের’‌। পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার ঘটনা এটা। কিন্তু কলকাতা? সংস্কৃতির গর্ব করা কলকাতা। দু’দশকের বেশি এই শহরে আছেন এক কাশ্মীরি চিকিৎসক। পূর্ব কলকাতার বাসিন্দা সেই চিকিৎসককে ভারতের নব্য জাতীয়তাবাদের ঝান্ডাধারী কয়েকজন এসে বলল, ‘এটা আপনার দেশ নয়। চলে যান।’‌
প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, কটূক্তি শুনতে হল কলকাতা শহরের নাম করা এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে। কারণ, তিনি কাশ্মীরি। নদিয়ার তাহেরপুরের সঙ্গে কলকাতার ছবিটার অনেক মিল। ওই কাশ্মীরি ডাক্তারবাবুর পাশেও স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এসে দঁাড়ান। তার পরের বিদ্বেষ–হামলা তঁার মেয়েদের স্কুলে। অভিযোগ, কয়েকজন সহপাঠী তাদের পাশে বসতে অস্বীকার করে। শিশুমনে অপরিচিত এক সংস্কৃতির আচমকা ধাক্কা ওদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে, সামাজিক জীবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। 
অবিভক্ত বাংলা, অবিভক্ত ভারতের সময় থেকেই মুসলমান পিরের দরগায় সিন্নি চড়ানোটা ছিল নিয়মিত ঘটনা। কারখানার মুসলিম লেদ মিস্ত্রির উদযোগে বিশ্বকর্মা পুজো, সরস্বতী পুজোয় স্কুল–কলেজে মুসলিম ছাত্র–ছাত্রীদের অংশগ্রহণ— এগুলো ছিল স্বাভাবিক। সেই সামাজিক বন্ধনকে ভেঙে ফেলাটা বোধহয় এখন অনেক সহজ মনে হচ্ছে শাসকের কাছে। যদিও আশার আলোও আছে সেই অন্ধকারে। বর্তমান সময়ের হিংসা, ঘৃণার সীমান্তরেখা ভেঙে নতুন ভারতের জন্য তৈরি হচ্ছে এক নবীন সমাজ। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top