বাহারউদ্দিন: আফগানিস্তানে তালিবানি হামলার বিরতি নেই। বহু প্রদেশ তাদের দখলে। কাবুলও হামলার শিকার। আমেরিকা সেনা–প্রত্যাহার আর শান্তি–আলোচনা নিয়ে যত সরব হচ্ছে, ততই শক্তিপ্রদর্শনে মরিয়া হয়ে উঠছে সশস্ত্র, সন্ত্রাসবাদী তালিবান। 
সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চলের হেরাত প্রদেশে আচমকা হামলা চালিয়ে গেরিলারা সরকারপন্থী ১৪ মিলিশিয়াকে হত্যা করেছে। খবর জানিয়েছেন সরকারি মুখপাত্র আবদুল আহাদ ওয়ালিজাদা। হেরাত বরাবর তালিবানদের ঘঁাটি। ওসামা–বিন–লাদেন যখন মোল্লা ওমর শাসিত আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন, তখনই হেরাত, কান্দাহারে আল কায়দা আর তালিবানদের যৌথশক্তির বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে আল কায়দা গরহাজির। তাদের শূন্যতাকে পূরণ করছে পশ্চিম এশিয়া থেকে বিতাড়িত ইসলামি স্টেটের যোদ্ধারা।
আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফৌজ প্রত্যাহার প্রায় আসন্ন। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তালিবানদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা প্রায় সমাপ্তির পথে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই আমেরিকা স্তরে স্তরে সেনা–প্রত্যাহার শুরু করবে। মার্কিন সেনা সরানোর পর পরিস্থিতি কী দঁাড়াবে, বলা কঠিন। নির্বাচিত সরকারকে ইতিহাসের লাশ বানিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারে তালিবানরা। সোবিয়েত সেনা কাবুল থেকে সরে যাওয়ার পর একই ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ক্ষমতায় বসলেন মোল্লা ওমর। মার্কিন বিরোধী যুদ্ধ ও প্রচারে ঝঁাপিয়ে পড়ল আল কায়দাও। ভয়ঙ্কর আঘাত এল সভ্যতায়। বৌদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। আরোপিত কণ্ঠরোধের বাড়াবাড়িতে দেশ ছাড়লেন মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা। স্কুল–কলেজে নামল বোরখার মিছিল। বাধ্য হয়ে মোল্লা ওমর ও আল কায়দার যৌথশক্তিকে শায়েস্তা করতে ওয়াশিংটন বোমাবর্ষণ আরম্ভ করল, গত শতাব্দীর ’‌৯০–‌এর দশকে। শান্তি রক্ষার্থে বহুজাতিক সেনার দখলে চলে গেল গোটা দেশ। ভোটের নামে প্রহসন থেকে রেহাই পেল না আফগান মুলুক। ক্ষমতায় বসল আধুনিকতাপন্থী অভিজাত শ্রেণির সরকার। মন্দের ভাল। স্কুল–কলেজে, স্বাস্থ্য পরিষেবায়, ক্রীড়াঙ্গনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ল। রচিত হল এক ধরনের শান্তি কল্যাণের অভিমুখ। এবার ওয়াশিংটনের সেনা–প্রত্যাহারের পর আবার মধ্যযুগীয় বর্বরতা, আদিম নৃশংসতা উথলে উঠতে পারে। এটা শুধু আশঙ্কা নয়, অদূর ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্ন আর সবর্নাশের অপরিহার্য বাস্তব।
 তালিবানরা যথা সম্ভব দ্রুত মার্কিন সেনার অপসারণ দাবি করছে। বিভিন্ন উপজাতি আর গোষ্ঠীতে বিভাজিত শক্তি তাদের মতবিরোধকে আপাত স্তিমিত রেখে গড়ে তুলেছে ঐক্য। ঐক্যের লক্ষ্য, বিদেশি ফৌজের প্রভাব থেকে বিমুক্ত, স্বাধীন সরকার আর নির্বাচিত সরকারের অবসান। এ কারণেই তালিবানরা পরপর আঘাত হেনে চাপ বাড়াচ্ছে। আমেরিকাও পূর্বতন সোবিয়েত রাশিয়ার মতো শক্তিক্ষয়, সেনাক্ষয়, অর্থক্ষয় থেকে অব্যাহতি চাইছে।
 ভয় হচ্ছে, ট্রাম্পের এই সুপরিকল্পিত, পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত বড় বিপদ ডেকে আনবে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলবে। পাকিস্তান চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয়। এখনকার আফগান প্রশাসন ইসলামাবাদের প্রভাবের বাইরে হলেও, বহুস্তরের পাক সংস্থা কাবুলে ভারতের অবস্থানকে রুখতে চায়। আফগান সরকারের পাশে রয়েছে দিল্লি। কোনও কোনও এলাকায় বিনিয়োগও করেছে। ওয়াশিংটন এ কারণেই তার সেনা প্রত্যাহারের পরবর্তী অধ্যায়ে পাকিস্তান ও ভারতের ওপর শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব অর্পণ করতে আগ্রহী। মার্কিন সেনা সরে যাওয়ার পর তারা অবধারিত শান্তিবৈঠকে পরস্পর বিরোধী দুদেশকেই শরিক করার চেষ্টা করবে। একসময় চীনকেও যুক্ত করতে চেয়েছিল। বেইজিং আগ্রহ দেখায়নি। চুপ করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। মার্কিন উপস্থিতির শূন্যতাকে চীন ভরাট করার কসরত দেখাবে না, এর গ্যারান্টি কোথায়?‌ কৌশল প্রিয় শক্তিধর দেশ। চীনকে বাদ দিয়ে, মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার বিপর্যস্ত, সন্ত্রাস কবলিত আফগান মুলুকে শান্তিস্থাপন অসম্ভব। শান্তির স্থিতি ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের অংশগ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনই চীনের সায় আর কূটনৈতিক সংযুক্তি দরকার। দরকার উপসাগরীয় ইরানের সাগ্রহ সম্মতি। তা না হলে, আবার মধ্যযুগের অন্ধকারে, তাণ্ডবের বিভীষিকায় কাবুলের প্রত্যার্বতন অনিবার্য হয়ে উঠবে। আবার চেপে বসবে সভ্যতাবিনাশী, ধ্বংসকামী উগ্রতা।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top