সুচিক্কণ দাস- জলশূন্য চেন্নাই এবার টনক নড়িয়ে দিয়েছে সারা দেশের। কারণ জলসঙ্কট প্রত্যন্ত গ্রাম ভারত থেকে এবছর উঠে এসে থাবা বসিয়েছে শহুরে ইন্ডিয়ায়। থাবা বসাবে ভবিষ্যতেও। ভূগর্ভস্থ জলাধারের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে বিপন্ন কৃষি। বিপন্ন গ্রাম ও নগরের পানীয় জলের সরবরাহ। শিল্পে জলের ব্যবহারে নিয়ম কি মানা হচ্ছে? স্পষ্ট উত্তর কারোর জানা নেই। এই পরিস্থিতিতে জল সঙ্কট নিরসনে কেন্দ্রের তরফে কি দরকার ছিল না ১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যানের? প্রধানমন্ত্রীর নতুন দফার মন কি বাত–এ তার ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া গেল না।
■ অচেনা চেন্নাই
৪০ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের শহরে জল নেই। শুকিয়ে গেছে শহরের চারটে জলাধার। হোটেলে জলের রেশন। বোর্ডার নেওয়া বন্ধ। ফিয়াট, ক্রাইসলার, টিসিএস, উইপ্রো, কগনিজ্যান্ট কর্মীদের ক্যান্টিন আর বিশ্রামগারে চলছে জলের রেশন। জিমের শাওয়ার বন্ধ। ধোয়ায় কম জল লাগে এমন থালাবাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। জল রেশন পাঁচতারা হোটেলে। জল রেশন হাইরাইজ আবাসনেও। শহরের নানা জায়গায় চড়া রোদ উপেক্ষা করে ট্যাঙ্কারের সামনে ভিড় মানুষের। দেশের দক্ষিণে এই শহরটার নাম চেন্নাই।
■  পিপাসার্ত বুলধানা
চোখ ফেরানো যাক দেশের পশ্চিমে। মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ এলাকা বিদর্ভের বুলধানা। স্থানীয়রা যতদূর মনে করতে পারছেন, এই অঞ্চলে শেষ বৃষ্টি হয়েছিল ২০১২ সালে। গত ৭ বছর বৃষ্টি নেই। এবছর খরায় দুঃসহ অবস্থা ‌চারপাশের প্রায় ৩০০ গ্রামের। শুধু গরিবেরা নয়, কাজের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়ে মুম্বই, পুনে, নাসিক, সুরাট এমনকী সুদূর ভদোদরাতেও পাড়ি জমিয়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা। কারণ বৃষ্টি নেই। নেই চাষবাস। কাজও নেই। থাকলেও মজুরি মাত্র ৬০ টাকা। তাই বাড়ছে ঘরছাড়াদের স্রোত। কোনওক্রমে সামান্য মজুরিতে শহরের ঝুপড়িতে মাথা গুঁজে দিন কাটছে একদা সম্পন্ন কৃষকদের। কাছাকাছি ব্রাহ্মণওয়াদা জলাধার শেষ ভর্তি হয়েছিল ২০০৬ সালে। এখন ফুটিফাটা। জলাভাবে পুনের বালেওয়াদির দশা মিনি বুলধানার মতো। একই দশা গণেশপুর  কিংবা আরও ৭০ কিলোমিটার দূরের চিচোলি গ্রামের। এটা খরার খণ্ডচিত্র মাত্র। 
■ বিধ্বস্ত কৃষি, ঘাতক সিলিকোসিস
দক্ষিণ থেকে এবার পশ্চিমে।  ৫৮ বছরের সুকিবাই। থাকেন রাজস্থানের কারউলি জেলার সাকুলপুর গ্রামে।  রোজ পরিবারের খাবার জল আনতে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় চার কিলোমিটার। একবার নয়, দিনে তিনবার। মানে দৈনিক ১২ কিলোমিটার। গ্রামের হ্যান্ডপাম্পে যে জল ওঠে তাতে বাসন ধোয়া যায়, গরু ধোয়া যায়, কিন্তু খাওয়া যায় না। টানা গরমে শুকিয়েছে পুকুর আর কুয়ো। জল নেই। চাষবাস নেই। গ্রামের ছেলেবুড়োরা কাজ করতে যাচ্ছে বালি তোলার কাজে। ঘরে ফিরছেন দুরারোগ্য সিলিকোসিস নিয়ে। রাজস্থান সরকারের ক্যাগ রিপোর্ট বলছে, ২০১৫–‌র জানুয়ারি থেকে ২০১৭–‌র ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিলিকোসিসে আক্রান্ত  ৮ হাজার জন। সুন্দরবনে বাঘের হানায় মৃত্যুতে যেমন তৈরি হয়েছে বিধবা গ্রাম, তেমনি বিধবা গ্রাম চালু হয়েছে রাজস্থানেও। এখানে ঘাতক বাঘ নয়, সিলিকোসিস। 
■ পাইপে বন্দি স্বপ্ন
দেশজুড়ে যখন তীব্রতম জলসঙ্কট, তখন পাইপে করে পরিস্রুত পানীয় জল সারা দেশের সব বাড়িতে পৌঁছে দিতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। লক্ষ্যমাত্রা ২০২৪ সাল। আগামী পাঁচ বছরে এই পরিকল্পনাতেই জোর দিচ্ছে মোদি সরকার। কিন্তু সব ছেড়ে জল নিয়ে কেন এত মাথাব্যথা কেন্দ্রীয় সরকারের? কারণ গত কয়েক দশকে ভারতের জলছবি কোন দুরবস্থায় পৌঁছেছে, তা ধরা পড়েছে কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স রিপোর্টে। রিপোর্টে ভয়ঙ্কর সব তথ্য সামনে আসতেই টনক নড়েছে কেন্দ্রের। 
কেন্দ্রের জল–আকাঙ্ক্ষা যাই থাক না কেন, বাস্তবে জলছবিটা একেবারে অন্যরকম। দেশের চার ভাগের তিন ভাগ পরিবারে এখনও পানীয় জল পৌঁছয়নি।  পাইপের জল পৌঁছয়নি প্রতি ছটি গ্রামীণ পরিবারের পাঁচটিতে। ভারতে পানীয় জলের ৮০% চাহিদা মেটানো হয় ভূগর্ভে সঞ্চিত জলভাণ্ডার থেকে। সেচের জন্য জলের দুই–তৃতীয়াংশ আসে একই উৎস থেকে। গত চার দশকে এদেশে যত সেচ প্রকল্প হয়েছে তার ৮৪ শতাংশে ব্যবহার করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার। এর জেরে গোটা দেশের ভূগর্ভস্থ জলের কুয়োর ৫৪ শতাংশের জলস্তর ক্রমশ নেমে গেছে।  এদেশে জলের মোট চাহিদার পাঁচ ভাগের চার ভাগই খরচ হয় কৃষিকাজে। জলের ভাণ্ডার কমতে থাকায় বাড়ছে কৃষি সঙ্কট। 
■  খরার পূর্ণগ্রাস
এবছর খরার পূর্ণচিত্রটা আরও ভয়ঙ্কর। এবার দেশের ৪৩.৪ শতাংশ এলাকা খরা কবলিত বলে জানিয়েছে ড্রাউট আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। সবচেয়ে বেশি খরা কবলিত মহারাষ্ট্র। খরার গ্রাসে রাজ্যের ৫০ শতাংশ এলাকা। কেন্দ্রীয় জল কমিশন জানাচ্ছে, প্রবল গরমে ও বর্ষা দেরিতে আসায় দেশের বড় ৯১টি জলাধারের জলস্তর নেমে গেছে মাত্র ২১ শতাংশে। অন্ধ্র, বিহার, গুজরাট, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, উত্তর পূর্বাঞ্চলের একাংশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু ও তেলেঙ্গানা খরায় বিধ্বস্ত। এসব রাজ্যের বাসিন্দা প্রায় ৫০ কোটি। অন্যভাবে বললে, দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই এবার খরার কবলে। 
এরই পাশাপাশি নজর দেওয়া যাক দেশের জল সঙ্কটের দিকে। এবিষয়ে কী বলছে সরকারি রিপোর্ট? গত বছর ১৪ জুন প্রকাশিত হয়েছিল কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স রিপোর্ট। তাতে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে ভারতে ২১টি শহরের ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার শুকিয়ে যাবে। এগুলির মধ্যে রয়েছে দিল্লি, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরুর মতো শহর। এবার গ্রীষ্মে সেই আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে জলশূন্য হয়েছে চেন্নাই। এখন দেশের মোট ৬০ কোটি মানুষ চরম জল সঙ্কটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পরিচ্ছন্ন পানীয় জল না পেয়ে বছরে মৃত্যু হচ্ছে ২ লক্ষ মানুষের। বড় শহরগুলি জলশূন্য হলে জলাভাবে ভুগতে হবে ১০ কোটি মানুষকে। ২০২৭ সালে জনসংখ্যায় চীনকে ছাপিয়ে যাবে ভারত। বাড়তি জনসংখ্যার কারণে বাড়বে জলের চাহিদা। কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স রিপোর্ট বলছে  ২০৩০ সালে এদেশের ৪০ শতাংশ মানু্ষ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। ২০৫০ সালে জোগানের তুলনায় চাহিদা বেড়ে জলসঙ্কট আরও তীব্র আকার নেবে। জলের জোগানে টান পড়লে কমবে চাষ। টান পড়বে খাদ্যভাণ্ডারে।
ইনডেক্স রিপোর্ট বলছে, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এদেশে ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমেছে ১০ থেকে ২৫ মিলিমিটার হারে। ১৯৭০ সালে খরিফ মরশুমে গড় বৃষ্টিপাত হত ১০৫০ মিলিমিটার। ২০১৫–‌য় তা কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে ১ হাজার মিলিমিটার। একইভাবে রবি চাষের মরশুমে ১৯৭০ সালে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১৫০ মিলিমিটার। ২০১৫–‌য় তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০০ মিলিমিটার। বর্ষার মরশুমে শুখা দিনের সংখ্যা ২০১৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। যদি এই প্রবণতা আটকানো না যায়, তাহলে নীতি আয়োগই বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমবে ৬ শতাংশ। নীতি আয়োগের রিপোর্টেই বলা হয়েেছ, ভারতের ৭০ শতাংশ জলভাণ্ডার অপরিচ্ছন্ন। ফলে, জলের গুণমানের বিচারে ভারতের স্থান সারা বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে ১২০ নম্বরে। 
■ এত বরাদ্দ, তবু...
জাতীয় গ্রামীণ পানীয় জল কর্মসূচিতে ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার বাজেটে বরাদ্দ করেছিল ৮৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ অর্থ খরচ হলেও পূরণ হয়নি লক্ষ্যমাত্রা। ২০১৮ সালের আগস্টে কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের রিপোর্ট বলছে, কথা ছিল এই প্রকল্পে দেশের সব গ্রামীণ বসতি এলাকায়, সরকারি স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে পৌঁছবে পরিস্রুত পানীয় জল। এর মধ্যে মাত্র ৪৪ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া গেছে। এখনও ১৫ শতাংশ সরকারি স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে পৌঁছয়নি পানীয় জল।  লক্ষ্য ছিল, ৫০ শতাংশ গ্রামীণ জনসংখ্যার কাছে পাইপ বাহিত হয়ে পৌঁছবে জনপিছু দৈনিক ৫৫ লিটার পরিস্রুত পানীয় জল। পাঁচ বছরে পৌঁছেছে মাত্র ১৮ শতাংশ পরিবারে। সরাসরি ৩৫ শতাংশ বাড়িতে কলের জল পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও পৌঁছেছে মাত্র ১৭ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারে। দেশে গ্রামীণ পরিবারের সংখ্যা ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন। এঁদের মধ্যে ৭৮ শতাংশের দিনে ৪০ লিটার জল পাওয়ার কথা।  গ্রামীণ পরিবারের ১৮ শতাংশ সদস্যই দিনে এখন ৪০ লিটারের কম জল পান বলে সংসদে জানিয়েছে সরকার।
 ■ নজর নেই বিকল্পে
ভারতে মোট চাষ হয় ১৪ কোটি হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে অতি ক্ষুদ্র সেচের আওতায় ৭ কোিট হেক্টর জমি আনতে পারে ভারত। অথচ এখন অতি ক্ষুদ্র সেচের আওতায় রয়েছে মাত্র ৭০ লক্ষ ৭৩ হাজার হেক্টর জমি।  ড্রিপ ইরিগেশনের আওতায় রয়েছে ৩০ লক্ষ ৩৭ হাজার হেক্টর জমি ও স্প্রিঙ্কলার ইরিগেশনের আওতায় রয়েছে ৪০ লক্ষ ৩৬ হাজার হেক্টর জমি। অতি ক্ষুদ্র সেচের আওতায় আনা হলে জলের খরচ কমানো সম্ভব হবে। অথচ সবই পড়ে রয়েেছ পরিকল্পনার স্তরে। 
সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে সারা বছরে মেলে ৪০ কোটি হেক্টর মিটার বৃষ্টি ও তুষারপাত। দেশের বাইরে থেেক বয়ে আসে অতিরিক্ত ২ কোিট হেক্টর মিটার মাটির ওপরের জল। মোট জলের পরিমাণ ৪২ কোটি হেক্টর মিটার। এর মধ্যে নদীগুলি দিয়ে বয়ে যায় ১৮ কোটি হেক্টর মিটার জল। ভূগর্ভস্থ জল হিসাবে পাওয়া যায় ৬.৭ কোটি হেক্টর মিটার। বাষ্পীভূত হয়ে অথবা মাটির সঙ্গে তরল পদার্থ হিসাবে মিশে নষ্ট হয় ১৭ কোটি ৩০ লক্ষ হেক্টর মিটার জল। যদি বিপুল পরিমাণ এই জলরাশি সঞ্চয় করার কাজ সম্পন্ন করা যায় তাহলে প্রতি বছরই ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার পূর্ণ হতে পারে। অথচ এদিকে নজর নেই কারও। তাই চেরাপুঞ্জিতে বছরে ১১ মিটারের বেশি বৃষ্টি হলেও সেখানে মেলে না খাবার জল। কারণ নেই জল ধরো জল ভরোর আয়োজন। 
■  সঙ্কটমুক্তি কোন পথে
২০১৯ সালটা ভারতের পক্ষে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এবছর খরা ও জলসঙ্কটের মাত্রা তীব্রতম। গত আর্থিক বছরে দেশে বেকারির হার ছিল আগের ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিরক্ষরের সংখ্যা ভারতে। এই তিনটি অভিজ্ঞান নিেয় আমরা এগিয়ে চলেছি স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপনের দিকে। ২০২২ সালটা কী ভাবে উদযাপন করতে চাই আমরা? জলসঙ্কটের সমাধান খুঁজে, নাকি কর্মসংস্থানের সমস্যা মিটিয়ে, নাকি সব মানুষকে সাক্ষর করে তুলে? কোনটায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে সরকার? কোনও একটা সমস্যা কি জরুরি ভিত্তিতে মেটানো হবে? নাকি তথ্যের কারিকুরিতে এসব সমস্যা ঢেকে রেখেই উদযাপন করা হবে স্বাধীনতা ৭৫?‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top