রাজীব ঘোষ

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।
ভয় নেই এমন দিন এনে দেব
দেখো সেনাবাহিনীর বন্দুক নয়, শুধু
গোলাপের তোড়া হাতে
কুচকাওয়াজ করবে তোমার সামনে,
শুধু তোমাকেই তোমাকেই স্যালুট করবে তারা দিনরাত।
— কবীর সুমন

দিয়েগো মারাদোনা নেই!‌ হাহাকারের রাতে এই গানটাই ঘুরছিল, পাক খাচ্ছিল মাথার মধ্যে। শুধু শব্দটা প্রিয়তম করে নিয়েই। অগ্রজ লিখিয়ে সুব্রত সেনগুপ্তর একটা উপন্যাসের নাম ‘‌মারাদোনা হে’‌। হে মারাদোনা, তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা, গল্প–‌উপন্যাস–‌কবিতায় অনিবার্য চলে আসা, মারাদোনার সঙ্গে বাঙালির ‘‌তুমি’‌র সম্পর্ক, যেন নেক্সট ডোর বয়।
এডসন অ্যারান্তেস ডু নাসিমান্টো, পেলে, বিষাক্ত ট্যাকলে রক্তাক্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, সেই ছবিটা এখনও শৈশবের স্ক্র‌্যাপ বুকে বাঁধানো, যেমন মনের মণিকোঠায় বাঁধানো বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কালো মানুষের লড়াইয়ে পেলের নেতৃত্ব। আমাদের চিন্তায়–‌মননে তখন ম্যান্ডেলা আর পেলে সমার্থক। টিভি–র পর্দায় দেখা হয়নি পেলের স্বর্ণযুগ, দুধের স্বাদ ঘোলে কিছু তথ্যচিত্রে, সিনেমায়। বিরাশির বিশ্বকাপে নীল–‌সাদা কাগজের ফুল ফুটল মাঠে, তার ওপর বল নিয়ে আলপনা লুকে–‌কেম্পেস–‌আরদিলিসের, বাঙালির ঘরে ঘরে ঢুকে গেল আর্জেন্টিনা। আর এখানে ছিয়াশিতে মারাদোনা ঢুকতেই লেগে গেল ঘোর। ছোটখাটো চেহারা, জার্সিটা মনে হয় ওভার সাইজ, দুলকি চালে হাঁটা, তাগড়াই ফুটবলারদের সামনে বেমানান, অথচ পায়ে বল পড়লেই ভেলকি। হিন্দি ফিল্মের তারকাকে নকল করত যারা, তারাও ভেসে গেল, অঙ্গে সেই নামাবলি, নীল–‌সাদা ডোরাকাটা জার্সি, ১০ নম্বর!‌ হতদরিদ্র এলাকায় জন্ম মারাদোনার, সমাজের প্রান্তিক অংশের তরুণদের কাছে মারাদোনাই সেদিন ‘‌মুক্তিসূর্য’‌।
পেলের লড়াইটা যদি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, মারাদোনার লড়াইটা তাহলে সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে। ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ আর একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন বৃত্তটাকে। বলেছেন, ‘‌লাতিন আমেরিকা আর ক্যারিবিয়ানের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র আর সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক মারাদোনা।’‌
রুসেফ একটুও বাড়িয়ে বলেননি। ৩০ অক্টোবর, ষাট বছরের জন্মদিনে মারাদোনা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার পত্রিকা ‘‌এল ক্লারিন’‌–‌কে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘‌মৃত্যুর পরও কি আমাকে কেউ ভালবাসবে?‌’‌ হ্যাঁ, এমনই ভালবাসার কাঙাল ছিলেন বলেই বোধহয় ডুবে গিয়েছিলেন মাদকে, সুরায়। যেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘‌অথচ মরে গেল লোকটা, কবি ও কাঙাল।’‌
‌‘‌গুডবাই কমানদান্তে’‌— এই ভাষাতেই ফুটবলের রাজপুত্রকে বিদায় দিয়েছেন বামপন্থীরা। অথচ মারাদোনা কোনওদিন নিজেকে বামপন্থী বলে ঘোষণা করেননি। বলার দরকারও ছিল না। ফিদেল কাস্ত্রোর ভক্ত। বলেছিলেন, ‘আমি কমিউনিস্ট নই। মৃত্যু পর্যন্ত আমি ফিদেলিস্তা।’ উত্তেজিত হলে মানুষ আস্তিন গোটায়। আর মারাদোনা?‌ আস্তিন গোটালেই বড় করে আঁকা চে–‌র উল্কি। ইচ্ছে করে জনসমক্ষে হাতে হাভানা চুরুট, দেখে নাও, বুঝে নাও। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। পায়ে কাস্ত্রো, ডান হাতে চে গুয়েভারার উল্কি। নিজের আত্মজীবনী ‘‌এল দিয়েগো’‌ উৎসর্গ করেছিলেন যে কয়েকজনকে, তাঁদের অন্যতম ফিদেল কাস্ত্রো।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার মার দেল প্লাটায় সামিট অফ দ্য আমেরিকাস–এ গিয়েছেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। মারাদোনার টি–শার্টে লেখা ‘‌স্টপ বুশ’‌। বুশকে তিনি ‘‌আবর্জনা’‌ বলতেও ছাড়েননি। প্রকাশ্যেই মার্কিন–‌বিদ্বেষী। বলেছিলেন, ‘আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সবকিছুকেই ঘৃণা করি। ঘৃণা করি সর্বশক্তি দিয়ে।’
দারিদ্র, নিপীড়ন। এই দুটো শব্দকে আমৃত্যু ঘৃণা করেছেন। নিপীড়িতদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। ফুটবল খেলেও যে দারিদ্র ঘোচানো যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁকে দেখেই আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্ম নেশার জগৎ থেকে দূরে সরে পায়ে ফুটবল তুলে নেয়।
সার্বিয়ার সংবাদপত্র পলিটিকায় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন মারাদোনা। বলেছিলেন, ‘বুয়েনস এয়ার্সের হতদরিদ্র এলাকা ফ্যাবেল ফিওরিতোতে জন্মেছি। এলাকাটা আগের মতোই আছে। বন্ধুরা এখনও আগের মতোই আছে। শুধু রাজনীতিক আর সরকারি লোকেরাই দিন–দিন ধনী হয়েছে। ধনী হওয়ার সুযোগ আমারও ছিল। কিন্তু আমি সুযোগ নিইনি, কারণ সেটা করতে গেলে আমায় গরিবের পেটে লাথি মেরে তাঁদের কাছ থেকে চুরি করতে হত।’
এখনও বলে দিতে হবে বামপন্থী ছিলেন কি না!‌
মারাদোনা একবার আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময় কেউ তাঁর একটি কথাও শোনেনি। সরে আসতে হয়েছিল রাজনীতির ময়দান থেকে। আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল কিংবা কিউবার গরিবি হটানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনী দেশগুলিই এর জন্য দায়ী বলে মনে করতেন মারাদোনা। কুশাসনের বিরুদ্ধে অনর্গল বলতেন। লক্ষ্য ছিলেন পোপ থেকে শুরু করে তাবড় রাজনীতিবিদেরা। তাঁর বক্তব্য ছিল, কেউ গরিবদের পক্ষে কথা বলেন না। একটা সময় আর্জেন্টিনার নব্যউদারনীতিবাদী প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেমকে সমর্থন করতেন।
ভেনেজুয়েলার মার্কিন–‌বিরোধী প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উগো শাভেজেরও সমর্থক ছিলেন মারাদোনা। ২০০৫ সালে ভেনেজুয়েলা গিয়েছিলেন। লাল টি–শার্ট পরে শাভেজের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‌আমি শাভিস্তা’‌। বলেছিলেন, ‘ফিদেল, শাভেজ যা করেন, আমার কাছে সেগুলোই ঠিক।’
‌ইচ্ছে করলে থাকতে পারতেন ইউরোপের কোনও বিলাসবহুল দ্বীপে, নিউ ইয়র্কের সুরম্য হর্মে। তা নয়, জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘‌আমি বিশ্বাস করি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্ডেস কিছু একটা করবেন.‌.‌.‌ খুব খারাপ লাগে যখন দেখি শিশুরা খেতে পাচ্ছে না। আমি আর্জেন্টিনার মুখে হাসি দেখতে চাই।’‌ বিশ্বের মানচিত্রে আর্জেন্টিনার পাকা আসন গড়ে দিয়ে গেলেন দিয়েগো, অথচ তাঁকে বাউন্ডুলে, বোহেমিয়ান, নেশাখোর হিসেবে তুলে না ধরলে পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের পেটের ভাত হজম হত না যে। ব্রুনো কন্তির মতো বিষাক্ত ট্যাকলে আটকাতে চেষ্টা করত ওরা, না পারলে জার্সি ধরে টেনে নামাত।
ওই জার্সি অমলিন, হে মারাদোনা, তোমাকে অভিবাদন।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top