সুজন কুমার দাস

উনিশ বছরের কিশোরী। সে আর নেই। এমন ঘটনা প্রতিমুহূর্তেই ঘটে চলেছে ভারত জুড়ে। কোনও কোনও ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের আলোয় আসে, কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। আগে মনে হত, সরকারের কাছে সাধারণ জনগণ শুধু সংখ্যামাত্র। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকরা মরে প্রমাণ করেছে, সাধারণ মানুষ সরকারের কাছে আর সংখ্যার মর্যাদাটুকুও পায় না। সরকার সংসদে দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ ভাবে জানিয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিক মৃত্যুর হিসেব সরকার রাখেনি। মনীষার মৃত্যুর পরিণতিও হয়তো সেই রকমই হত, কিন্তু জনগণের ক্ষোভ আঁচ করে উত্তরপ্রদেশ সরকার তড়িঘড়ি মনীষার পরিবারকে নগদ পঁচিশ লক্ষ টাকা, একটি বাড়ি, আর একজনকে চাকরি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।
সরকারি ভাষায় এটাকে ক্ষতিপূরণ বলে। সরকার খুব সহজেই একটি প্রাণের এবং সেই প্রাণের তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণা টাকার অঙ্কে মেপে ফেলে। উনিশ বছরের বাচ্চা মেয়েটির তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যু এবং তার পরিবারের যন্ত্রণার ক্ষতির পরিমাণ হল, একটি বাড়ি, পঁচিশ লক্ষ টাকা আর একটি চাকরি। সরকার এই ভাবেই জীবনের মূল্যের হিসেব কষে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, অপরাধীর আবার উঁচু জাত, নীচু জাত হয় নাকি? কথাটা হয়তো কিছুটা ঠিক, কিন্তু রাজ্যটি যখন উত্তরপ্রদেশ তখন জাতিধর্ম অবশ্য বিচার্য। রাজ্যটিতে উচ্চবর্ণ জাঁকিয়ে বসেছে। ওই মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের সমর্থনে উচ্চবর্ণ পথে নেমেছে। নেতৃত্ব দিচ্ছে শাসক দলের স্থানীয় নেতা।
কাঠুয়া ও উন্নাওয়ে আমরা একই চিত্র দেখেছি। কয়েক মাস আগে, উত্তরপ্রদেশের দলিত সম্প্রদায়ের এক অধ্যাপক ফেসবুকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী একটি পোস্ট করেন। এক উচ্চবর্ণীয় রাজনৈতিক নেতা সেই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানালে, থানার দারোগাবাবু সেই অধ্যাপককে থানায় ডেকে ওই নেতার পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। একদম ফিল্মি কায়দায় বিচার! নো এফআইআর, নো ইনভেস্টিগেশন, ফয়সলা অন দ্য স্পট!‌ দলিত হলে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
দলিত সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তিকে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। দলিত সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার করে সহজে পার পাওয়া যায়। হাথরসের ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রথমে অভিযোগ নিতে থানা টালবাহানা করে। যে ভাবে নিগৃহীতার মৃতদেহ জ্বালিয়ে দেওয়া হল, তাতে ভারত হতবাক। বাবা, মা, পরিজনদের বাড়িতে তালাবন্ধ করে রেখে পুলিশি প্রহরায় জ্বালিয়ে দেওয়া হল, শেষ দেখা দেখতে দেওয়া হল না, পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম করতে দেওয়া হল না, তাতে মনে হচ্ছে অপরাধ করেছে ওই মেয়েটিই ও তার পরিবার। কীসের জন্য এত লুকোচুরি? নির্যাতিতার পরিবারকে ডিএম হুমকি দিচ্ছেন কার স্বার্থে? পরিবারটি উচ্চবর্ণের হলে এই দুঃসাহস দেখানোর সাহস রাজ্য প্রশাসন পেত?
নারীদের ওপর ক্রমবর্ধমান পীড়ন ও অত্যাচারের কারণ বহুমাত্রিক। প্রথম ও প্রধান কারণ হল, মেয়েদের
দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা। তার ওপর সেই নারী দলিত হলে তার স্থান আরও নীচে।
অদ্ভুতভাবে, একজন উচ্চবর্ণীয় নারীও আবার একজন দলিত নারীকে মনুষ্যেতর জীব মনে করে। সম্প্রতি
যাদবপুর ইউনিভার্সিটির দলিত অধ্যাপিকার প্রতি এক তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীর বিকৃত কটূক্তি টাটকা উদাহরণ। সন্তান জন্মলাভের পর সন্তানের পুরুষাঙ্গ দেখতে পেলে পরিবারের লোকজনের চোখে মুখে যে নির্লজ্জ আনন্দের অভিব্যক্তি দেখা যায়, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মেয়েদের বঞ্চনার ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ। প্রতিবছর হাজার হাজার মনীষাকে জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে হত্যা করা হয়। একটি প্রাণকে শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার জন্য পৃথিবীর আলো দেখতে দেওয়া হয় না। নারীর প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজের মজ্জাগত। সতীদাহ প্রথার মতো বর্বর প্রথারও অনুশীলন করত, এই সমাজ। সুতরাং নারী মানেই তাকে ইচ্ছেমতো ধর্ষণ করা যায়,পুড়িয়ে ফেলা যায়, জিভ কেটে নেওয়া যায়। ধর্ষণের পিছনে শুধু বলপূর্বক যৌনচাহিদা পূরণের ইচ্ছা কাজ করে না, কাজ করে একটি মেয়েকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিপীড়ন করার এক অদম্য ইচ্ছা ও পুরুষসত্তার বিকৃত উল্লাস।
মানুষের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন করতে হলে একটি সুন্দর, সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন। আর একটি ভদ্র সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে জনগণের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন প্রয়োজন। এখন দেখি আমাদের রাষ্ট্রের ধ্বজাধারীদের চিত্রটা কেমন। ২০১৯ সালে গঠিত বর্তমান লোকসভার মোট সদস্যের মধ্যে ২৩৩ জন (৪৪%) বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত। এর মধ্যে আবার ১৫৯ জন (২৯%) বিভিন্ন ভয়াবহ অপরাধ, যেমন ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণের মতো ঘটনায় অভিযুক্ত। কাজেই এই রাষ্ট্রব্যবস্থা সমাজকে কতখানি যথাযথ পথনির্দেশ করতে সক্ষম, সেটা নিয়ে সন্দেহ না রাখাই সমীচীন। উত্তরপ্রদেশের উন্নাও কেস, প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের ঘটনা জ্বলন্ত প্রমাণ। লোকসভার এত সংখ্যক সদস্য যদি ধর্ষণ–‌সহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হন তাহলে সেই আইনসভার কাছ থেকে কী আশা করা যেতে পারে?
আর সবথেকে বড় প্রশ্ন, এঁদের লোকসভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়েছে কে? আমরাই পাঠিয়েছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ঘেমে নেয়ে ভোট দিয়ে আমরাই তাঁদের নির্বাচিত করেছি। তাহলে দোষের ভাগীদার আমরাও। আইনবিভাগ দুর্নীতিগ্রস্তদের দ্বারা পরিচালিত হলে পুলিশ প্রশাসন খুব সৎ হবে, কর্মক্ষম হবে এটা আশা করা ভুল। সুতরাং, ওই মেয়েটির জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন ঝরিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ানো ছাড়া আর কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না।

জনপ্রিয়

Back To Top