প্রদীপ কুমার দত্ত: ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে নির্বাচন যাতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এটা তাদের সাংবিধানিক কর্তব্য। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনা থেকে মনে হচ্ছে তারা সেই ভূমিকা পালন করছে না। তারা বিজেপির যাতে সুবিধা হয় সেভাবে কাজ করছে। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ থেকেই সেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। শুধু এবার নয়, এর আগে কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন শেষ হবার পরই নির্বাচন ঘোষণা করা হয়েছে। আবার এবারের নির্বাচন সাতটি দফায়। এতগুলি দফায় নির্বাচন আগে কখনও হয়নি। এতগুলি দফায় নির্বাচন হওয়ায় সুবিধা হল বিজেপির। তাদের প্রচার প্রধানমন্ত্রীসর্বস্ব, তাই তাদের দরকার ছিল দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন যাতে প্রধানমন্ত্রী সারা দেশ ঘুরে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেন।
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন আদর্শ আচরণ বিধি চালু করেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি ও তাদের নেতারা প্রায়শই নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তারা আচরণ বিধি লঙ্ঘনকারীকে শোকজ করে। বড়জোর কয়েকদিনের জন্য প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেয়। কিন্তু আচরণ বিধি লঙ্ঘন করলেও কমিশন প্রার্থীর প্রার্থিপদ বাতিল করে না বা কোনও দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য বলে ঘোষণা করে না। এটা না করলে আচরণ বিধি কি অর্থহীন হয়ে পড়ে না? এটা করা হয় না বলেই প্রার্থীরা বা দলগুলি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করতে কোনও ভয় পায় না।
বিজেপির প্রতি নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগের আগেই অবসরপ্রাপ্ত আইএএস, আইপিএস, প্রভৃতি শতাধিক অফিসার, এমনকী একাধিক প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। গণতন্ত্রের স্বার্থে যেখানে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ থাকা উচিত সেখানে বিভিন্ন ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের সেই কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করছে না; তারা বিজেপির স্বার্থে কাজ করছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ প্রসঙ্গে তারা যে নরম মনোভাব নিয়ে চলছে তাতে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বলে মনে করেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। তাঁর মতে এবার অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছে কমিশন। বিজেপির নেতা–মন্ত্রীরা, এমনকী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও আদর্শ আচরণ বিধি লঙ্ঘন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক অভিযোগ জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। চার দফা ভোট হয়ে যাবার পরও কমিশন সেই অভিযোগগুলির ফয়সালা না করায় কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টে গেলে সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মোদির বিরুদ্ধে ওঠা যে সব অভিযোগের ফয়সালা করেছে কমিশন, তার সব কটিতেই তাঁকে ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করছেন। বিজেপির বিভিন্ন নেতা- মন্ত্রীরা সেনাবাহিনীর কৃতিত্বকে তাঁদের কৃতিত্ব বলে দাবি করছেন। লাতুরে প্রধানমন্ত্রী বালাকোট হামলার কথা বলে ভোট চান। এতে নাকি তিনি আচরণবিধি ভাঙেননি বলে কমিশন মত প্রকাশ করেছে। অথচ নির্বাচন কমিশনেরই স্পষ্ট নির্দেশ, সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না। 
অমিত শাহের ক্ষেত্রেও একই কথা। ২২ এপ্রিল কৃষ্ণনগরের জনসভায় শাহ বলেছিলেন, পুলওয়ামা হামলার ১৩
দিনের মাথায় মোদির বিমানবাহিনী গিয়ে বালাকোটে হামলা চালায়। ‘মোদির বিমানবাহিনী’ বলে অমিত শাহ আদর্শ
আচরণবিধি ভাঙেননি বলে জানিয়েছে কমিশন। আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে বলে, সেনাবাহিনী দেশের, কোনও প্রধানমন্ত্রীর নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গত ১ এপ্রিল গাজিয়াবাদের এক নির্বাচনী জনসভায় ভারতের সেনাবাহিনীকে ‘মোদি কি সেনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ নির্বাচন কমিশন তাঁর কৈফিয়ত চেয়ে নোটিস পাঠিয়েই দায় সেরেছে।
মহাকাশ বিজ্ঞানে কয়েক দশক ধরে ভারতের বিজ্ঞানীরা প্রভূত কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। সম্প্রতি ইসরো যে অ্যান্টি- স্যাটেলাইট পরীক্ষা করেছে তার কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী নিতে চাইছেন। এটা আদর্শ আচরণ বিধি লঙ্ঘন নয় কি? এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নীরব। ‘নমো’ টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রেও একই কথা। এক সময়ের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা মুকুল রায়, যিনি সারদা কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচার জন্য বিজেপিতে আশ্রয় নিয়েছেন, কোচবিহারে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী সভায় কোচবিহারের পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে ‘দেখে নেবার’ হুঙ্কার দেবার পরই নির্বাচন কমিশন তাঁকে সরিয়ে দিলেন। কল্যাণ সিং রাজ্যপাল হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি কর্মীদের বলেছিলেন যে মোদিকে পুনরায় নির্বাচন করা দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য অতীব প্রয়োজন। যেভাবে বিজেপিকে ভোট দেবার আহ্বান করেছেন তার দ্বারা তিনি রাজ্যপাল পদের মর্যাদাহানি করেছেন, পাশাপাশি নির্বাচনী আচরণ বিধিও ভঙ্গ করেছেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্য নির্বাচন কমিশন বিষয়টি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে চিঠি লিখেছিল। একই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের চিফ ইলেক্টোরাল অফিসারের কাছে ওই মন্তব্য নিয়ে রিপোর্ট চায়।
সম্প্রতি মানেকা গান্ধী বলেছেন, মুসলিমরা তাঁকে ভোট না দিলে তিনি মুসলিমদের চাকরি দেবেন না। অথচ আচরণ বিধিতে পরিষ্কার ভাবে বলা আছে ভাষা, জাত, ধর্ম নিয়ে কোনও বিভেদ সৃষ্টি করা চলবে না। এসবের প্রতি নির্বাচন কমিশন নীরব। আচরণ বিধি যখন প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে তখন তারা যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। কমিশনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিযোগ গ্রহণ করা, তা বিবেচনা করা, কিন্তু উপযুক্ত ব্যবস্থা তারা নিচ্ছে না। বিগত পাঁচ বছরে বর্তমান মোদি সরকার যেভাবে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কুক্ষিগত করেছে তার অন্যতম হল নির্বাচন কমিশন। এটা ভারতের গণতন্ত্রের পক্ষে কলঙ্কজনক।
(‌লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, প্রেসিডেন্সি কলেজ)‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top