দেবাশিস পাঠক- ‘ইন্ডিয়া:‌ দ্য সিজ উইদিন’। একটি বই। লেখক বদলে গিয়েছেন অনেকদিন। নেহরুভীয় ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে এখন তাঁর ভারি বীতরাগ। কিন্তু বইয়ের শিরোনামের শব্দবন্ধ এখনও হারায়নি তার তাৎপর্য। বরং অন্য মাত্রায় দীপন বেড়েছে তার। উল্লিখিত বইটিতে লেখক এম জে আকবর নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছিলেন কাশ্মীর সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত। সেই প্রেক্ষিত এখন বদলানো ক্যানভাস, তাতে অন্য উদ্ভাস। কিন্তু তাতেও শব্দবন্ধটি  অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েনি। বরং অন্য টানাপোড়েন আর চোরাস্রোতের সৌজন্যে আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর এখন সত্যিই অন্দর থেকে অবরুদ্ধ এক ভূমির নাম। তার বহিরঙ্গে যদি কেন্দ্রীয় সরকারের চাপানো অবরোধ জড়ানো থাকে, তবে এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে সেখানকার অন্তরঙ্গ অবরুদ্ধ এমন এক ধ্যান–‌ধারণার জটিল ফাঁসে, যেখান থেকে ভূস্বর্গকে বের করে আনা সহজ নয়। আদৌ সহজ নয়। বের করে আনার জন্য যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা দরকার, যে সদিচ্ছার দরকার, সেটার হদিশও এই সময়ে কোথাও নেই।  
সরকারের ভূমিকা ও তার প্রতিক্রিয়া
সরকার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের তাগিদ এখনও দেখা যাচ্ছে না। সর্বশক্তি নিয়োগ করে, সরকারপক্ষ তৎপর আপন পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে। কাশ্মীর তার কাছে একটা বড় বাজি, যে বাজির ওপর আগামীতে কাশ্মীর ছাড়া দেশের বাদবাকি অংশের মানুষের আস্থা–‌বিশ্বাস জেতা–‌হারা নির্ভর করছে। অতএব ওসব বিশ্বাসযোগ্যতা, সদিচ্ছা, সব গৌণ, বাতিলের খাতায়।  কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারি সক্রিয়তার ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় সেনা, কেন্দ্রীয় বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, জম্মু–‌কাশ্মীর পুলিশ, ইন্দো–‌তিব্বত সীমান্তরক্ষী পুলিশ এবং সশস্ত্র সীমা বলের বিপুল সংখ্যক কর্মী–‌আধিকারিকদের হাতে।  
আর তাঁরা কী করছেন?  
জনগণের আস্থা অর্জন নয়, এঁদের প্রধানতম কাজ হল অতীতের পুনরাবৃত্তি রোধ। ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৬–‌র ভুলগুলো যাতে আর না হয় তা নিশ্চিত করা। তারা সে কাজে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল। ফলত, বড়সড় কোনও হিংসা এখনও মাথা তুলতে পারেনি উপত্যকায়। সামরিক শাসনের বেড়া দিয়ে গণতন্ত্রের চাষ চলছে সেখানে। কিছু বললেই বলা হচ্ছে, ১৯৮৯ থেকে জঙ্গি কার্যকলাপ কোন গণতন্ত্র সফল হতে দিয়েছে? সুতরাং এখন চুপ করে থাকো।  
প্রশ্ন। অতি স্বাভাবিক একটা জিজ্ঞাসা। আচ্ছা, যারা ২০১৮–‌তে পঞ্চায়েত আর পুরসভার নির্বাচনে জিতে এসেছিলেন, তাঁদের এখন দেখা যাচ্ছে না কেন? তাঁরা তো পাকিস্তানপন্থী নন। তাঁরা তো ভারতীয় সংবিধানে আস্থাশীল, এবং বর্তমানে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক মোটেই খারাপ নয়। তবে  তাঁদের নামিয়ে জনগণমন জেতার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না কেন? ৪০০০–‌এর বেশি সরপঞ্চ, প্রায় ৩০ হাজার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তাঁরা সব গেলেন কোথায়?
এই প্রশ্নের একটাই উত্তর। সে চেষ্টা করা যে হচ্ছে না, তার একমেবদ্বিতীয়ম কারণ, গোড়াতেই গলদ আছে। কাশ্মীরে কোনওদিনই খুব বেশি ভোটার ভোট দেন না। কিন্তু অন্যবার ভোটে ন্যাশনাল কনফারেন্স থাকে, পিডিপি থাকে। এই দলগুলোর উপত্যকায় একটা নিজস্ব নেট ওয়ার্ক আছে। সেটা কাজে লাগিয়ে তারা ভোটার জড়ো করে। এবার এঁরা  কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচন, বিজেপি যাই বলুক না কেন, একটা বড়সড় ঠাট্টায় পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও যাঁরা সাহস করে দাঁড়ালেন এবং জিতে এলেন, তাঁরাও এখন ভোটারদের মুখোমুখি হতে স্বস্তি বোধ করছেন না। তাঁরা ভালমতোই জানেন, ৩৭০ থাকল না গেল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথা কম। কিন্তু এটা যদি তাঁদের বোঝানো হয় যে ৩৭০ নং ধারার অবলুপ্তির কারণে তাঁরা গাড্ডায় পড়তে চলেছেন, তবে সে ধারণা মোচন সহজ কম্ম নয়। এবং সে সম্ভাবনা সমধিক। আপন অভিজ্ঞতায়, ঠকে যাওয়ার কারণে, তাঁরা সরকারি প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। পঞ্চায়েতে জয়ী প্রার্থীরা জানতেন, তাদেরকে বলা হয়েছিল, ২২টা সরকারি দপ্তর পঞ্চায়েতের অধীনে থাকবে। স্বায়ত্তশাসন মজবুত করা হবে। কিন্তু বিগত এক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁদের দেখিয়েছে, ২২ তো দূর অস্ত, ১২টা দপ্তরও পঞ্চায়েতের অধীনে আসেনি। বড়জোর ৬–‌৭টা এসেছে। নিজেদের কোমরেই জোর নেই, তাই অবিশ্বাসীদের অনুরাগী করে তোলার কাজে ঝুঁকি তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা নিচ্ছেন না। এঁদের অনেকে দিল্লি যাচ্ছেন অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করতে, অথচ নিজেদের এলাকায় পা রাখছেন না, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে।
এসবের নিট ফল এই যে, ভারী বুট আর উঁচানো বেয়নেটের পাহারায় উপত্যকায় গণতন্ত্র মিউ মিউ করছে।  
বিরোধী শিবিরের দশা
 সরকারবিরোধী অবস্থান যাঁদের, তাঁদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা  নেই। এতদিন তাঁরা বলে এসেছেন, বলিয়ে এসেছেন, “চুভান ইজ্জত, নুয়ান ইজ্জত, ত্রিহাত সাতাত, ত্রিহাত সাতাত।” অর্থাৎ, ‘তোমার সম্মান, আমার সম্মান, তিনশো সত্তর, তিনশো সত্তর।”  এখন  সেই ৩৭০ নেই, তাঁরাও জনচক্ষুর আড়ালে। সরকার বিরোধী নেতৃবর্গকে জেলে পুরেছেন, অশান্তি এড়াতে। ফলত, যাঁরা অন্তরালে তাঁদের ওপর বিশ্বাস আর আস্থা রেখে আর ধোঁকা খেতে রাজি নয় উপত্যকা।
বিরোধী পক্ষ তাঁদের নেতা–‌নেত্রীদের বন্দিদশাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। আর তখনই প্রশ্ন উঠছে, যখন জঙ্গিদের গুলিতে সাধারণ মানুষ মরছিল, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা গুলি খাচ্ছিল, মানুষকে ভোট বয়কটে বাধ্য করা হচ্ছিল, শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছিল পাথর ছোঁড়ার কাজে, ফিঁদায়ে আক্রমণ অস্থির করে তুলছিল জনজীবন, শরিয়তি শাসন প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে বোমা মারা হচ্ছিল সিনেমা হল আর বারগুলোতে, কাশ্মীরী পণ্ডিতদের উপত্যকা ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছিল, তখন ওইসব কর্কটক্রান্তির লগ্নে মানবাধিকার বুঝি অক্ষত ছিল?
এক কথায়, অতীতের অজস্র নীরবতাকে সমর্থনের সূচক হিসেবে তুলে ধরে,  বর্তমানের একটা ভুলকে ঠিক বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। ওমর, মেহবুবারা অসহায়। অসহায় কাশ্মীরও, তার নিজের অন্দরের অবরোধে।
মিডিয়ার ভোজবাজি
এসবের চেয়েও বড় কথা, সবচেয়ে বড় কথা, কাঙ্ক্ষিত বিশ্বাসযোগ্যতা সংবাদমাধ্যমেরও নেই।  জীবনানন্দীয় ভাষায়, “কেউ নেই, কিছু নেই --- সূর্য নিভে গেছে।”  ‘মানুষের ভাষা’ ‘অনু্ভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ, এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কংকাল’। সংবাদমাধ্যম যা যা বলছে, সেগুলো এখন ওই ‘শব্দের কংকাল’ হয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে।
কেন? সেকথা বুঝতে গেলে কাশ্মীর উপত্যকার খবরগুলোর ওপর চোখ বোলাতে হবে। ভাল করে দেখতে হবে, কারা কী বলছে বা লিখছে।  
দেশীয় সংবাদ মাধ্যমের একটা বড় অংশ ক্রমাগত বলে চলেছে, সব ঠিক হ্যায়। উপত্যকায় শ্মশানের হলেও শান্তি বিরাজ করছে। অথচ, এর ঠিক উল্টো ছবি তুলে ধরছে বিদেশি সংবাদ মাধ্যম। বিবিসি, আল জাজিরা আর রয়টার্স প্রতিবাদে ফেটে পড়া জনতার ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি চালানোর ছবি সম্প্রচার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া লোকদের সংখ্যা অগোপন করছে এএফপি, এপি, টাইম আর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স।  নাবালকদের গ্রেপ্তারির খবর করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ছররা গুলিতে বা বুলেটে মানুষ মারার খবর প্রথম  জানিয়েছে হাফিংটন পোস্ট আর ফ্রান্স ২৪। মহিলাদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর এনেছে দয়েশ ওয়েলে। ওষুধের অপ্রতুলতার কথা বলায় ডাক্তারকে আটক করা হয়েছে, তা জানিয়েছে বিবিসি।
দেশীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মতো বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও কার্ফু পাস পাননি। তাঁদেরও নাকাল হতে হয়েছে, হেনস্থা সহ্য করতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও ওরা পেরেছে, কারণ দুটো। ওরা স্থানীয় সংবাদদাতাদের ওপর ভিত্তি করে ঘুঁটি সাজিয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে কোনও খবর চাপার দায় ওদের নিতে হচ্ছে না।
এসবের অনিবার্য পরিণাম আন্দাজ করাটা কোনও দুরূহ কাজ নয়।
১৯৮৪। কলকাতায় রাজীব গান্ধী খবর পেলেন বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাঁকে দিল্লি ফিরতে হবে।  হেলিকপ্টার আসার অপেক্ষায় ছিলেন। তখন,  ঠিক কী ঘটেছে আন্দাজ করার জন্য তিনি রেডিও চালালেন। আকাশবাণী নয়, ধরলেন বিবিসি। জানলেন ইন্দিরা নিধনের সংবাদ। সেদিন ভারতের গণমাধ্যম ছিল পুরোদস্তুর সরকার নিয়ন্ত্রিত। তাই তাতে আস্থা ছিল কম। রাজীবের মতো কংগ্রেস সেক্রেটারিরও। এখন ৪০০টারও বেশি টিভি চ্যানেল। ৩০০০–‌এর বেশি রেডিও স্টেশন। ১০০০–‌এর বেশি খবরের কাগজ। তাও যদি দেশের অভ্যন্তরীণ সত্যিটা জানার জন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে অমন গণতন্ত্রের অন্তঃসমীক্ষার আশু প্রয়োজন, সন্দেহ নেই।
মেহের আলি  কিন্তু বার বার বলছে, ‘সব ঝুট হ্যায়’। বাকিটা আমাদের বুঝে নেওয়ার পালা।‌‌

যে জন আছে মাঝখানে। শ্রীনগর, শুক্রবার। ছবি:‌ পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top