প্রচেত গুপ্ত এতদিন করোনা–‌জয়ের নানা ঘটনা লিখেছি। বলেছি, শুধু মুখ বেজার করে বসে থাকা নয়, এই দুঃসময়ে জয়ের গল্পও রয়েছে। কখনও চিকিৎসক, কখনও পুলিশ, কখনও সাফাই কর্মী, কখনও ব্যাঙ্ক কর্মী, কখনও শিক্ষক, কখনও ফেরিওয়ালা, কখনও সেলসম্যান। প্রকাশক, সাহিত্যিকদের কথাও লিখেছি। আজ লিখব এক সঙ্গীত শিল্পীর কথা। এটাও একটা জয়ের গল্প।
বই যেমন করোনার কাছে মাথা নোয়ায়নি, তেমন জিতল গানও। এই সময়ের বাংলা গানের জনপ্রিয়তম শিল্পী, অন্যতম ক্ষমতাশালী কবি ও সুরকার রূপম সেই পথ দেখাল। সেদিন অনলাইনে একক কনসার্টের আয়োজন করেছিল সে। শুনেছি, লক্ষাধিক টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। ‘‌টিকিট বিক্রি’‌ কথাটা ভুল বললাম, শ্রোতারা ‘‌গান শুনব’‌ বলে এগিয়ে এসেছিল। রূপম এভাবে আরও কিছু কনসার্ট করবে নিশ্চয়। সেই হিসেবে দশবার কনসার্ট করলে টাকার অঙ্কটাও দশ লক্ষ হবে। তাই তো?‌
যখন হল বন্ধ, জলসা বন্ধ, কলেজের ফেস্ট বন্ধ তখন দশ লক্ষ টাকার বাংলা গান!‌ এরপরেও কি বলব না বাংলা গানের কাছে করোনা হেরে গেল?‌
আচ্ছা, কেন এতবার টাকার কথা বলছি?‌ আমি কি সঙ্গীতকে টাকা–‌পয়সা দিয়ে বিচার করি?‌ আমি কি জানি না রূপমের গানের ‘‌জীবন বোধ’‌ কতটা গভীর?‌ আমি কি জানি না তার গায়কী কতটা শক্তিশালী এবং শত্রুশালী (‌শব্দটা বানালাম। তার সাফল্যে যার শত্রু এবং হিংসুটে, তাদের জন্য)‌?‌ আমি কি জানি না সে সময়ের থেকে এগিয়ে আছে অনেকটা?‌ আমি কি জানি না সে আধুনিক বাংলা গানের একটা মাইলস্টোন?‌ আমি কি জানি না তার কণ্ঠের মিষ্টত্ব গত কুড়ি বছর ধরে একই রকম রয়েছে?‌
সেসব না বলে আগে কেন টাকা পয়সার কথা?‌
বলছি এই কারণে যে রূপমের কনসার্ট প্রমাণ করল, বাংলা গানের শিল্পীরা চাইলে এই ভয়ঙ্কর করোনার সময়েও পেশাদার ভাবে গান গাইতে পারেন এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
মুশকিল হল, কোনও কোনও নাক উঁচু পণ্ডিত মনে করেন, সব পেশাতেই টাকা পয়সার কথা বলা যায়, কিন্তু লেখা, গান করা, অভিনয়, আবৃত্তি, নাচ, বাজনা, সঞ্চালনার সময় টাকা পয়সার কথা বলা যায় না। সেটা নাকি অতি লজ্জার। খেতে খামারে যিনি কাজ করছেন তিনি খাবেন, কল–‌কারখানায় যিনি কাজ করছেন তিনি খাবেন, অফিসে যিনি কলম বা কম্পিউটার পিষছেন তিনি খাবেন, হাসপাতালে ক্লিনিকে যিনি রোগী দেখেন তিনি খাবেন, যিনি ব্যবসা করেন তিনি খাবেন, স্কুল–‌কলেজে যিনি পড়াচ্ছেন তিনি খাবেন, শুধু যারা গান করেন, অভিনয় করেন, লেখেন তারা খাবেন না। তাদের উপার্জনের কথা বলাটা অন্যায়। বোঝো কাণ্ড। এই পণ্ডিতগুলো তো মহা পাজি!‌ নিজেরা কিন্তু চান্স পেলেই.‌.‌.‌হু হু।
তবে এটাও বলি, রূপমের এই কনসার্টের আগে নিশ্চয় কেউ এরকম কাজ করেছেন। অনলাইনে প্রোগ্রাম করেছেন। সেটা যদি পেশাদার ভাবে হয় এবং সফল ভাবে হয় আমি তাদেরও বাহবা দিচ্ছি। শুনেছি অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্ত করেছেন। এমনকি ওরা নাকি অনলাইনে ‘‌কল শো’‌ পর্যন্ত করেছেন। খুব ভাল। আমি ওদের প্রোগ্রাম দেখব, বিস্তারিত লিখব। তবে অনেকে যেমন তেমন ভাবে ‘‌ফেসবুক লাইভ’‌ করেই ভাবছেন, ব্যস্‌ হয়ে গেল, তা চলবে না। পেশাদার ভাবে করতে হবে। শ্রোতা দর্শকরা যেন পয়সা খরচ করে দেখে। একবার বা দু’‌বার চেনাজানা, আমচা চামচা বা গানের ইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জোর করে টিকিট বিক্রি করে করলে হবে না। এটাকে পেশা হিসেবে নিতে হবে। যেমন তঁারা করোনা কালের আগে করেছেন। একক বা ব্যান্ড শো। এতে নিজের ক্ষমতাও প্রমাণ হবে। মনে রাখতে হবে, গান বঁাচানোর লড়াই এটা।
সেই লড়াইতে দারুণ ভাবে জিতল রূপম।  
যখন লকডাউন শুরু হয়েছিল, দুটো কথা খুব শুনেছিলাম। এক)‌ কেউ আর বই কিনবে না। কারণ টাকা থাকবে না। বই কেনবার আগে চাল ডাল কিনতে হবে। বই পড়বার মতো ‘‌অপ্রয়োজনীয় শখ’‌ ভুলতে হবে।
দুই)‌ শিল্পীদের না খেয়ে থাকতে হবে। কেউ গান বাজনা শুনবে না। শুনবে কী করে?‌ ফাংশনই তো হবে না। হলেও টিকিট কেটে কে যাবে? হলই তো বন্ধ।‌
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এরকম কতদিন চলবে?‌
উত্তর পেয়েছিলাম, এক ‌বছর তো বটেই। দু–‌তিন বছরও হতে পারে। আমার কিছু শিল্পী বন্ধুর সঙ্গে কথা হত। কথা বলে মন খারাপ হয়ে যেত। আমি তাদের দুশ্চিন্তা, হতাশা, অবসাদ বুঝতে পারছিলাম। নিজেও ভাবছিলাম, সত্যি তো শিল্পীদের কত বড় দুঃসময়!‌
আচ্ছা, তিন মাস পর বইয়ের কী ‌হল?
আগের অবস্থা ফিরে না এলেও বই বিক্রি শুরু হয়েছে এবং চলছে। অনলাইনে  বই বিক্রি হচ্ছে। এমন অনেক প্রকাশক আছেন যারা অনলাইনে বই বিক্রি লকডাউনের আগের সময়ের থেকে তিনগুণ, চারগুণ, পঁাচগুণ‌ পর্যন্ত বাড়িয়ে ফেলেছেন। কারও বিক্রি তার থেকে বেশি হয়েছে। এর মানে হল তিনটে—
 ১)‌ যারা বলেছিলেন বই আর বিক্রি হবে না, তারা ভুল বলেছিলেন।
২)‌ বই পড়া আয়ের ওপর নির্ভর করে না। যে বই পড়ে আধপেটা খেয়েও বই পড়ে। তাদের কাছে এটাও চাল ডালের মতো জরুরি। আমাদের দুর্ভাগ্য, এদেশে ত্রাণ সামগ্রীর সঙ্গে কখনও বই দেওয়া হয় না। যারা শিক্ষিত, সচেতন তারা একবারও ভাবেন না, চাল ডালের প্যাকেটের সঙ্গে হাতে একটা বই দেওয়াটাও প্রয়োজনের। সেই বাড়িতে যদি কেউ পড়তে পারে তো খুব ভাল, নয়তো এইটুকু বোধ তৈরি হোক, বইটাও জরুরি। আজ না পারি, কাল আমাকে পড়তে, শিখতে হবে। আমি না পারলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে হবে। আসলে দরিদ্র, অসহায় মানুষও বই পড়ুক এটা আমরা ‘‌শিক্ষিত’‌রা খুব একটা চাই না। আমাদের দাম কমে যাবে।‌ তার থেকে শুধু চাল–‌ডালই ভাল।
৩)‌ বই যারা বিক্রি করেন, মূলত প্রকাশকরা, ঘরে বসে মাথা না চাপড়ে, নতুন পথ বের করে ফেললেন। করোনাকে পরাস্ত করবার পথ। যে পথে পাঠককে বইয়ের কাছে আসতে হল না, বই পাঠকের কাছে চলে গেল। এই পথে অনেকে সফলও হলেন। এখন তো নতুন বইও প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ভাবা যায়! এটা বড় সুসংবাদ।‌
আসলে মানুষ যা চায়, তা সে নেবেই। মানুষ যা চায় না, বিনি পয়সায় বিলি করলেও নেবে না। মানুষ যা চায় সেটা পৌঁছে দেবার পথ বের করে নিতে হয়। ফেসবুক শুধু রঙ্গ রসিকতা বা ঢাক পেটানোর জায়গা নয়। সে যেমন প্রতিবাদ করে, অসহায়ের পাশে দঁাড়ায়, তেমন শিল্পকেও বঁাচায়।
করোনা যখন গান–‌বাজনার টুঁটি টিপে ধরেছে, শিল্পীদের উপার্জন বন্ধ করে দিয়েছে, রূপম তখন অনলাইনে একক কনসার্ট করে তাক লাগিয়ে দিল। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চোখ ধঁাধানো একটা অনুষ্ঠান। মন মাতানো তো বটেই। তরুণ প্রজন্মের কাছে, এমনকী আমার মতো বুড়ো মানুষের কাছেও। কত গান যে গাইল ছেলেটা!‌ নিজের গানের সঙ্গে, রজনীকান্ত সেনের ‘‌মা’‌, রঞ্জনপ্রসাদের ‘‌কোথায় হারালো রে আমার মন’‌, সত্যজিৎ রায়ের ‘‌কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’‌ এবং নিজের বাবা–‌মায়ের লেখা, সুর করা, গাওয়া গান। অনলাইনের কমেন্টে দেখছিলাম, সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছে। আমিও আড়াই ঘণ্টা চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারিনি। তবে আমি বোকা। দুদিন আগে আবার তরুণ মজুমদারের ‘‌ফুলেশ্বরী’‌ সিনেমাটা দেখেছি। হেমন্ত মুখার্জির গলায় গান শুনে মুগ্ধ হই আবার। ১৯৭৪ সালের ছবি। বারবার শুনেও মনে হয় আবার শুনি। শুধু হেমন্ত কেন?‌ মান্না দে, মানবেন্দ্র, সতীনাথ, সন্ধ্যা, নির্মলা, আরতি এবং অবশ্যই সলিল চৌধুরীর কাছে তো ফিরে যাই বার বার। আবার ২০২০–‌তে  রূপমের গানও মুগ্ধ করছে। বোকা না হলে এত মুগ্ধ কেউ হয়?‌ তবে এই বোকামিতে আমি গর্বিত। ভাগ্যিস আমি বোকা। তাই রবীন্দ্রনাথ পড়তেও ভালবাসি, জীবনানন্দ পড়তেও ভালবাসি। আবার শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়া বেশি দিন থাকলে মন কেমন করে। এমন বোকাই যেন থাকতে পারি।
যাই হোক, সেদিন গোটা কনসার্ট জুড়ে রূপম জীবনের জয়গান গেয়েছে। বেঁচে থাকবার কথা বলেছে। লড়াই করবার কথা বলেছে। গেয়েছেও বটে সেরকম!‌ বাপ্‌রে!‌ কথা বলে আমায় দেখ, সুর বলে আমায় দেখ, গায়কী বলে আমায় দেখ।  গান শুনতে শুনতে ২০ বছর পিছিয়ে যাচ্ছিলাম। নাকি তার থেকে একটু বেশিই হবে?‌
ইচ্ছে হলে রূপমের বাড়িতে গান শুনতে যেতাম। একাই। ছোট একটা সিন্থেসাইজার বাজিয়ে গান ধরত। মনের আনন্দ ও বেদনায়। নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়, জোকার, কমলো মেঘেদের ওজন, আমার চোখের কালো.‌.‌.‌শুনে অবাক হয়ে যেতাম। ভাবতাম, এই টুকু ছেলে এমন ভাবে সমাজ, জীবন ও মৃত্যু, মিলন ও বিরহকে দেখতে শিখল কেমন করে!‌ তখনই বুঝেছি, এই শিল্পী সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। একে অনেক কষ্ট পেতে হবে। ওর সঙ্গে টেলিফোনে অনেক রাত পর্যন্ত গান নিয়ে কথা হত। দেখতাম গানকে রূপম শুধু ভালবাসে না, গান ওর কাছে আয়নার মতো। কখনও সেই আয়নায় জীবনকে দেখে, কখনও সেই আয়না দিয়ে জীবনের ওপর আলো ফেলে তাকে টুকরো টুকরো করে দেয়।
রূপম সেদিন অনলাইনে ছ’‌শো জন দর্শককে সঙ্গে নিতে পেরেছিল। এর দশ গুণ দেখতে চেয়েছিল। রূপমের বেলায় সেটাই স্বাভাবিক। তবে ফেসবুকে তার বেশি কানেকশন একসঙ্গে দেওয়া যায়নি। প্রযুক্তিতে গোলমাল হত। শুনলাম ছ’‌শো কানেকশনে প্রায় ১৮০০ জন প্রোগ্রাম দেখেছে। বাড়ির সবাই মিলে। ওর স্ত্রী রূপসা দাশগুপ্ত টেকনিক্যাল বিষয়টা খুব ভাল বোঝে। সে–‌ই সবটা করেছে। ঘরের কোনায় গান গাইবার একটা জায়গা বানিয়েছিল। কী বলব তাকে?‌ স্টেজ? নাকি‌ স্টেশন‌? নাকি এক টুকরো মায়া?‌ পিয়ানো, তিন রকমের গিটার, কফি কাপ, বই আর ছবি। শুনেছি, এই মায়া সাজাতে রূপম–‌রূপসার ছোট্ট পুত্র রূপও হাত লাগিয়েছিল। তাকে হাততালি। দুর্দান্ত আলো, ক্যামেরা এবং সাউন্ড। একবারে বড় মঞ্চের মতো।
আমি নিশ্চিত কোভিড ১৯ সেদিন এই কনসার্ট দেখেছে। দেখে মাথা চাপড়ে ভেবেছে, এ কী হল!‌ এত চেষ্টা করেও এদের থামাতে পারলাম না!‌ গানের এত জোর!‌ গায়ক এবং শ্রোতাদের এত জোর!‌ বেটারা ঠিক পথ বের করে ফেলল!‌
আমি নিশ্চিত, কোনও না কোনও ভাবে, নাটক–‌যাত্রাও জিতবে। জিতবেন শিল্পী এবং কলাকুশলীরাও। জিতবেন হলের কর্মীরাও। ঠিক পথ বেরোবে। বের করতেই হবে। শুধু একটাই কথা, কেউ সফল ভাবে কিছু করলে তাকে হিংসে নয়, তাকে নাক সিঁটকোনো নয়, পথটা চিনে নিতে হবে। তারপর তো মনের জোর আর যার যতটা যোগ্যতা।  

জনপ্রিয়

Back To Top