পবিত্র সরকার: ভারতের পুবপ্রান্তে একটি সুন্দর প্রদেশ অসম, তার সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ইংরেজি বর্ণানুক্রমে তা ভারতীয় রাজ্যগুলির প্রথমে থাকলেও তা এত কাল কিছুটা গৌণ ও প্রান্তিক অবস্থানেই ছিল। হঠাৎ সারা পৃথিবীর কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে এই রাজ্য উঠে এসেছে, সকলেই ওই ছোট্ট প্রদেশটিতে কী ঘটছে তা কমবেশি বোঝবার চেষ্টা করছেন। 
অন্যদের কাছে যা নিছক কৌতূহল, প্রায় চল্লিশ লক্ষ ভারতবাসীর কাছে তা জীবন-মরণ সমস্যা। ভারতের অন্যান্য প্রদেশে যা শোনা যায়নি, অসমের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা হয়েছে, একটি NRC বা ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনশিপ’ তৈরি করে চল্লিশ লক্ষের মতো মানুষকে নাগরিক নন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে, কয়েক মাস আগে আর-একটি এনআরসি তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে বরাক উপত্যকার খ্যাতিমান নাগরিক তপোধীর ভট্টাচার্যের নাম বাদ ছিল। এবারের তালিকায় তিনি তাঁর নাম উদ্ধার করতে পেরেছেন (তপোধীর অসমের বাঙালিদের একজন সংগ্রামী মুখপাত্র), কিন্তু বাদ গেছে অসম বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের স্ত্রীর নাম, মোরিগাঁওয়ের বিধায়কের নাম–সহ আরও অনেকের নাম। তিরিশ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করেও অসমবাসী মহম্মদ আজমল হক দ্বিতীয় তালিকা থেকেও বাদ পড়েছেন। অর্থাৎ দুটি তালিকাই নানা কারণে প্রশ্নাধীন হয়ে উঠেছে, যদি বিদ্বেষ প্রণোদিত বা হাস্যকর নাও বলা যায়।
প্রশ্ন উঠবে— দেশটা তো ভারত, অসম ভারতেরই অংশ। এখানে যাঁরা ভোট দেন, তাঁরা ভারতের নাগরিক, কোনও রাজ্যের নাগরিক নন। তবে অসমে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় যা ছিল, তাকে ইংরেজিতে ‘প্যারানোইয়া’ বলা যায়, বাংলায় বলতে পারি ‘ভ্রমাতঙ্ক’, অর্থাৎ একটা ভুল ধারণাজনিত আতঙ্ক। মূল অসমবাসীদের মনোভাব যাই হোক, অসমের শাসকেরা এই আতঙ্ক জিইয়ে রেখে ভোট-নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেছেন, কংগ্রেসও, অগপ— কেউ বাদ ছিলেন না।  সে আতঙ্ক দুটি বিষয়ে। এক অসম ভাষাগত সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে, অর্থাৎ মূলত বাংলাভাষীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে তাঁদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে; আর দুই, এঁরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুও হয়ে পড়ছেন, কারণ আগেকার পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান আর পরে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা অসমে প্রবেশ করে সেখানকার হিন্দু জনসংখ্যা কমিয়ে আনছেন। অর্থাৎ ভাষা এবং ধর্ম— দু-দিক থেকেই অসমিয়া হিন্দুরা আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। তাই ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ক্ষেত্রে না হলেও অসমের সেন্সাস বা জনগণনা প্রায়ই বিঘ্নিত হয়েছে। ঠিকঠাক জনগণনা হলেই নাকি ওই ভয়ঙ্কর ছবি বেরিয়ে আসবে— এই ছিল আতঙ্কের মূলে। সব দলের সরকারকেই এই আতঙ্কের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়েছে, তা আমরা আগে বলেছি। আসলে এনআরসি শুরুই হয়েছিল রাজীব গান্ধীর আমলে, ১৯৮৫ সালে, তাঁর সঙ্গে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ‘আসু’–র এক চুক্তির মাধ্যমে।  
বাংলা ভাষা সম্বন্ধে অসমিয়াদের ভীতির একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে, হয়তো বাঙালিদের সম্বন্ধেও। এক সময় অসম বঙ্গপ্রদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল, পরে পৃথক হওয়ার পরেও বাংলা ভাষার আধিপত্য ছিল অসমের স্কুলে, রবীন্দ্রনাথও এক সময় সাময়িক মতিভ্রমবশত এই ভাষার আধিপত্যকে সমর্থন করেছিলেন। পরে তিনি নিজের ভুল সংশোধন করেন, এবং অসমও নিজের ভাষা আর সংস্কৃতিকে এখন এক সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছে।  
অন্যদিকে অসমের বাঙালিরা বহুলাংশে বহিরাগত নন। বরাক উপত্যকায় হিন্দু-মুসলমান বাঙালি ভূমিপুত্র হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে এসেছেন।  এই বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমানদের বহিরাগত বলে মার্কা মেরে দেওয়া, বা তথাকথিত illegal migrant-এর তকমা দেওয়া সত্যের ঘৃণ্য অপলাপ মাত্র। আর পূর্ব পাকিস্তান থেকে যেসব বাঙালি মুসলমান অসমে গেছেন, তা অনেক সময় অসমিয়াদেরই আমন্ত্রণে, তাঁদের জমি চাষ করার জন্য। এবং সে জমিতে তাঁরা সোনা ফলিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই অসমিয়া ভাষা শিখে অসমিয়া জনজীবনে মিশে গেছেন, অনেককে জনগণনায় মাতৃভাষা হিসেবে অসমিয়াকে লিখতে বাধ্য করা হয়েছে।
এখন ভাষা আর ধর্ম— দুইই হয়ে উঠেছে এনআরসি-র স্ক্রুটিনির বস্তু, দুটোই সমান অপরাধ। যেন এই দুটোই বেআইনি বহিরাগতদের অভ্রান্ত প্রমাণ। এঁরা অনেকেই অসমের নির্বাচনে ভোট দেন, ফলে ভারতের বৈধ নাগরিক। হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রশক্তি এঁদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে বদ্ধপরিকর। যদি বহিরাগত কেউ থাকেন— দুই রাষ্ট্রের সীমানা তো ইস্পাতের দেয়ালে গাঁথা নয় যে মানুষ বা প্রাণী ঢুকে পড়তে পারবে না। আর প্রয়োজন মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে, সাময়িক হোক, আর দীর্ঘস্থায়ী হোক। যেখানে এক বাড়ির মাঝখান দিয়ে দু দেশের সীমানা চলে যায়, গ্রামের হাট পড়ে ওপারে, সেখানে মানুষকে কে রুখবে। আমরা মুখে ‘দ্য গ্লোবাল ভিলেজ’ বা ‘ভুবনগ্রাম’ বলব আর মানুষকে তাঁর রাষ্ট্রের সীমানায় শেকল বেঁধে রাখব, এমন কি কখনও হতে পারে? আর পৃথিবীতে এক রঙা রাষ্ট্র বলে কিছু থাকবে কিনা সন্দেহ— সাদা, কালো, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ— এই রকম মোটা রঙে কোনও মানচিত্র আঁকা সম্ভব হবে না। তাই যাঁরা অসমের দীর্ঘদিনের নাগরিক, শাসকের সঙ্কীর্ণ দর্শনের ধাক্কায় তাঁদের বহিষ্কার করা শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থী হবে। আমেরিকা, ব্রিটেন আর অবিমিশ্রভাবে সাদা নেই, এক ধর্মের দেশও নয়। এই উপমহাদেশ এক সময় ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছিল, তা টেকেনি, কারণ তা মানুষের কোনও সমস্যার সমাধান করেনি। যাঁরা ভেবেছিলেন এক ধর্মের দেশ হলেই দেশে দুধ আর মধুর নদী বয়ে যাবে, তাঁরা পাকিস্তানের দশা দেখে শিক্ষা নিতে পারেন।  
এই চল্লিশ লক্ষ মানুষ কি অপরাধী, অসমের শান্তিকে প্রতিমুহূর্তে বিঘ্নিত করছেন? সেরকম কোনও খবর নেই। আমি তো অসমে বহুবার গিয়ে বাঙালি-অসমিয়া দিব্যি শান্তিতে বসবাস করেতে দেখেছি, অসম সাহিত্যসভার সম্মেলন করেছে দেখে এসেছি। প্রচুর বিয়ে হয়েছে অসমিয়া–বাঙালিতে। আর শুধু বাঙালিরাই যে আছেন তাও তো নয়, বিপুলসংখ্যক রাজবংশীরা আছেন, আছেন ভারতের অন্যান্য প্রদেশের লোকজন। মাঝখানে কিছু হাঙ্গামা হলেও দীর্ঘ ইতিহাস মূলত শান্তির ইতিহাস। এখনও আশার কথা যে, অসমের মানুষেরা শান্তির পক্ষে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। শাসকদের সিদ্ধান্ত তা কবে উল্টে দেয় কে জানে?  
রাষ্ট্র যদি তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীকে আটকাতে না পারে, সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।  যতদূর মনে হয় তা আটকাবার কোনও ছিদ্রহীন উপায় রাষ্ট্রের হাতে নেই। রাষ্ট্রকে এই বাস্তব স্বীকার করতে হবে। এই ব্যর্থতাকে ঢাকবার জন্য রাষ্ট্র প্রতিহিংসার আশ্রয় নেবে, তার চেয়ে অমানবিক আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু মানবিকতা নামক বিষয়টি দেখছি রাষ্ট্রের বিবেচনার মধ্যে পড়ে না। মানুষের একটা চিহ্ন নইলে রাষ্ট্রের মন ওঠে না, হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি, অসমিয়া— এই সব তার দয়ালু বা হিংস্র সিদ্ধান্তের ভূমি হয়ে দাঁড়ায়। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top