বাহারউদ্দিন

সম্প্রতি অমিত শাহ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০০টি আসন তঁার চাই। মানে একা, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বাংলা দখল তঁার দলের গন্তব্য। গন্তব্যের চিহ্নিত রেখার সঙ্গে বাস্তবতার যোগ আছে না নেই, তা খতিয়ে দেখার মতো দূরদৃষ্টি কোথায়? স্লোগান আর বহুমুখী বলই তবে যথেষ্ট! বিজেপি ২০০ আসন পেলে শাসক দল তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম (বাম শিবির) ও অন্যদের কি জুটবে শুধু ৯৪ আসন! 
গত বিধানসভা ভোটে ২১১ আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। রাজ্যের দ্বিতীয় বড় শক্তি বামফ্রন্টের ধস আরও বাড়ে, দখলে যায় ২৬ আসন। কংগ্রেস তার ক্ষমতা খানিকটা ধরে রাখে, নির্বাচিত হন ৪৪ জন। ১০টি আসন পায় অন্য কয়েকটি দল। অনেক গর্জনের পরেও ভোটবর্ষণে কুল্লে ৩ আসন বিজেপি–র ঘরে ঢোকে। ৩ আসন থেকে এক লাফে ২০০! বলছি না দিবাস্বপ্ন কিংবা অবাস্তবের নৃত্য। কিন্তু এ যে অসম্ভব, তা কি বলা অসঙ্গত?
গত লোকসভা ভোটে বিজেপি–র প্রাপ্তিকেও যদি গণ্য করি, তা হলেও ২০০ আসন দখল সম্ভব নয়। ১০০–র ঘরেও পৌছোনোও দূর–‌অস্ত্‌। কেন? তা একটু বিশদ ভাবে খুলে বলা দরকার। 
এক)‌ লোকসভা ভোটের পর যে–‌সব রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, তাতে কোথাও বিজেপি আশ্চর্যচিহ্ন তৈরি করতে পারেনি। ব্যতিক্রম একমাত্র ছত্তিশগড়। সর্বশেষ বিহার ভোটেও সাফল্য যৎকিঞ্চিৎ। উত্তরবঙ্গ–লাগোয়া সীমাঞ্চলে ইত্তেহাদুল মুসলিমিন নামক রহস্যময় দলটির পুনরাগমন না হলে মহাজোটই সরকার গড়ত। তেজস্বীই হতেন মুখ্যমন্ত্রী। আসাদউদ্দিন ওয়াইসি কার লোক, কার হয়ে খেলছেন, তা নবীনতম ভোটারও বুঝতে পারে। বিহারে তথাকথিত মোদি–ম্যাজিক কাজ দেয়নি। ওয়াইসিকে মাঠে নামিয়েও বিশেষ ফায়দা হয়নি। জিতে, সরকার গড়েও এনডিএ–র সাফল্য আলোহীন, সম্ভাবনাহীন।
এ–‌রকম পরিস্থিতি বাংলায় তৈরি হবে না। বজ্রগর্জন শোনা যাবে। কিন্তু বর্ষণে ভেসে যাবে না নদীকুল। যা কেউ কেউ আশা করছেন, দলে দলে সুবিধাবাদী সৌভাগ্যকামীরা গেরুয়া শিবিরে ঢুকে পড়বেন, বাংলার সংগঠিত দলগুলিতে ভগ্নদশা তৈরি হবে, তা সম্ভবত দুরাশা। কারণ— ১.‌‌ তৃণস্তরে তৃণমূলের শক্তি অক্ষত। ২. গুজবের ভারী আওয়াজ বেশি দূর টিকবে না। ৩. সিপিএমের যে–‌সব ভোট ভিন্নমুখী হয়েছিল, তারা আবার স্বভূমিতে ফিরে আসবে। এর লক্ষণ কী? শহর ছেড়ে বাইরে বেরোলেই লাল পতাকার জৌলুস ইদানীং চোখে পড়ছে। ৪. কংগ্রেসের নিজস্ব ভোট আছে, উত্তরবঙ্গ ও উত্তর ২৪ পরগনায়। এ ভোট নড়বে না, বরং বিহারে বিজেপি ও মিমের হৃদয়–‌বিনিময়ের খেলা দেখে বাংলার ভোটার বাংলার রাজনৈতিক স্থিতির প্রতিনিধিদেরই বেছে নেবেন। দ্বিতীয়ত, বাম–কং–আঁতাতে লোকসান হবে প্রধানত বিজেপি–র। ৫. ধরা যাক ওয়াইসির মজলিস তথাকথিত সাম্প্রদায়িক ঐক্যের স্লোগান তুলে ঝঁাপিয়ে পড়ল। এতে কি খুব সুবিধা হবে? উত্তরবঙ্গের জনবিন্যাসের চেহারা মিমের ডাকে কতটা সায় দেবে? পাহাড়ে প্রার্থী দিলে ১০০টিও ভোট মিলবে না। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুরের দুই জেলা এবং মালদায় মেরুকরণ আর সৌহার্দ্যের ভিত পাকাপোক্ত। হঠাৎ উদিত বহিরাগত দলকে দেখেই পরীক্ষা–নিরীক্ষায় বসে পড়বেন ভোটার? মানুষ বোকা নয়। গণতন্ত্রে তঁারা ফলপ্রসূ অধিকার প্রয়োগ করতে চান। চান নিজের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। এই মনস্তত্ত্বের নিরিখে ভাবলে মনে হয়, সামাজিক বর্জন ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে মিমের বিশেষ কোনও অর্জন হবে না।
স্বাধীনতার পর থেকে এ–‌পর্যন্ত একটি নির্বাচনেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাংলায় আমল পায়নি। ওয়াইসিদের ভেঁাতা তীরও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হবে। হ্যঁা, তঁারা যা করতে পারেন, তা হচ্ছে— গোপন বন্ধুত্বে অতিরিক্ত শক্তি জোগাবেন। কিংবা দর–‌কষাকষির রাজনীতির পরিধি বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করবেন। বাংলার মিম নেতা সৈয়দ জামিরুল হাসান নাকি ইতিমধ্যে বলেছেন, ৯৪টি আসন পেলে তঁার দল তৃণমূলের সঙ্গে দোস্তি করবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এ বয়ান সত্য হলে, প্রশ্ন করতে হয়, তা হলে কুস্তি তঁাদের কার সঙ্গে? গোপনের যে বন্ধু লোহালক্কড় দিয়ে বাংলার উত্তর ও দক্ষিণে তঁাদের আমদানি করছে, মোকাবিলা তঁাদের সঙ্গে? সম্ভব নয়? এ–‌রকম লোকবল, অর্থবল কই? সুস্থ–সবল রাজনীতির ভিতও তো নজরে পড়ছে না। তা হলে? সঙ্ঘাতের নকশা তৈরিই কি আপাতত লক্ষ্য?
ব্রিটিশ ভারতে, স্বাধীনতার ঊষালগ্নে মিমের চেহারা কী ছিল, কাদের লাঠিয়াল ছিলেন তঁারা, কেন সন্ত্রাসবাদের চড়াই–উতরাই পথ বেছে নিয়ে পরে সরে এসে তঁাদের সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল, কেন কেবল হায়দরাবাদের একটিমাত্র সংসদীয় আসন নিয়েই টিকে থাকলেন খঁাচাবন্দি বাঘ (সালাহউদ্দিন ওয়াইসি), তা অচিরেই আমরা তুলে ধরব, জানার চেষ্টা করব মিথ্যার আড়ালে চেপে–‌রাখা বিভাজনের বৃত্তান্ত! মোদ্দা কথা, ভোট লুঠতে যে–‌সব বর্গি আসছে, তঁাদের সাম্প্রতিক অতীতের অতীতও বড্ড হৃদয়হীন আর অস্বচ্ছ। বর্তমানও ফঁাদ আর খানাখন্দে ভরা।‌

জনপ্রিয়

Back To Top