অরূপ বসু: কয়েকবছর আগের ঘটনা। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের এজলাসে এক অ্যাসিড আক্রান্ত নারীর চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে একটি মামলা হচ্ছিল। দাবি এককালীন ক্ষতিপূরণ নয়, চিকিৎসার ব্যবস্থাও। প্রতিবন্ধীদের মতো, চাকরি ক্ষেত্রে সুবিধা। বিচারপতির নির্দেশে অনেকগুলো দাবি মিটেছিল। এখন অ্যাসিড আক্রান্তকে লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে হয়। স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি বা সালসা অ্যাসিড আক্রান্তদের তালিকা বানিয়েছে।
আইন বা বিচারের ক্ষেত্রে তো সব মানুষ সমান। কিন্তু সেখানে মানুষ যাবে কী করে?‌ ৯ নভেম্বর, ১৯৯৫ লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি অ্যাক্ট চালু হয়। তারাই বিপন্নের হাত ধরে বিচারসভায় নিয়ে যাবে। এ জন্য খরচ লাগবে না। কারও দরজায় কড়া নাড়তে হবে না। মহকুমা আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট, যে কোনও জায়গায় বিপন্ন ব্যক্তি গেলেই হল। আঁধারে আলোক রেখা দেখতে পাবেন। কিন্তু পাহাড়, অরণ্য, দ্বীপের মানুষ তো দূরের কথা গ্রাম, শহরের মানুষও এসব জানে না। তাই সুপ্রিম কোর্ট এবং সব হাইকোর্ট এই আইনি পরিষেবার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
৯ নভেম্বর লিগ্যাল সার্ভিসেস ডে। ১৯৯৫ সালে ওই দিন ভারতে এই কেন্দ্রীয় আইনটি চালু হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে সংসদে এই আইনের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ভারতে সংবিধান গৃহীত হয়েছে কিন্তু ১৯৫২ সালে। ১৯৯৪ সালে ১৯৮৮ সালের খসড়া আইনে একটু সংশোধন করতে হয়।
একটা ব্যাপার, এই আইনের আগেই শুধুমাত্র ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত সরকারি খরচে আইনি সাহায্য পেতেন। তাও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। সেক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বলে, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করতে হবে এবং সরকারি খরচে আইনজীবীর সহযোগিতা দিতে হবে। তারও আগে শুধু ফৌজদারি অভিযোগের ক্ষেত্রে আদালতের অধিকার ছিল নির্দেশ দেওয়ার, যাতে সরকারি খরচে মামলা লড়ার জন্য আইনজীবী পায়। এইসব করতে করতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে নির্দোষীও বিনা বিচারে কিছুদিন কারাগারে বন্দি থাকত। লিগ্যাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট ১৯৮৭‌ গৃহীত হওয়ার পর সরকারি খরচে আইনজীবী পাওয়াটা দুঃস্থ, বিপন্ন ভারতীয় নাগরিকের অধিকার। সেটাই ৯ নভেম্বর, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত রেডিও এবং টিভিতে বোঝাবেন।
প্রতি রাজ্যে সালসা বা স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির চেয়ারপার্সন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। কার্যকরী অধ্যক্ষ বরিষ্ঠতম পিউনি জাজ, কলকাতা হাইকোর্টের ক্ষেত্রে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত। ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। কার্যকরী অধ্যক্ষ বরিষ্ঠতম পিউনি জাজ।
সংবিধানের চোখে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা সব ভারতবাসীর পাওয়ার অধিকার আছে। তা নিয়ে নানা সময়ে নানা আন্দোলন, নানা দাবিদাওয়া। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশ এবং নানা আইন অনুসারে সরকারের নানা প্রকল্প। আইনি ও বিচারবিভাগীয় পরিষেবা পেতে, মানে সরকারি খরচে দুর্বল শ্রেণির মানুষের জন্য— অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। এমনকি স্বাধীনতার ৪০ বছর পর যদিও বা আইনসভা খসড়া আইন প্রণয়ন করল, তা কার্যকর করতে আরও আট বছর সময় লেগেছে। তাই লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির কাজ প্রয়োগের ব্যাপারে যাবতীয় দায়িত্ব আদালতেরই।
এমনিতেই আদালতে বিপুল পরিমাণ মামলা জমে থাকে। আরও মামলায় জড়িয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ন্যুব্জ করা কি লিগ্যাল সার্ভিসেস আইনের লক্ষ্য?‌ মোটেই তা নয়। প্রথমে আলোচনা ও সহমতের মাধ্যমে বিবাদ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়। সেজন্যই লোক আদালত। অভিজ্ঞতা বলছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাতে সমস্যার সমাধান হয় না।
কারা বিপন্ন ও দুর্বল:‌ (‌১)‌ মহিলা ও শিশু (‌২)‌ তফসিলি জাতি ও উপজাতি (‌৩)‌ শিল্প শ্রমিক, শিশু শ্রমিক ও বন্ধ কারখানার শ্রমিক (‌৪)‌ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন মানুষ (‌৫)‌ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার (‌৬)‌ মানব পাচারের শিকার (‌৭)‌ বিকলাঙ্গ ব্যক্তি (‌৮)‌ হেফাজতে থাকা ব্যক্তি (‌৯)‌ আর্থিক দিক থেকে দুর্বল ব্যক্তি।
এইসব ব্যক্তিরা বিনামূল্যে আইনজীবী পাবেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে মামলা করা সব সহযোগিতা পাবেন। যে কোনও বিবাদে আইনি সহযোগিতা পাবেন। সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা পেতে সহযোগিতা পাবেন।
বাস্তবে এগুলো যোগ্য ব্যক্তি পায় না, বা কম পায়। তার জন্য একদিকে যেমন দায়ী অসচেতনতা, আর একদিকে দায়ী একশ্রেণির আইনজীবী ও আদালত কর্মীর বিভ্রান্তিমূলক আচরণ। মানুষের মনে ও মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, বিনা পয়সার উকিল কি ভাল হবে?‌ আর এ জন্য ছোটাছুটি করতে করতে হয়রান হতে হবে!‌
বিচারপতি শৈলেন্দ্রপ্রসাদ তালুকদার লিগ্যাল সার্ভিসের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, দরকারে বহু নামী ও দক্ষ আইনজীবীকে অনুরোধ করলে তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়েন। অরুণপ্রকাশ চ্যাটার্জি, বলাই রায়, শক্তিনাথ মুখার্জি, বিকাশ ভট্টাচার্য— এরকম অনেক অভিজ্ঞতা আছে।
বিভ্রান্তি কোন পর্যায়ে, এখনও অনেক শ্রমিক লিগ্যাল সার্ভিসের সুযোগ না নিয়ে সরাসরি বিকাশ ভট্টাচার্যের মতো আইনজীবীদের কাছে যাচ্ছেন। বিকাশবাবুরা তাঁদের আগে লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির কাছে যেতে বলছেন। এ কাজটা কিন্তু করার কথা প্যারালিগ্যাল ভলান্টিয়ারদের। সময়মতো তঁাদের দেখা পাওয়া যায় না।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এখন টি বি রাধাকৃষ্ণান। এই অন্ধ্রবাসী বিচারপতি কিন্তু লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি নিয়ে মানুষের অসচেতনতা ও বিভ্রান্তির মূল কারণ বুঝতে পেরেছেন। আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারের ওপর জোর দিয়েছেন। বরিষ্ঠতম পিউনি জাজ দীপঙ্কর দত্তকে দায়িত্ব দিয়েছেন এ নিয়ে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার জন্য। ৯ নভেম্বর রেডিও, টিভিতে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের ভাষণ শুনবে মানুষ। দিল্লিতে লিগ্যাল সার্ভিসেস ডে–‌র অনুষ্ঠানে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং আন্দামান সার্কিট বেঞ্চ থেকে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর যোগ দেওয়ার কথা। আন্দামান সার্কিট কলকাতা হাইকোর্টের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে ফৌজদারি অপরাধ নেই বললেই চলে। কিন্তু আদিবাসী, আর্থিক দুর্বল ও জমিজমার মামলা প্রচুর। তাই সার্কিট থেকে কথা বলার জন্য আলাদা বিচারপতি।
কলকাতা হাইকোর্ট কিন্তু লিগ্যাল সার্ভিসের দিক থেকে একটা বড় কাজ করেছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ভিক্টিম কমপেনশেসন স্কিম ২০১৭ অনুসারে অ্যাসিড আক্রমণ, ধর্ষণ ও পাচারের একটি তালিকা বানিয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের শিকারদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য। এমনও দেখা যাচ্ছে অসচেতনতার জন্য অনেকেই ক্ষতিপূরণ ও বিচার চায়নি। তাদের জন্য সে ব্যবস্থা করছে লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি।
এটা ঘটনা, যে দেশের ও সমাজের ভালর জন্য নাগরিকদের আইন মেনে চলতে হবে। আর সেজন্যই লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি নানা কারণে বিপন্ন মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিষেবা দেয়।
বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বললেন আমরা মানুষের মনে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। আইন জানুন, নির্ভয়ে বাঁচুন। আইনের জ্ঞান মানুষকে শক্তিশালী করে। এজন্য কোনও খরচ লাগে না।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top