বাহারউদ্দিন: অতীতের সঙ্গে বসবাস করতে নেই, করলে দিনযাপন থমকে যায়, সমসাময়িকতার পাশাপাশি নির্মাণমুখর ভবিষ্যৎও অতীতমুখী রোমান্টিকতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে, দেখা দেয় নানারকম বিভ্রান্তি। যারা সন্ত্রাস ও ধর্মীয় পুনরুত্থানের প্রবক্তা, তারা বর্তমানকে নয়, আগামীকেও নয়, অতীতকে জাগ্রত করে গড়তে চায় দিশাহীন এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে দর্শন, বিজ্ঞান ও যুক্তির পরিসর ক্রমশ ছোট হয়ে আসে এবং চিন্তার নৈরাজ্য ডালপালা ছড়াতে থাকে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই সঙ্কট বাড়ছে। প্রবলতর হয়ে উঠছে অন্ধ অতীত–‌প্রীতি।
এরকম পরিস্থিতিতে যুক্তি আর বিবেচনার ভরসা কী?‌ ইতিহাসের শাশ্বত আলো এবং সংশয়হীনতার দৃঢ়তা— যা আমাদের পরম্পরা, অভিজ্ঞতা ও ঘটনাপ্রবাহের পুনর্মূল্যায়নকে সামনে নিয়ে আসবে। ব্যক্তি প্রতিভার দ্যুতিকে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেবে। বলবে, ব্যক্তির আদর্শ আর কর্মকাণ্ডের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে দেখো, ফিরে যাও ফেলে–‌আসা ঘটনায়, ঘটনার ভেতর থেকে তুলে আনো সঙ্কট–‌মুক্তির উপাদান। ইতিহাস, সমাজবিদ্যা আর আধুনিক দর্শন এখানেই একে অন্যের দোসর। এই ত্রিশক্তি এক হয়ে অতীতের আঁধারে ঢাকা–‌পড়া আলোর পুনরুদ্ধারের দাবি তোলে আমাদের মননের সামনে। সক্রেটিস থেকে ‘‌ভগবান’‌ বুদ্ধ, মহামতি অশোক থেকে সম্রাট আকবর, রবীন্দ্রনাথ থেকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী— এরকম কালজয়ী, কালোত্তীর্ণ অসংখ্য প্রজ্ঞার মত আর পথ এভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ আর কর্মের প্রাসঙ্গিকতা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এ কথা বলতে হচ্ছে, কারণ একাংশ মানুষের ভাবাবেগ আর চিন্তাকে হিংসা আর বিদ্বেষ ভয়ঙ্করের রাস্তায় ঠেলে দিচ্ছে। তাদের নির্বোধ আস্ফালনে পথ হারাচ্ছে সব ধরনের শুদ্ধতা।
গান্ধীজি ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে খাড়া করেছিলেন তাঁর অহিংসার তত্ত্ব, যা তাঁর সমাজনীতি আর রাজনীতিকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চালিত করেছে। শুধু ব্রিটিশমুক্ত ভারত তিনি চাননি, চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িকতা, অস্পৃশ্যতা আর বৈষম্যরহিত এমন একটি দেশ, যার অভিমুখকে বড় করবে গণতন্ত্র, আর গণতন্ত্রের মুখে খচিত থাকবে বিবিধের অমূল্যরতন। তাঁর স্বরাজের ধারণার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ছিল হিন্দু–‌মুসলিম ঐক্য। এই ঐক্য শুধু প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঐক্যবোধের আওতায় খ্রিস্টান, পার্সি, ইহুদি— সবার বিশ্বাস ও অস্তিত্ব অঙ্গীভূত। স্পষ্টভাষায় গান্ধীজি বলেছেন, ‘‌যাঁরা নিজেদের সংখ্যাগুরু মনে করেন এবং ভাবেন ভারত কেবল তাঁদেরই বাসভূমি, তাঁরা ভুল করছেন। যাঁদের জন্ম এই দেশে, যাঁদের জীবিকার উৎস এই দেশ, তাঁদের কেউই বহিরাগত নন। সবাই হিন্দুস্তানের সন্তান‌।’‌
শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি কর্মে, মর্মের প্রতিটি সাধনায় সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মহাত্মা। এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার তাঁর বক্তব্য ..‌.‌‌ ‘‌হিন্দু–‌মুসলিম ইউনিটি হ্যাজ বিন মাই প্যাশন ফ্রম মাই আর্লি ইয়ুথ। আই মে নট লিভ আ সিঙ্গল স্টোন আনটার্নড টু অ্যাচিভ ইট‌।’‌ এই কাঙ্ক্ষিত ঐক্য আর ঐক্যচিন্তাকে স্বরাজের, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অহিংস আন্দোলনের প্রবলতম শক্তি ভেবে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। এটাই বাহক ও সাধক। ধর্মাসক্ত গান্ধীজির ঈশ্বর বিশেষ কোনও সম্প্রদায়ের নন, তিনি সকলের প্রতিটি ধর্মাবলম্বীর অনিঃশেষ আশ্রয়। তাঁর সত্যবোধের পরিপন্থীদের সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, ‘‌যাঁরা দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছেন, পাপ তাঁদের ঘিরে আছে। .‌.‌.‌ মাই হোল সোল রিভেলস অ্যাগেইনস্ট দি আইডিয়া দ্যাট হিন্দুজ অ্যান্ড মুসলিমস রিপ্রেজেন্ট টু অ্যান্টাগোনিস্টিক কালচার্স অ্যান্ড ডক্টরিন্স। টু অ্যাসসেন্ট টু সাচ আ ডক্টরিন ইজ ফর মি ডিনায়েল অফ গড। ফর আই বিলিভ উইথ মাই হোল সোল দ্যাট দ্য গড অফ কুরান ইজ অলসো দ্য গড অফ দ্য গীতা, অ্যান্ড দ্যাট উই আর অল, নো ম্যাটার বাই হোয়াট নেম ডিজাইনড চিলড্রেন অফ দ্য সেম গড।’‌
১৯১৫ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসে ভেতরের সত্যানুভূতির সাধনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে থাকলেন গান্ধীজি। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবলতম মন্ত্র হয়ে উঠল তাঁর ঐক্যপ্রীতির বার্তা। ঈশ্বরহীন নেহরুও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকলেন। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের প্রতিনিধি মুসলিম লিগ কিংবা বিভিন্ন উগ্র হিন্দু সংগঠন গান্ধীজিকে পথের কাঁটা ভাবতে থাকল। তলে তলে তাঁকে খতম করার ছক কষল। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত ১২ বছরে ছ’‌বার মহাত্মাকে খুন করার চক্রান্ত হয়। ১৯৪৮–‌এর ৩০ জানুয়ারি সন্ধেয় দিল্লির বিড়লাভবনের প্রার্থনাসভায় যোগ দেওয়ার পথে আরএসএস সদস্য নাথুরাম গডসের গুলিতে খুন হওয়ার আগে ১৯৪৪–‌এর সেপ্টেম্বর এবং ১৯৪৮–‌এর ২০ জানুয়ারি দু’‌বার ব্যর্থ হয় নাথুরামের চেষ্টা। মহাত্মার মৃত্যুর পর ওই আততায়ী আত্মকৈফিয়ত খাড়া করে বলেছিল, গান্ধীজি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে তোলার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন বলেই সে তাঁকে হত্যা করে।
ইতিহাসের যে কোনও গভীর পড়ুয়া জানেন, গান্ধীজি দ্বিজাতি তত্ত্বের ধারণাকে কখনও মেনে নিতে পারেননি। ‘‌মুসলিম রাষ্ট্রের’‌ দাবিদাররা বলত, গান্ধী হিন্দুদের নেতা, তাই তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির প্রবল বিরোধী। আর উগ্রহিন্দুরাও ভাবত, তিনি সাম্প্রদায়িক সংহতির কথা বলে মুসলিম তোষণকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার মানে উভয় সম্প্রদায়ের অসহিষ্ণুতার পূজারিরা মহাত্মাকে শত্রু ভাবত, কিন্তু সাধারণ মানুষ ওই সব অসত্য ধারণাকে আমল দেননি। গান্ধীজি তাঁদের নজরে ত্রাণকর্তা এবং হিন্দু–‌মুসলিম ঐক্যের আপসহীন প্রবক্তা। তাঁর এই ভাবমূর্তি আজও অক্ষত। হিংসার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই, তাঁর ভেতরের রক্তক্ষরণ, তাঁর আত্মত্যাগ, তাঁর সত্যতত্ত্ব গোটা বিশ্বে বহু গণআন্দোলনের পরম আশ্রয়। সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই গান্ধীজির অহিংসার প্রাসঙ্গিকতা মুক্তিকামী মানুষের ভরসা হয়ে উঠছে। এভাবেই গান্ধীজির ভাবাদর্শ ছুঁয়ে আছে যুক্তি আর বিবেককে। এরকম প্রজ্ঞা, এরকম কর্মময় সন্ন্যাসী গত হাজার বছরের ইতিহাস কোথাও দেখেনি।
গান্ধীজি ধর্মপ্রবর্তক নন। প্রতিটি বড়, সংগঠিত ধর্মের সারাংশকে অন্তরের সত্যের সঙ্গে একাকার করে যে দর্শনের জন্ম দিয়েছেন, তাঁর আধুনিকতা, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নহীন। হিংসায় উন্মত্ত, নৈরাজ্য তাড়িত যে–‌কোনও দেশের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সত্যপ্রীতি ও সাধনা দিকশিখার ভূমিকা পালন করবে। সমাজ বারবার তাঁর দিকে ফিরে তাকাবে অবাক বিস্ময়ে। খুঁজতে থাকবে তাঁর দর্শনের উৎস আর বিস্তারের মহিমা। তাঁর সমকাল, যা এখন অতীত, তাঁর সঙ্গলাভ নয়, ওই ইতিহাস, ওই সব ঘটনাপ্রবাহ, ওই অভিজ্ঞতা স্পর্শ করে খতিয়ে দেখবে রাষ্ট্র আর সমাজের অবস্থান এবং নিজেই নিজের ভাগ্যলিপি রচনা করবে।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top