সুমন সেনগুপ্ত- আজকাল বহু মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই হয়তো হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন, পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। এই হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে কিছুদিন আগে একটি বিতর্ক ছড়িয়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফেসবুকেরও মালিক গোষ্ঠী মার্কিন আদালতে এক ইজরায়েলি সাইবার–‌যুদ্ধ ব্যবসায়ী সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। অভিযোগ ছিল, তারা ‘‌পেগাসাস’‌ নামে একটি ভাইরাস লোকের অজান্তে তাদের ফোনে ইনস্টল করে দিয়েছে। যে ভাইরাস ফোনের কল লিস্ট, কন্ট্যাক্ট, ক্যালেন্ডার, কথাবার্তা— সবই গোপনে পাচার করতে পারবে। ফোন বন্ধ থাকলেও, তার অবস্থান থাকবে পেগাসাসের নজরে। ইজরায়েলের যুদ্ধ ‌ব্যবসায়ী এনএসও গ্রুপ এই তুখোড় গুপ্তচর সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি খবর এই একই সময়ে বা তার আগে–পরে নজরে পড়েছে, যা মাথায় রাখা জরুরি।
১। তামিলনাডু হাইকোর্টে একটি পিটিশনের শুনানির সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল প্রস্তাব দিয়েছেন যে, ফেক নিউজ আটকানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে আধারকে যোগ করতে হবে।
২। ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে সারা দেশ জুড়ে এবং এই প্রক্রিয়াতে বহু মানুষকে বলা হচ্ছে যে, আধার দিয়ে এই মেলানোর কাজটা করতে এবং বহু রাজনৈতিক দল বুঝে অথবা না বুঝে এই প্রক্রিয়াতে মানুষকে অংশগ্রহণ করাচ্ছে। এর পরের ধাপ হবে আধার দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া করানোকে বাধ্যতামূলক করা।
৩। ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জুকারবার্গ বলেছেন যে, তাঁরা ফেসবুকের মেসেঞ্জারে যে মেসেজ আদানপ্রদান হয়, তা তাঁরা পড়তে পারেন।
৪। ট্রাই নতুন নিয়ম চালু করতে চলেছে, যার ফলে এরপর বাড়িতে টিভি দেখতে গেলে আধার জমা করতে হবে।
অনেকেই বলতে পারেন, আবার সেই গোরুর রচনার মতো আধারের প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনা কেন? আধারের সঙ্গে তো হোয়াটসওয়্যাপের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁদের একটা ছোট্ট খবর দেওয়া জরুরি। এই ইজরায়েলি সাইবার–যুদ্ধ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিক ফ্রাঞ্চেস্কো পার্টনারস। এদেরই আরেকটা কোম্পানি ক্রসম্যাচ, যারা ভারতে আধার কার্ড বানানোর জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। যারা সমস্ত ভারতবাসীর আঙুলের ছাপ, রেটিনা, মুখের ছবি স্ক্যান ইত্যাদি অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্যের অধিকারী।
অর্থাৎ এই এনএসও গ্রুপ এবং ক্রসম্যাচ, যারা আমার–‌আপনার আধার করিয়েছিল, তারা ঘটনাচক্রে একই মালিকানাধীন। এই পেগাসাস সম্পর্কে জানা গেল যে, ভারতবর্ষের বেশ কিছু সাংবাদিক, দলিত সমাজকর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতা–নেত্রীর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে কাজে লাগানো হয়েছিল। যঁারা আদিবাসী, দলিত নারী, শিশু, তাঁদের পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি নিয়ে কাজকর্ম করে থাকেন। এঁদের কাজ রাজনৈতিক নয়, তবে গরিব আদিবাসী কেন খেতে–‌পরতে পায় না প্রশ্ন করলে সব দলের সরকারই খুব রেগে যায়। তাই কি নির্বাচনের মুখে যাতে এই মানুষদের কথা সাধারণ মানুষের কানে, বা বলা ভাল, ফোনে না পৌঁছয়, তাই কি বেছে বেছে কিছু মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এই নজরদারি চালানো হয়েছিল? জানা যাচ্ছে, মাত্র ১০টি ফোনে এই পেগাসাস ঢোকাতে খরচ হয় ৩৫০ কোটি টাকা!‌ সেখানে ১৪০০ জন মানুষের ফোনে এই ভাইরাস দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। সরকার না চাইলে কি এত টাকা কোনও ব্যক্তিমানুষ এই ১৪০০ জনের পিছনে এমনি খরচ করেছে? নাকি এই ১৪০০ মানুষ এতটাই শক্তিশালী যে, এঁরা সরকার উল্টে দিতে পারেন? 
পেগাসাস প্রসঙ্গে যখন অভিযোগ উঠেছে, তখন সরকারের তরফ থেকে কী বলা হয়েছিল? তারা হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানির কাছে জানতে চাইবে কেন এটা করা হয়েছে? হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানি কিন্তু অনবরত বলে চলেছে যে তারা সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল। ২০১৯ মার্চ থেকেই তারা 
নাকি বলে আসছে এই কথা। তা হলে সরকার তখন আমল দেয়নি কেন? তাহলে কি তারাই এই গুপ্তচরবৃত্তিতে 
সহায়তা করেছিল?
রাস্তাঘাটে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে যে আধারের সঙ্গে ভোটার কার্ডের লিঙ্ক করাতে হবে। ২০১৯ মার্চ থেকে জাতীয় পপুলেশন রেজিস্টার বানানোর প্রক্রিয়া চালু হবে। বাড়ি বাড়ি যাবে ওই দপ্তরের লোকজন এবং তথ্য নেবে। তথ্য মানে ডেমোগ্রাফিক এবং বায়োমেট্রিক তথ্য। ২০১১ সালেও এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখন কেবল ডেমোগ্রাফিক তথ্য, অর্থাৎ নাম, ঠিকানা, বয়স, লিঙ্গ, এসব নেওয়া হয়েছিল। বায়োমেট্রিক, অর্থাৎ হাতের আঙুলের ছাপ বা চোখের মণি বা মুখের ছবি নেওয়া হয়নি। কারণ, ২০০৯ সাল থেকে আধার চালু হয়ে গেছিল। কিন্তু তখন এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ যাওয়ার ভয় ছিল না। কিন্তু এবার সেই ভয়টা যুক্ত হয়েছে। এনপিআরে এবার আধার চাইবে। যদি আধার দিয়ে দেওয়া হয়, বুঝে অথবা না বুঝে, তা হলে কিছুদিন পর নির্বাচন কমিশন বলবে, এই দেখুন সবাই স্বেচ্ছায় দিয়েছেন। তাই এবার আধার দিয়েই ভোট হোক।
আপনি বলতে পারেন তাতে দোষ কোথায়? আরটিআই করে জানা গেছে যে, আধারের তথ্য কারুর দ্বারা পরীক্ষিত নয়। কত ভুয়ো আধার আছে, তাও জানা নেই। তা হলে কী দাঁড়াল?‌ আধার, যা কোনও কিছুরই পরিচায়ক নয়, সেই আধার দিয়েই যদি ভোট হয়, তাহলে তো আধার এবং কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা, যা দিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকেও প্রভাবিত করা হয়েছিল বলে খবর, সেই একই রকম হবে। তারপর সব ভোট ওদের!‌
অন্য দিকটাও ভাবুন। আধারকে সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত করলে এটা জানা কি খুব কঠিন যে কারা সরকারের বিরোধী? এবার যদি সেই সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দেখে কোনও মানুষকে বাদ দিতে হয়, সেটা কি খুব কঠিন কাজ হবে? যখন আধার নাগরিকত্বের পরিচয় নয়, তখন কেন সেটাকে ভোটার কার্ডের সঙ্গে সংযোগ করা হচ্ছে ঘুরপথে? এই প্রশ্নগুলো কি করার সময় হয়নি? না হলে প্রত্যেক নাগরিক যেদিন ‘বিগ ব্রাদার’–এর নজরবন্দি হয়ে যাবেন, তখন কিন্তু আর কিছু করার থাকবে না।
(‌লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুকার ও সমাজকর্মী)‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top