শাহানাজ পারভিন- আমাদের সমাজ তথা দেশের উন্নতির অন্যতম প্রধান খুঁটি হল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আর এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কান্ডারি হলেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বছরের ৩৬৫ দিন অক্লান্ত পরিষেবার জন্য আমাদের উচিত তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যঁাদের জন্য আমরা সুস্থ সবলভাবে জীবন যাপন করছি, তঁাদের উৎসর্গ করে একটা ‘‌বিশেষ’‌ দিনও যে আছে, সে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন না জানতে চাইলেও সকলে সব দিনেরই খোঁজ পেয়ে যাচ্ছেন। তাই ভার্চুয়াল জগতে আমরা সবাই অনেক সচেতন। যে কোনও দিনে আমরা কোনও রকম জ্ঞান ছাড়াই নিমেষে করে দিতে পারি ‘‌মর্মস্পর্শী’‌ পোস্ট। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃত জীবনের সঙ্গে তার কোনও মিল পাওয়া যায় না।
চিকিৎসক দিবসের উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান জানানো। সর্বপ্রথম চিকিৎসক দিবস পালন করা হয়েছিল ১৯৩৩ সালে, ৩০ মার্চ, আমেরিকায়। এবং এই দিনটির প্রচলন করেন ডাঃ চার্লস বি অ্যালমন্ড–‌এর স্ত্রী এউডোরা ব্রাউন অ্যালমন্ড। দিনটি কারও জন্মদিন উপলক্ষে পালিত হয়নি। ১৮৪২ সালের ৩০ মার্চ, ডাঃ ক্রফোর্ড ডব্লিউ লং শল্য চিকিৎসায় সর্বপ্রথম অ্যানেস্থেশিয়ার ব্যবহার করেন, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ঘটনা বলে উল্লেখিত। সেই দিনটিকে স্মরণ করে প্রথমে চিকিৎসক দিবস পালিত হয়। তবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দিনে চিকিৎসক দিবস পালন করা হয়। ব্রাজিলে চিকিৎসক দিবস পালন করা হয় ১৮ অক্টোবর, সেন্ট লুক নামে এক চিকিৎসকের জন্মদিনে। কিউবা, আর্জেন্টিনা, স্পেনের মতো কিছু স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা দেশে চিকিৎসক দিবস পালিত হয় ৩ ডিসেম্বর, ডাঃ কার্লোস হুয়ান ফিনলের জন্মদিনে। যিনি ইয়েলো ফিভার নামের প্রাণঘাতী রোগের জীবাণুর বাহক হিসেবে মশাকে চিহ্নিত করেন। দীর্ঘদিন অবহেলিত হওয়ার পর তাঁর কাজটি স্বীকৃতি লাভ করে। কানাডাতে এই দিনটি পালিত হয় পয়লা মে। আমাদের দেশে সেটি পয়লা জুলাই, প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিনে।
সারা বিশ্বে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দিনে পালিত হলেও এর উদ্দেশ্য একটাই। চিকিৎসার পেশাকে সম্মান জানানো। যঁারা দিনরাত এক করে, আত্মীয়স্বজন, পরিবার–পরিজন, উৎসব–আনন্দ ভুলে নিজেদের উৎসর্গ করেন মানবকল্যাণে, তঁাদের কাজকে সম্মান জানাতেই দিনটি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে এই দিনটি ক্যালেন্ডার আর সোশ্যাল মিডিয়ার গন্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। না–‌হলে যে দেশে চিকিৎসকদের ঈশ্বর মানা হত, সে দেশে চিকিৎসকদের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার নেমে আসত না। গোটা ভারত জুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। অনেক উদাহরণ আছে যেখানে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের কল্যাণে অনেক বড় বড় কাজ করে গেছেন এবং যাচ্ছেন। কিন্তু খুঁজলে গুটিকয়েক উদাহরণ পাওয়া যাবে যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের কাজের মাধ্যমে চিকিৎসকদের সম্মান জানিয়েছেন। অথচ আমাদের কোনও আত্মীয় বা পরিবারের কোনও সদস্য অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকলে আমরা বাড়িতে এসে একটু হলেও স্বস্তিতে ঘুমোই। কিন্তু ডিউটিতে থাকা সেই চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা সারা রাত জেগে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যান। তবুও এই সমাজে তাঁকেই বার বার শিকার হতে হয় বিভিন্ন রকম অত্যাচারের, অকথ্য গালিগালাজের। এই চিকিৎসক দিবসে আমাদের একবার ভেবে দেখা উচিত যে এভাবে আমরা সমাজ তথা দেশের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি না তো? ‌চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করতে গেলে আমাদের উচিত স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাড়িয়ে তাঁদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করা। পরিকাঠামোগত ত্রুটির জন্য তঁাদের কাঠগড়ায় না তোলা। চিকিৎসা খাতে যাতে অধিক বিনিয়োগ হয় তার জন্য সরকারকে চাপ দেওয়া। তবেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভগ্নদশা কিছুটা হলেও মেরামত হবে।
কিন্তু আমরা সব সময় আবেগের বশে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দিই। ফলে গোটা ব্যবস্থাটাই সময় সময় অকেজো হয়ে পড়ে। আর তার ফল ভুগতে হয় অন্যদের, যঁারা অসুস্থ, চিকিৎসাপ্রার্থী। আমরা ভুলে যাই স্বাস্থ্য পরিষেবার যে যৎসামান্য পরিকাঠামো, তা অক্ষত রাখার দায়িত্ব আমাদেরও। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিলেও তার কিছুটা কাজ হয়। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top