সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: ভারতের জনসংখ্যা খাদ্য সুরক্ষার সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা কৃষিজমির ওপর বিপুল চাপ তৈরি করেছে। উর্বরা জমি বাড়ছে না, অথচ কৃষিপণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। জমির উৎপাদন যেহেতু সীমাহীন নয়, সেহেতু কৃষি উৎপাদনে আবদ্ধতা চোখে পড়তে শুরু করেছে। বাস্তব তথ্য হল, কৃষি–‌বৃদ্ধির হার নিম্নমুখী। আর জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, প্রাণিজাত দ্রব্য ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার বেশ সন্তোষজনক।
বর্তমানে দেশের জিডিপি–‌র ৪%‌ প্রাণিসম্পদ থেকে আসে। মোট কৃষি সংক্রান্ত জিডিপি–‌র ২৫%‌ প্রাণিসম্পদের অবদান। মাছ উৎপাদনের বার্ষিক গড় বৃদ্ধি প্রায় ৬%‌। দেশের জিডিপি–‌র ১% আসে মাছ চাষ থেকে। এক কথায় প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ দেশীয় অর্থনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। দুধ উৎপাদনে ভারত এখন বিশ্বে প্রথম। দেশের গড় দুধ উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ১৯ কোটি টন। পাশাপাশি ডিম ও মাংস উৎপাদনও বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। এখন প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি‌ মুরগির ডিম, প্রায় ৮১ লক্ষ টন মাংস এবং ৪ কোটি কেজি উল উৎপাদিত হচ্ছে। এই সমস্তই সম্ভব হচ্ছে ভারতবর্ষের বিপুল সংখ্যক প্রাণী প্রজাতিকে প্রতিপালন ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিচর্যার মাধ্যমে। সর্বশেষ প্রাণী আদমশুমার (‌২০১২)‌ অনুযায়ী আমাদের দেশে রয়েছে ১৯ কোটি গবাদি প্রাণী, ১০.‌৮ কোটি মোষ, ৬.‌৫ কোটি ভেড়া, ১৩.‌৫ কোটি ছাগল, ১ কোটি শূকর এবং ৬৯.‌২ কোটি মুরগি। বিশ্বের মোট প্রাণী সংখ্যার তুলনায় ভারত আজ গবাদি প্রাণীতে দ্বিতীয়, মোষের সংখ্যায় প্রথম এবং ভেড়ার সংখ্যায় তৃতীয়। বোঝাই যাচ্ছে, দেশের এই বিপুল প্রাণিসম্পদের পুষ্টি, রোগ নিরাময় ও তাদের পোষণকে নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ। নীতি নির্ধারকরা একমত যে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে প্রাণিসম্পদের বিকাশ একটি অন্যতম হাতিয়ার। আর সেই লক্ষ্যপূরণে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাণী পালন অন্যতম শর্ত। অবশ্য সে জন্য প্রয়োজন প্রাণী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত একঝাঁক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ। এই ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে প্রাণিবিজ্ঞান সংক্রান্ত পঠন–‌পাঠন ও গবেষণার ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপের মধ্যে দিয়ে। অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে পৃথক প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৯০ সালে তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে প্রথম প্রাণী চিকিৎসা সংক্রান্ত (‌ভেটেরিনারি) বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এই উদ্যোগের সূচনা হয়। ভারতের দ্বিতীয় ভেটেরিনারি ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় আমাদের রাজ্যে, কলকাতার বেলগাছিয়ায় ১৯৯৫ সালে। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পৃথক প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৪। ভারতে মোট ৫১টি সরকারি এবং ৩টি বেসরকারি প্রাণী চিকিৎসা বিজ্ঞান মহাবিদ্যালয়/‌অনুষদ রয়েছে।
১৮৯৪ সালে কলকাতার বেলগাছিয়ায় তৈরি হয় একটি ভেটেরিনারি স্কুল ও হাসপাতাল, যা ১৮৯৬ সালে কলেজের মর্যাদা পায়। এই বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজ পরে দু’‌বার কল্যাণীর কাছে মোহনপুরে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৯৫। প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও দ্বিতীয়বার বিধানচন্দ্র কৃষি বিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৯৫ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান 
বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত একটি ফ্যাকাল্টির পূর্ণ মর্যাদা পায়।
২০১৪ সালে রাজ্য সরকারের আদেশনামা অনুযায়ী ভেটেরিনারি ফ্যাকাল্টির স্নাতকস্তরের পঠন‌–‌পাঠন পুনরায় মোহনপুরে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমান সময়ে মোহনপুরে প্রাণী চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্নাতকস্তরের পঠন–‌পাঠন এবং বেলগাছিয়ায় স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণার কাজ সমাধা হচ্ছে। সম্প্রতি স্নাতকোত্তর স্তরের পঠন–‌পাঠনকে মোহনপুর ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারক কাউন্সিলগুলোতে আলোচিত হয়েছে। আর তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। অতীতে বারবার স্থানান্তরের ফলে এই সংক্রান্ত সমস্যায় পড়তে হয়েছে ভেটেরিনারি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সকলকে। অপচয় হয়েছে রাজ্যের মানুষের অর্থ।
শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রগতিশীলতার লক্ষণ। যে কোনও সভ্য ও উন্নত সমাজেই এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশ–‌এর মতো রাজ্যে ৫টি করে, তামিলনাড়ুতে ৭টি, কর্ণাটক ও গুজরাটে ৪টি করে, মধ্যপ্রদেশে ৩টি, এমনকী কেরালাতে ২টি ভেটেরিনারি কলেজ রয়েছে, যেখানে আমাদের রাজ্যে রয়েছে মাত্র ১টি।
রাজ্যের ভেটেরিনারি শিক্ষার সম্প্রসারণ আজ সময়ের দাবি। বর্তমান রাজ্য সরকারের অভিমুখও নতুন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুকূল। এই অবস্থায় রাজ্যে কৃষি অর্থনীতির পরিপূরক হিসাবে প্রাণিসম্পদের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একাধিক ভেটেরিনারি কলেজ স্থাপন জরুরি। বেলগাছিয়ায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বর্তমানে নদিয়া জেলার মোহনপুরের স্নাতক স্তরের পঠন–‌পাঠনের পাশাপাশি বেলগাছিয়াতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিমের জেলাগুলোতে আরও কলেজ তৈরি করা যেতে পারে। তবে ভেটেরিনারি কলেজ আর পাঁচটা সাধারণ বিজ্ঞান কলেজ–‌এর মতো নয়। এর পরিকাঠামোয় হাতে–‌কলমে শিক্ষাদানের জন্য প্রাণীখামার ও প্রাণী হাসপাতাল থাকা জরুরি। ভেটেরিনারি শিক্ষার ন্যূনতম মান বজায় না থাকলে, কেন্দ্রীয় সংস্থা (‌ভেটেরিনারি কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া)‌–‌র অনুমোদন মিলবে না। তাই সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ভেটেরিনারি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যাতে আগামী দিনে প্রাণী চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত শিক্ষা ও পেশার মান বজায় থাকে এবং রাজ্যের সাধারণ মানুষের আর্থ–‌সামাজিক মানোন্নয়নে তা ফলপ্রসূ হয়।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top