ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: বাজেট দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, অর্থমন্ত্রী আর আমরা দুটো আলাদা দেশের বাসিন্দা। উনি থাকেন ৫ লক্ষ কোটির অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এক দেশে, যে‌–‌দেশ গর্ব করে বলে, আমাদের ধার তো খুবই কম, দরকার পড়লে বিদেশ থেকে ধার করব। যে–দেশ সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য সমস্ত জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কার তোয়াক্কা না করে সেস আর সড়ক কর চাপিয়ে পেট্রোল–‌ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় লিটারপিছু ২ টাকা বাড়িয়ে দেয়। আর, আমরা যে–‌দেশে থাকি, সেখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সাধের মেক ইন ইন্ডিয়া, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, বেকারের সংখ্যা ভয়াবহ, চাষিরা হাহাকার করছে, আর্থিক বৃদ্ধির হার কমছে। কী আশ্চর্য, এ–‌সব নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কোনও উদ্বেগই নেই! অন্তত তঁার বাজেট–‌ভাষণে তো নেই। একবার শুধু বললেন, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে–‌পিছে এই বিষয়ে আর একটি শব্দও নয়। নতুন বিনিয়োগ টানতে কোনও উদ্যোগ বা পরিকল্পনার কথা, ছোট আর মাঝারি শিল্পের হাজারো সমস্যা সমাধানের কথা, কই, শুনলাম না তো কিছু! আর, চাষিদের কথা? বেমালুম ভুলেই গেলেন উল্লেখ করতে। পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক জোর দিয়ে আগামী ৫ বছরে ১০০ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করা হবে বলে জানালেও, তঁার প্রথম বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ কোনও নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পের কথা কিন্তু ঘোষণা করেননি অর্থমন্ত্রী। করদাতাদের ধন্যবাদ দিলেন একবার, দু’‌বার, তিনবার। বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় যেমন করমুক্ত ছিল, তেমনই রইল। তবে তার চেয়ে বেশি আয় যঁাদের, তঁারা ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্তই আয়কর ছাড়ের সুবিধে পাবেন। আয়কর বাড়ল বছরে ২ কোটি টাকার বেশি আয় যঁাদের। ২০১৮-১৯ অর্থ বর্ষে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেকটাই কম, সে–‌কথাও, সত্যি বলতে কী, চেপেই গিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থনৈতিক বাস্তবের সঙ্গে এতটাই সম্পর্কহীন ২০১৯-২০ সালের পূর্ণাঙ্গ বাজেট। গোদরেজ গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান আদি গোদরেজ তো সাফ বলে দিলেন, আর্থিক বৃদ্ধির দিকে নজরই দেওয়া হয়নি এই বাজেটে।
গোদরেজ চটলেও, ব্যবসায়ী–‌মহল সাধারণ ভাবে খুশি বছরে ৪০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যবসা যে–‌সব সংস্থার, বাজেটে তাদের সবার জন্য করের একটাই হার ২৫% বেঁধে দেওয়ায়। দোকানিরাও খুশি, কারণ কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটার ওপর ব্যবসায়ীদের যে–‌টাকা গুনতে হয়, তাও পেয়েছে সম্পূর্ণ ছাড়। গৃহঋণে সুদের ওপর কর–‌ছাড় বেড়েছে, বিদ্যুৎচালিত গাড়ি কেনার জন্য ঋণ নিলেও সেই সুদের ওপর এবার পাওয়া যাবে নতুন কর–‌ছাড়। তাতে টোটো কেনা না–‌হয় খানিকটা সহজ হল!‌ কিন্তু গ্রামীণ আয় বাড়বে কীসে? না, তারও কোনও হদিশ এই বাজেট দেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, বাজেট–‌ভাষণ থেকে আমরা জানতেই পারলাম না, কোন্‌ খাতে বরাদ্দ বাড়ল আর কমলই–‌বা কোন্‌ খাতে। সে–কথা জানতে হবে বিশদ হিসেবের কাগজপত্র ঘেঁটে। এই একটা ‘‌নতুন’‌ দেখালেন বটে নতুন অর্থমন্ত্রী। তাই এখনও জানা যাচ্ছে না, সিগারেটের দাম ঠিক কতটা বাড়ল।
পেট্রোল–‌ডিজেলে কর বাড়িয়ে সরকারের আয় বাড়ানোর চিন্তাহীন ব্যবস্থা নরেন্দ্র মোদির পুরনো ফর্মুলা। জিএসটি আমলে আর কিছু তো হাতে নেই, আছে পেট্রোল–‌ডিজেল। তার দাম একতরফা বাড়িয়ে গেলেই অর্থনীতির চাকা ঘুরতে থাকবে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পরপরই টানা দু’‌বছর অশোধিত তেলের দাম কমেছিল। তার সুযোগ নিয়ে পরপর ৯ দফায় বাড়ানো হয়েছিল পেট্রোল–‌ডিজেলের দাম। এখন আবার অশোধিত তেলের দাম কমার হাওয়া উঠতেই মোদি–‌সরকার সেই পুরনো পথ ধরল। মনে হচ্ছে, নির্মলা সীতারামনকে বাজেট নিয়ে ভাবনা–‌চিন্তার সুযোগই দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছিল, আর কিছুই করতে হবে না, শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম যত নরম হবে, পেট্রোল–‌ডিজেলের ওপর ট্যাক্স ততই বাড়িয়ে যেতে হবে। তাতেই দেশ চলবে। নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রিয় লব্জ ‘আই রিপিট’ ব্যবহার করে বলতে হয়, পেট্রোল–‌ডিজেলে ট্যাক্স বাড়াও, দেশ চালাও।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top