দেবর্ষি ভট্টাচার্য

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। কলঙ্কিত দিনটির ছাপ চিরস্থায়ী হয়ে গেছে ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাতায়। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে ভারতবর্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক আঙিনার উর্বর চারণভূমি থেকে উদ্গত স্পর্শকাতরতাকে সুকৌশলে ভোটবন্দি করে রাজ্যপাট দখলের সমীকরণটা কোনও এক বিশেষ রাজনৈতিক দল সম্যক ভাবে রপ্ত করে নিয়েছে। আর ’‌৯২ ডিসেম্বরের সেই নাটকীয় দুর্যোগের ওপর অবশেষে যবনিকা পড়ল ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের রায়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশি–সহ মোট ৩২ জন অভিযুক্ত বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অভিযোগের দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পেলেন।
গত বছরের ৯ নভেম্বরের মহামান্য শীর্ষ আদালতের ১,০৪৫ পাতার রায়ে মন্দির–মসজিদ নিয়ে মধ্যযুগ থেকে বয়ে–‌আসা এক অতি–‌স্পর্শকাতর বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের রায় ২৮ বছর আগে সংগঠিত সেই ন্যক্কারজনক ঘটনার সব অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দিলেও, ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কিছু অ্যাকাডেমিক আলোচনা ও পর্যালোচনা এড়িয়ে যেতে পারছে না। যে–‌কোনও গণতান্ত্রিক আবহে যে অবকাশটুকু থাকতেই পারে। আর, যখন দেখি, মথুরার কৃষ্ণ–‌জন্মভূমি নিয়েও মামলা গ্রহণ করছে আদালত, তখন শঙ্কা জাগেই, সত্যিই কি সব বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল?
আজ যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, এক অতি–স্প‌র্শকাতর বিতর্কের অবসানে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার আর প্রয়োজন কী, তঁারাই কিন্তু শবরীমালা মন্দিরের প্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালতের রায় প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কোনও রায়ই মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগের পরিপন্থী হতে পারে না। আশ্চর্যজনক ভাবে সেই প্রবক্তাদের মধ্যে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি এই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে! মহামান্য মন্ত্রীমশাই যদি নিখাদ নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে থাকেন, তবে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ অধম প্রজার মধ্যে আর দোষ খোঁজার বালাই কেন!
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধান স্বাধীন ভারতে কার্যকরী হয়। পরাধীন ভারতবর্ষে এত দিন পর্যন্ত যা কিছু সংরক্ষিত ছিল, ওই দিনটিই তার ‘কাট–‌অফ’ সময়কাল বলে যদি ধরে নেওয়া হয়, তা হলে ওই দিনে অযোধ্যার বিতর্কিত স্থানে বাবরি মসজিদের অস্তিত্বই কিন্তু ইতিহাসসিদ্ধ। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ প্রায় পাঁচশো বছর ধরে ইতিহাসসিদ্ধ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য। হতে পারে এই মসজিদ গড়া হয়েছিল অন্য কোনও ধর্মীয় স্থাপত্যকে ধ্বংস করেই। মধ্যযুগে এমনটি যে আকছার ঘটেছে, তা তো ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই চোখে পড়ে। কিন্তু মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে অতিক্রম করে আধুনিক যুগের মানুষদেরও এতটুকু কুণ্ঠাবোধ হয়নি ধর্মের মুখোশ পরে আদালতের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কেবলমাত্র পেশিশক্তির আস্ফালনে প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক সৌধকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিতে! এ ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বর্বরদের থেকে আধুনিকমনস্ক মানুষদের ব্যবধানটাই তো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে! গত বছরের ৯ নভেম্বর মহামান্য শীর্ষ আদালতের রায়ে বার বার উল্লেখ রয়েছে যে, সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডনীয়। সিবিআই আদালতও সেদিনের সেই বর্বরোচিত ঘটনাকে অপরাধ হিসেবেই মান্যতা দিয়েছে।
তা হলে প্রশ্ন জাগে, ৩২ জন অভিযুক্তই যদি নিরপরাধ হয়ে থাকেন, তা হলে এই জঘন্য ফৌজদারি অপরাধের প্রকৃত অপরাধী কে বা কারা ছিল? দীর্ঘ ২৮ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সেই দানবীয় ধ্বংসলীলার জন্য দায়ী এমন একজনকেও কিন্তু দণ্ডিত করা গেল না! দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালত বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডনীয় বলা সত্ত্বেও সেই ন্যক্কারজনক ধ্বংসের নেপথ্যে কোনও চিহ্নিত অপরাধীই কিন্তু ইতিহাসের পাতায় পড়ে রইল না! অথচ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা শুধুমাত্র একটি ফৌজদারি অপরাধই নয়, এই ঘটনা ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ সত্তার ওপর চরম কুঠারাঘাতও বটে।
মূলত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবেই ওই ৩২ জন অভিযুক্তকে আদালত বেকসুর খালাস করেছে বলে রায়ে বলা হয়েছে। একটি সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক সৌধ–‌চত্বরে ধর্মোন্মাদ জনতাকে একত্রিত করে মন্দির নির্মাণের জন্য সোচ্চার হুঙ্কারকে মসজিদ ধ্বংসের প্ররোচনা হিসাবে মান্যতা না দেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ জনমানসে স্পষ্ট হওয়া কিন্তু ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষতাকে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। ধর্মোন্মাদ কিছু মানুষ এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কাছে যে মন্দির নির্মাণের পূর্বশর্ত হিসেবে একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যকে ভূমিসাৎ করা অবশ্যপালনীয় ছিল, সেই মন্দির নির্মাণের আহ্বানে বহু মানুষকে একত্রিত করার কর্মকাণ্ড মসজিদ ধ্বংসের প্ররোচনা হিসেবে চিহ্নিত না হওয়ার ঘটনা আপামর দেশবাসীকে অবাক করেছে বৈকি! সেই ধ্বংসলীলাকে সম্পন্ন করতে সেদিন কোনও বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল এবং তার শাখা সংগঠনের নেতারা যে প্ররোচনামূলক অনর্গল ভাষণ দিয়েছিলেন, তার সাক্ষ্যপ্রমাণ যদি বা না–‌ও থেকে থাকে, অযোধ্যায় করসেবার আহ্বানে করসেবকদের বিপুল জমায়েত এবং মন্দির নির্মাণের শপথের হুঙ্কার তো প্রমাণহীন ও গোপন ছিল না! ঠিক একই লক্ষ্যে আদবানিজির রথযাত্রাও তো প্রমাণহীন নয়! সিবিআই আদালতের রায়ে এইসকল প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আদৌ মিলল কি!
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের প্রাক্কালেই হাজার হাজার ধর্মোন্মাদ মানুষ (যারা নাকি করসেবক!) আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে বাবরি মসজিদের আশপাশে জমায়েত শুরু করলেন। অথচ কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকার কীভাবে তা অনুমোদন করল, তার বিচার কিন্তু অধরাই থেকে গেল! আর সেই আদালত অবমাননার দায় থেকে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকার কীভাবেই বা অব্যাহতি পেল, সেই প্রশ্নও কিন্তু উত্তরহীন থেকে গেল! অন্য দিকে, মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটা যদি তাৎক্ষণিক আবেগের ফল হয়েও থাকে, তা হলেও এমন গর্হিত অপকর্মের জন্য ২৮ বছর ধরে কোনও অপরাধীকেই চিহ্নিত করা গেল না কেন, সেই প্রশ্নও কিন্তু রহস্যাবৃতই রয়ে গেল! স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এমন এক ন্যক্কারজনক ধ্বংসলীলা সংগঠিত হল, অথচ সেই ভয়ানক অপরাধে অপরাধীর সংখ্যা শূন্য! ইতিহাস কি লজ্জা পাবে না?‌
বিতর্কিত জমির ভাগ–‌বাঁটোয়ারা না–‌হয় পরিশেষে মহামান্য শীর্ষ আদালতের নির্দেশক্রমে সুসম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু আধুনিক মানুষজন–‌কৃত পাঁচশো বছরের পুরনো ইতিহাসসিদ্ধ একটি স্থাপত্য বর্বরোচিতভাবে পেশিশক্তির আস্ফালনে চূর্ণ করার বিচার কিন্তু এত দিনেও অধরাই থেকে গেল! কারণ, এমন গর্হিত অপরাধ সংগঠিত করার পরেও আমাদের বিচার–‌ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত একজন অপরাধীকেও শনাক্ত করে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে অক্ষম। তাই কয়েক শতাব্দীপ্রাচীন এই অতি–‌স্পর্শকাতর বিতর্ক যেন শেষ হয়েও একপেশে অসম্পূর্ণতায় বিদ্ধ হয়ে রয়ে গেল, এমন ভাবনা সমৃদ্ধ সহনাগরিকদের শুধুমাত্র নিন্দুকের বর্মে আচ্ছাদিত করে রাখলে বোধ হয় সেটাও কিন্তু একপেশেই হয়ে যাবে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top