আনন্দ মুখোপাধ্যায়

তামিলনাড়ুর মেয়ে স্নেহা অবশেষে জাতিহীন ও ধর্মহীন ভারতীয় নাগরিক বলে সরকারি স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছেন। সংবাদটি ইতিমধ্যেই প্রচারের আলোয় এসেছে। ৩৫ বছর বয়সি, পেশায় আইনজীবী স্নেহার এই লড়াই লড়তে সময় লেগেছে টানা ৯ বছর। ভারতবর্ষের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশে কোনও ব্যক্তির স্বাধীনভাবে ধর্মাচারণের অধিকার যেমন সংবিধানে স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনই জাতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাবাদের জয়গান গাওয়ার অধিকারও যে কোনও নাগরিকের থাকা উচিত। দীর্ঘ আন্দোলনের পর অবশেষে স্নেহার এই যুক্তিকেই কার্যত সরকারি সিলমোহর দিয়েছে তামিলনাড়ু প্রশাসন।
আজও যখন শিশুর জন্মগ্রহণের পর থেকে স্কুলে ভর্তি করা, প্রতিযোগিতামূলক বা চাকরির পরীক্ষা, ব্যাঙ্ক–‌ডাকঘরে কেওয়াইসি–‌র ফর্ম পূরণে, পাসপোর্ট বিভাগ–‌সহ সমস্ত সরকারি–‌বেসরকারি কাজকর্মে ধর্ম ও জাতির উল্লেখ বাধ্যতামূলক, সেখানে কট্টর নাস্তিকতাবাদের সমর্থক আইনজীবী স্নেহা ও তঁার স্বামী, তিন কন্যা–‌সহ পরিবারের সদস্যদের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে কুর্নিশযোগ্য। এর পরেও যে প্রশ্নটি আমাদের ভাবায়, সেটি হল, স্নেহার এই সাফল্য কি সর্বজনীন ভাবে ভারতীয় সমাজব্যবস্থাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারবে?‌
ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় জাতিপ্রথার উগ্রতা আগের থেকে অনেকটাই প্রশমিত হলেও, দেশবাসীর চেতনা ও সংস্কার থেকে তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হওয়া যথেষ্ট শক্ত। অন্যদিকে, ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি যেভাবে দেশ জুড়ে ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছে, স্নেহার মতো মানবতাবাদী নাগরিকের প্রয়োজনীয়তা ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছে। মহাত্মা গান্ধী থেকে বাবাসাহেব আম্বেদকর, রামমনোহর লোহিয়া, জয়প্রকাশ নারায়ণ, পেরিয়ার ই.‌ভি.‌ রামস্বামী, অন্ধ্রপ্রদেশের গান্ধীবাদী নাস্তিক গোরা (‌গোপরাজু রামচন্দ্র রাও)‌ প্রমুখ স্ব–‌স্ব ক্ষেত্রে জাতিপ্রথা অবসান ও ধর্মীয় বিভেদ নিরসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ, পঙ্‌ক্তিভোজন ইত্যাদির আয়োজন করে সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। পরবর্তী সময় নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, গৌরী লঙ্কেশ, কালবুর্গী প্রমুখ মানুষের এই প্রতিবাদী ভাবমূর্তির জন্য দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হতে হয়েছে।
জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাজনারায়ণ–‌এর মতো দিকপাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সমানতার ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজীবন নামের সঙ্গে পদবিই ব্যবহার করেননি। পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট হিন্দিভাষী সাংবাদিক ও বর্তমানে রাজ্যসভার সাংসদ হরিবংশ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত অধ্যাপক অপূর্বানন্দ, জেএনইউ–‌এর অধ্যাপক হিমাংশু–‌সহ বহু বিশিষ্টজনের নাম করা যায়, যাঁরা সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যেই পদবি বর্জন করেছেন। আবার হিন্দি সমাজের বহু স্বনামধন্য কবি–‌সাহিত্যিক নিজেদের নামের শেষে আলঙ্কারিক পদবি জুড়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যেমন, রামধারী সিং ‘‌দিনকর’‌, অযোধ্যা সিং উপাধ্যায় ‘‌হরিওধ’‌, শিবমঙ্গল সিং ‘‌সুমন’‌, রামপ্রসাদ ‘‌বিসমিল’‌,  বালকৃষ্ণ শর্মা ‘‌নবীন’‌, বলবীর সিং ‘‌রংগ’‌, চন্দ্রপাল সিং যাদব ‘‌ময়াঙ্ক’‌ প্রভৃতি নামগুলি করা যেতে পারে। ইদানীং আবার বঙ্গসমাজে বহু পরিবারের সন্তানরা নিজেদের নামের সঙ্গে পদবির ব্যবহারের বদলে পিতা বা মাতার নাম ব্যবহার করে থাকেন। সীতার নামের পরে ‘‌জনকপুত্রী’‌ বা পাণ্ডবদের নামের পরে ‘‌কুন্তিপুত্র’‌ বলে সম্বোধন করলে যেমনটি হয়। কতিপয় ব্যতিক্রমী ও মুক্তমনা নাগরিক সমাজ এই পথে পা বাড়ালেও, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সমাজ এমনকী পশ্চিমবঙ্গেও এই ধরনের জাগরণ এখনও পর্যন্ত নজরে পড়েনি।
আবার, একথাও স্মরণ করা যেতে পারে, অধুনাপ্রয়াত একাধিকবার বিধায়ক ও সাংসদ থাকা রাজনীতিবিদ ও পৌন্ড্র সমাজের নেতা শক্তি সরকার জীবনের শেষের দিকে পদবি বর্জনের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরিচিত মহলে তিনি এএমএস শক্তি নামেই নিজেকে পরিচয় দিতে ভালবাসতেন।
অন্যদিকে, বিবাহিতা স্ত্রীর বিবাহ–‌পূর্ববর্তী পদবি বদল না হওয়া পর্যন্ত পত্নীব্রতা স্বামীটি কোনও যুক্তিতেই ব্যাঙ্কের লকারে নিজের নামের সঙ্গে যৌথভাবে স্ত্রীর নাম যোগ করতে রাজি নয়, এমন উদাহরণও চোখের সামনে রয়েছে। একদিকে যেমন চাকরি করা মহিলাদের অনেকেই সরকারি নথিপত্রে বিবাহ–‌পূর্ববর্তী পদবি ব্যবহার করে থাকেন, তখন অন্যদিকে, বিবাহ–‌পরবর্তী পদবি ব্যবহারে বাধ্য করা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যা একাধারে পারিবারিক ও জাতিগত আভিজাত্যবোধ— উভয় জাহিরেরই নামান্তর। আমাদের জানা নেই, সমগ্র ভারতবাসী আদৌ কোনওদিন এই জাত ও ধর্মের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে পদবিহীন পরিচয়ে পরিচিত হতে পারবে কিনা!‌ তবু স্নেহার স্বীকৃতির মধ্যে দিয়ে আমরা সেই সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা লগ্নটিকে পালন তো করতেই পারি।
লেখক: আলিপুর কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

জনপ্রিয়

Back To Top