দেবেশ রায়- বছর খানেক আগে পুলিশ, অন্ধ্র ও পুণের, পাঁচজন প্রতিষ্ঠিত, প্রবীণ, ও বিখ্যাত কবি, লেখক ও সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। তারা, পুলিশ, মানে কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের হেফাজতেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু কোর্ট তাঁদের বাড়িতে নজরবন্দি রাখতে বলে। কোর্ট তেমন হুকুম দিতে বাধ্য হয়েছিল অন্ধ্রের কবি ভারভারা রাও–‌এর বয়স বিবেচনা করে। ঠিক বিবেচনা করেও নয়। দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়ার ফলে। পুলিশকে নজরবন্দি রাখতে বললে পুলিশ বাড়িটাকেই জেলখানা বানিয়ে তোলে। সেই মামলা এতদিনে বম্বে হাইকোর্টে উঠেছে। অন্যতম অভিযুক্ত ভেরগন গনসালভেস ও আরও দুই জনের জামিনের আবেদন শুনছিলেন বিচারক সরং কতোয়াল। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁরা, পুলিশ, গনসালভেস–‌এর বাড়ি তল্লাশের সময় কিছু বই ও  কাগজপত্র পায়। সেই বই ও কাগজপত্র নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে গনসালভেস আরও কয়েকজনের সঙ্গে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এঁদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন ‘‌আনল‌ফুল অ্যাক্টিভিটিজ (‌প্রিভেনশন)‌ অ্যাক্ট ফর হ্যাভিং মাওইস্ট লিঙ্কস’‌ আইনে মামলা রুজু করার অনুমতি চাইছিল পুলিশ মানে, সরকার।
কী কী বই ও কাগজপত্র পুলিশ বিচারককে দেখায় বা বলে। তলস্তয়–‌এর উপন্যাস ‘‌ওয়ার অ্যান্ড পিস’‌। পুণে পুলিশ বলে ‘‌এই বই অত্যন্ত আপত্তিকর বিষয়ে ঠাসা (‌‘‌হাইলি ইনক্রিমেনেটিং ডকুমেন্ট’‌)‌। তাতে বিচারক, গনসালভেস–‌এর কাউন্সেলকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘‌‌এই বই তিনি কেন বাড়িতে রেখেছিলেন?‌’‌ বিচারক অন্যান্য বই–‌এর শিরোনাম জোরে–‌জোরে পড়েন— ‘‌রাজ্য দমন বিরোধী’‌, ‘‌মার্ক্সিস্ট আর্কাইভস’‌, ‘‌জয় ভীম কমরেড’‌, ‘‌আন্ডারস্ট্যান্ডিং মাওইস্টস’‌। বিচারক সি‌ডিগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
অভিযুক্তদের কাউন্সেল মিহির দেশাই বলেন, ‘এই বইগুলো কারও বাড়িতে থাকলেই তাকে মাওবাদী বলে গ্রেপ্তার করা কি আইনসঙ্গত। আর, ‘‌ওয়ার অ্যান্ড পিস’‌ তো রুশভাষায় লেখা এক বিখ্যাত ক্লাসিক নেপোলিয়ানের রাশিয়া আক্রমণ নিয়ে। তাতে বিচারক সরং কতোয়াল বলেন, ‘‌অন্য একটা দেশের যুদ্ধ নিয়ে অন্য একটা ভাষায় লেখা উপন্যাস অভিযুক্তের দরকার হল কেন।’‌
দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলির প্রথম পাতায় এটা খবর হয়েছিল।
হাইকোর্টের একজন বিচারপতির এমন মন্তব্য নিয়ে মিডিয়ায় কিছু চাপা হাসাহাসি যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু সে হাসাহাসিও খুব চাপা ও সাবধানি। কেন?‌ কোর্টের হাতে ক্ষমতা আছে— চলতি মামলাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বেআইনি। কেন?‌  হাইকোর্টের একজন বিচারপতি ব্যক্তি হিসেবে কোনও মন্তব্য করেন না বা আদেশ দেন না। তিনি সব সময়ই কোর্ট হিসেবে মন্তব্য করেন বা আদেশ দেন ও সেই মন্তব্য বা আদেশের মান্যতাকে প্রশ্ন করা যায় না। তাতে আদালতের মর্যাদাহানি ঘটে।
আমরা অন্য দুটো প্রশ্ন করতে চাই।
এই আইন যখন তৈরি হয়, তখন কি আইনের বয়ানে মাওইজম কাকে বলে ও কোন ধরনের মাওবাদকে ভারতের পক্ষে রাষ্ট্রবিরোধী বলা হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে?‌ মাও সে তুং তাঁর দীর্ঘ জীবনে অনেকবার তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি বদলেছেন। সেই পরিবর্তমান তত্ত্ব ও পদ্ধতিগুলির শেষে ১৯৪৮–‌এ চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। বিপ্লব–‌পরবর্তী চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ঘন ঘন বদলেছে। ‘‌শতফুল ফুটুক’‌ থেকে ‘‌সাংস্কৃতিক বিপ্লব’‌ পর্যন্ত কত বিভিন্ন পথে চীন অগ্রসর হয়েছে। ‘‌গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো’‌— নকশালদের এই স্লোগান তো ১৯২৭–‌এর পর লংমার্চের সময় মাও–‌এর স্লোগান। আইনকে তো স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে যে কোন ধরনের মাওবাদ ভারতে নিষিদ্ধ। আমি পড়েই বলছি এই আইনে মাওবাদের কোনও সংজ্ঞা নির্ধারিত নেই। এই আইন প্রায় অবিকল ব্রিটিশ আমলের ‘‌অ্যান্টি টেররিস্ট অ্যাক্টে’‌র কার্বন কপি। পুলিশের হাতে মানে সরকারের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়ার অছিলা ও সে‌ভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন— কোর্ট সম্পর্কে এই ঐশ্বরিক ধারণা যে বিচারকরা ঈশ্বরের মতো সর্বজ্ঞ ও নির্ভুল— এই ধারণাটা বদলানো দরকার। বিচারব্যবস্থা নিজের ত্রুটি নিজে সংশোধন করে— এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভুল— এখনও পর্যন্ত সেটাই চলছে। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক বাড়িতে গরু পুষতেন ও দুধের ব্যবসা করতেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি তাঁকে নিয়ে কোনও এজলাস বানাতেন না, অর্থাৎ তাঁকে মামলা দিতেন না। তিনি মাইনে পেতেন, অন্যান্য সুযোগ–‌সুবিধেও। কালক্রমে অবসর নেন।
আমি তো সল্টলেকে আমার প্রতিবেশী ও বন্ধু, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক গণেন্দ্রনারায়ণ রায়ের কাছে শুনেছি— তিনি আমেরিকার  সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও কাউন্সেলদের মামলা শোনার রকম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কোর্ট যে ‘‌হোল্ড’‌ করা হয় এমন কোনও ধারণাই নেই। একটা এজলাসের আকারও নেই। জজসাহেবরা আলাদা মঞ্চেও বসেন না। একটা সাক্ষীবাক্সও নেই। আসামির কয়েদখানাও নেই। বিচারকদের মধ্যে মতপার্থক্যও প্রকাশ্যেই হচ্ছে। কাউন্সেলরাও একই জায়গায় বসে। যেন একটা বড় ঘরে কোনও একটা বিষয়ের পদ্ধতিগত বিচার হচ্ছে।
এই যে বোম্বে হাইকোর্টের এক বিচারপতি, যিনি তলস্তয়ের ‘‌ওয়ার অ্যান্ড পিস’‌–‌এর নাম শুনেছেন কি না সন্দেহ— যিনি জানেন না, শুধু গবেষণার জন্য বা জানার জন্য পড়াশুনো করা কোনও বুদ্ধিজীবীর কাজ হতে পারে, যে ‌ব্যবস্থায় ন্যায়ান্যায় বিচার বা সত্য নির্ণয়ের দায়িত্ব আদালতের নয় এ ‌কথা বিচারক মনে রাখেন না। বিচারকের দায়িত্ব পদ্ধতি ঠিক আছে কি না এইটি দেখা। বিচারককে প্রথমে স্থির করতে হয়— মামলাটা কী নিয়ে।
আবার, যখন সরকারের দরকার পড়ে, তখন তো এক বিচারকের বদলি, আর ‌এক বিচারকের মৃত্যুর পর নতুন এক বিচারক একদিনে তিন বছরের মামলা— কাউন্টার ইনসারজেন্সি সংক্রান্ত মামলা, অমিত শাহ অন্যতম আসামি— নাকচ করে সবাইকে খালাস দিয়ে দেন। এই ঘটনায় এক প্রাক্তন প্রধান বিচারক মন্তব্য করেছিলেন— ‘‌তিন ঘণ্টায় যতগুলো কাগজে বিচারকের সই করতে হয়, তা করা যায় না।’‌ আদালত কোনও স্বয়ংক্রিয় সংশোধক নয়। বিচারকই যদি আদালত হন, তা হলে তাঁকে প্রমাণ করতে হয়— তিনি শেষ কথা নন। তিনি শাস্তি দিতে পারেন। তাতে তাঁর পদের মর্যাদা থাকে না।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top