ধ্রুবজ্যোতি নন্দী- আশঙ্কাটাই সত্যি হল। দেশ জোড়া লকডাউন উঠতে শুরু করার পর শিল্প এবং অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে প্রথম মুখ খুললেন নরেন্দ্র মোদি। মুখ খুললেন এমন দিনে যেদিন আর্থিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অতি–‌পরিচিত আন্তর্জাতিক সংস্থা মুডিজ আর্থিক বিষয়ে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও এক ধাপ নামিয়ে প্রায় ঝাঁঝরা বলে দাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি তো নিজেকে জাদুকর মনে করেন। জাদুকরের ভূমিকায় নিজেকে হাজির করা প্রায় একটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন তিনি। তাই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থসংস্থা যেখানে ভারতীয় অর্থনীতির সঙ্কোচনের হিসেব করছে, মুডিজ রেটিং কমিয়ে দিচ্ছে, তখনও উদ্বেগের লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া গেল না তাঁর বক্তব্যে। দেশের প্রধান শিল্প–‌প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম সর্বোচ্চ সংগঠন কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ (সিআইআই)–‌এর ইন্টারনেটে আয়োজিত বার্ষিক সভায় মোদি বললেন, সমস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন রয়েছে একটি পরিষ্কার পথ, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে পথ তৈরি করে দিয়েছে আত্মনির্ভর ভারত। তাই বৃদ্ধির হার ফিরে পাওয়া খুব একটা সমস্যা নয়।
দেশের আজকের শিল্প এবং আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এর চেয়ে অর্থহীন, অন্তঃসারশূন্য এবং হাস্যকর কোনও কথা অনেক চেষ্টা করেও বানানো যাবে কিনা সন্দেহ। মোদির যদি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের কথায় কান দেওয়ার অভ্যাস থাকত, তাহলে শুনতে পেতেন যে তাঁরা অনেক দিন আগে থেকেই বলে আসছেন দেশে চাহিদা নেই, তাই নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। ব্যাঙ্ক টাকা নিয়ে বসে আছে, কিন্তু নতুন প্রকল্প নেই, তাই ধার নেওয়ার লোক নেই। মন্দার সমস্ত লক্ষণ দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতীয় অর্থনীতিতে। এই অবস্থায় নিজেদের সম্পদ বিদেশি সংস্থার কাছে বিক্রি করে বিভিন্ন ভারতীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণের বহর যতটা পারা যায় কমিয়ে আনছে। এ কাজে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স। এ বছরের শুরুতে যে রিলায়েন্স গোষ্ঠীর মোট ঋণের বহর ছিল ১.৫৩ লক্ষ কোটি টাকা, ২০২১ সালের মার্চের শেষে সেটাই দাঁড়াবে শূন্যে। হ্যাঁ, সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত সংস্থা হবে রিলায়েন্স। আরামকো, ফেসবুক, সিলভার লেক, ভিস্টা ইক্যুইটি, জেনারেল আটলান্টিকের মতো যে সব বিদেশি দৈত্য রিলায়েন্সে বিনিয়োগ করছে, তা দিয়ে ধার মেটাবে আম্বানির সংস্থাটি। নতুন সম্পদ তৈরি হবে সামান্যই। সুতরাং এই বিপুল বিদেশি বিনিয়োগে রিলায়েন্সের শেয়ারহোল্ডাররা অবশ্যই উপকৃত হবেন। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান কতটা হবে, তা বলা খুব মুশকিল।
বিশাল চাহিদা, বিশাল বৃদ্ধি হারের দেশ হিসেবে ভারতের যে শক্তিটা ছিল, মোদির জমানায় সেটা কমতে কমতে প্রায় উধাও হয়ে যেতে বসেছে। যতদিন না দেশে চাহিদা বাড়ে, ততদিন নতুন শিল্প স্থাপনে কেউ আগ্রহী হবে না। বেকারত্ব যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তেমন বাড়তেই থাকবে। দেশের মানুষের হাতে টাকা থাকবে না। হাতে টাকা না থাকলে চাহিদা বাড়বে না। এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে চাই নতুন ভাবনাচিন্তা। মোদি সরকারের নতুন ভাবনাচিন্তা কী? গত বছর সেপ্টেম্বরে বড় বাণিজ্য সংস্থার করের হার এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা কমিয়ে মোদি আশা করেছিলেন লাভ বাড়ছে দেখে এবার তাঁরা লগ্নি বাড়াবেন। বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতিতে বাণিজ্য ক্ষেত্রের অবদানকে স্বীকৃতি না দিলে, সম্মান না দেখালে তাঁরাই বা ঝুঁকি নেবেন কেন? ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে মঙ্গলবার তিনি সিআইআই–‌এর সভা কাঁপিয়ে বলতে পারতেন, কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়েও যখন নতুন বিনিয়োগ এল না, তখন এই আর্থিক সঙ্কটের সময় ট্যাক্সের পুরনো হারে ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই! কিন্তু না, নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে এমন সুবিবেচনার আশা তাঁর পরম মিত্রোঁরাও করেন না। দেশে দেশে বাজারে বাজারে এই বার্তা রটি গেছে ক্রমে, মোদির সব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধু শেয়ার বাজারের জন্যে। মোদির দ্বিতীয় ইনিংসে সেই শেয়ার বাজারের প্রসন্ন দক্ষিণ মুখ ক্রমশ রক্তচক্ষু হয়ে উঠছে। তাকে আরও চটানোর আগে মোদি বরং অর্থমন্ত্রী পাল্টে ফেলবেন। তিনি আরও ফলাও করে মোদির নতুন সূত্র আত্মনির্ভর ভারতের কথা প্রচার করবেন।
একটা গভীর বার্তা অবশ্য নরেন্দ্র মোদি দিয়ে রাখলেন দেশের শিল্পকর্তাদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত তাঁর মঙ্গলবারের টেলিভিশন ভাষণে। বললেন, অর্থনৈতিক সংস্কারকে তাঁর সরকার এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যা দেশের চলার পথটাই পাল্টে দেবে। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর কথা হচ্ছিল এখন অবসর নেওয়া এক দাপুটে শিল্পকর্তার সঙ্গে। প্রাজ্ঞ প্রবীণটি আঁতকে উঠে বললেন, তার মানে আবার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত! এর আগে মোদি সরকার যতগুলো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সবই শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভবিষ্যতেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনও কারণ তো দেখছি না।

জনপ্রিয়

Back To Top