দেবেশ রায়: মঙ্গলবার, ১৪ মে সন্ধ্যায় বিজেপির জাতীয় সভাপতি অমিত শাহের পথ–‌প্রদর্শনীতে যা ঘটল উত্তর কলকাতায় বা বাংলা রেনেসাঁসের আঁতুড়ঘরে তা একেবারে কাপড়–‌খোলা ফ্যাসিস্ট অভিযান। এমন চমকে দেওয়া, এমন ভয় দেখানো, এমন অসম্ভাব্যতা তৈরি করা যাতে শেষ দফার বাংলা ভোট বিজেপির পক্ষে আসে। এতে ভয় পেয়ে ভোটাররা যদি ভোট দিতে কম আসেন— সেটাও বিজেপির লাভ।
সারা ভারতের সবগুলো দফার ভোট নিয়ে যে–‌সব আন্দাজ কাগজপত্রে বেরিয়েছে তাতে এটা সবার জানা হয়ে গেছে যে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারেকাছে পৌঁছুতে পারবে না। ভোটে বিজেপি–‌বিরোধী মঞ্চ আরও শক্ত হয়েছে। বিহারে লালুর দুই ছেলে এক হয়েছে। মায়াবতী–‌কংগ্রেস ভোটে পরস্পরকে সমর্থন করে ফেলেছে।
এখন বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য:‌ পার্টি হিসেবে ও জোট হিসেবে তারা যে–‌ভোট পাবে, তারই জোরে রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার গঠনের আবেদন। রাষ্ট্রপতি তো বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। এমন দাবি তুলে তো অটলবিহারী বাজপেয়ী কেন্দ্রীয় সরকার তৈরি ১৩ দিন ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।
সেই লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পশ্চিমবাংলা, বিশেষ করে বাংলার শহুরে আসনগুলি। কারণ, শহরের সংগঠিত বাঙালি মধ্যবিত্ত ‘‌দিদি–‌মোদি ভাই–‌ভাই’‌ সূত্রে গভীর বিশ্বাস করে। তাদের বামপন্থী রাজনৈতিক অংশ মমতাকে নিকটশত্রু মনে করে ও তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণ হিসেবে মমতাকেই শনাক্ত করে। এটা এমন বাস্তব ঘটনা যে আতঙ্কিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রোগশয্যা থেকে আর্ত ‌বিবৃতিতে বলে ওঠেন, ‘‌বিজেপিকে কোনও রকম সাহায্য বা সমর্থন আত্মহত্যা তুল্য ভুল হবে।’‌ পশ্চিমবঙ্গে প্রচার করতে এসে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় না বলে পারেন না যে ত্রিপুরার দিকে তাকিয়ে দেখুন। বিজেপি কত কম সময়ে কত স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। আবার একই সময়ে প্রকাশ কারাত টিভি–‌ইন্টারভিউয়ে বলেন— লোকসভা ভোটে বাংলায় বিজেপি ভাল করবে। সেই মনের কথা মুখে বলে ফেলে চাপা দেওয়ার জন্য আরও কী সব বলে লেজে–‌গোবরে হয়েছেন। তারও পর সীতারাম ইয়েচুরি সেই পুরনো লব্‌জ কচলালেন— বাংলায় তো মোদি–‌দিদি ভাই–‌ভাই। মারাত্মক ও বিভ্রান্ত অরাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানহীন সব সূত্র ফ্যাসিস্টদের শেষ সুযোগ করে দিল এই শেষ দফায় মমতাকে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ তৈরিতে।
ভোটের আগে— অনিশ্চিত সন্ত্রাস তৈরি করে ভোটারদের ভোট বুথে আসা বন্ধ করো, কোনও আন্দাজ করতে দিও না কোথা দিয়ে কী আক্রমণ আসতে পারে;‌ বিজেপির ভোট না এলে না আসুক, তৃণমূলের ভোট কমাও।
এমন কৌশল বের করতে হলে মাথা লাগে। গুজরাট ও মজফ্‌ফরপুরের দাঙ্গা–‌সংগঠনে অভিজ্ঞ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ কলকাতায় গতকাল সেই দাঙ্গাই দেখিয়ে দিলেন। আমার ধারণা, হাসনাবাদেও তারা এই কৌশল নেবে।
টিভিতে ও কাগজে কাগজে ছবি দেখে আমি কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কথা বিশ্বাস না করে পারিনি যে বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে অভিজ্ঞ গুন্ডার দল আনা হয়েছে ও তারাই কলেজ স্ট্রিটের ঘটনা ঘটিয়েছে। নইলে, বিদ্যাসাগর কলেজ হঠাৎ আক্রান্ত হতে যাবে কেন?‌ এই গুন্ডাবাহিনী যদি আগেই শহরে এসে থাকে, তা হলে স্থানীয় বিজেপি নেতারা ওই জায়গাটা তাদের চিনিয়ে দিয়ে থাকতে পারেন। ওখানে অত স্কুল–‌কলেজের মধ্যে একমাত্র বিদ্যাসাগর কলেজের রাস্তা দিয়ে ঢুকে উল্টোদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায় ও ডাইনে–‌বাঁয়ে প্রায় তিন–‌চারটি ছোট রাস্তা দিয়ে একদিকে সার্কুলার রোডের দিকে চলে যাওয়া যায়, তেমনি আবার আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকেও চলে যাওয়া যায়, বা আবার হ্যারিসন রোডে পড়ে হাওড়ার দিকে। এই জায়গা বাছাইতেই ধরা পড়ে যায় এ দাঙ্গাবাজি পরিকল্পিত ও সংগঠিত রাজনৈতিক দাঙ্গাবাজি। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। আর এই দাঙ্গাবাজিতে তৃণমূলের কোনও স্বার্থ নেই। পুরোটা বিজেপির স্বার্থ। বরং এই দাঙ্গাবাজিতে তৃণমূলের ক্ষতি। এটা তৃণমূলের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসন। তার বিরুদ্ধে বিজেপির বড় নেতা রাহুল সিংহ। এখানে ভোটের আগে এমন অনিশ্চয়তা ঘটলে যারা ভয় পেয়ে ভোট দিতে আসবে না— তারা তৃণমূলেরই ভোটার।
এ কথাগুলো এত জোর দিয়ে যে বলছি তার কারণ:‌ এই ফ্যাসিস্ট দাঙ্গাবাজি ও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে বিশিষ্ট অনেক ব্যক্তির যে–‌সব মন্তব্য কাগজে আজ বেরিয়েছে সেই মন্তব্যগুলির মধ্যে অপরাধীকে চিহ্নিত করার স্পষ্টতার অভাব আছে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙাকেই কেউ বা সবচেয়ে বড় অপরাধ মনে করেছেন। কেউ বা আমাদের সমবেত অধঃপতনের গভীরতর বিস্ফোরণের আশঙ্কায় আর্তনাদ করে উঠেছেন। কেউ স্পষ্টই বলেছেন, ‘‌যে–‌ই ভেঙে থাকুক’‌— তাঁরা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রাখতে চাইছেন। এই সব দুঃখ–‌আর্তির গভীরতা অনেক সত্য, আমাদের বেঁচে থাকার সত্য।
কিন্তু সেই সত্য আমাদের আরও একটু স্পষ্ট হতে সাহায্য করুক। ‘‌বিদ্যাসাগর মূর্তি’‌ ভাঙাও ফ্যাসিস্ট কৌশল ও এ কৌশল পরিচিত। সমস্ত তর্কটা সরে যাবে নির্বাচনী কৌশল থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মতায়। ফ্যাসিস্টরা তাদের স্বার্থে যা করার তা করে, সেই অপকার্যের প্রধান উদ্দেশ্যটা ঢেকে দেয়। গুজরাট দাঙ্গার দ্বিতীয় দফায় সৈন্য নামানো হচ্ছে না কেন এই নিয়ে কথাবার্তা উঠতেই সৈন্য চাওয়া হল, প্লেনে করে সৈন্য আনাও হল। কিন্তু তাদের শহরে নিয়ে যাওয়া হল না। এয়ারপোর্টেই রাখা হল। নিয়ে যাওয়ার গাড়ি এল না। মিডিয়াতে সেনাবাহিনীর ছবি বেরল। এয়ারপোর্টে অপেক্ষমাণ। বিকেলের মধ্যে গোধরার হিন্দু গুন্ডারা খবর পেয়ে গেল— সেনাবাহিনী গোধরায় কবে পৌঁছুবে ঠিক নেই। ব্যস, গোধরার দাঙ্গা তৃতীয় দফার দিকে চলে গেল। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী তখন নরেন্দ্র মোদি। আর অমিত শাহ দশটি মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। সেই দশ মন্ত্রকের মধ্যে পড়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা। 
অমিত শাহ বিবেকানন্দের বাড়িতে গেলেন না কেন?‌ ওখানে তো কোনও গোলমাল ছিল না। আর, যদি গোলমালের জন্য ভয়ে গিয়ে না থাকতে পারেন তা হলে তো তাঁর উচিত ছিল ওই গোলমালের মধ্যে ঢোকা— ব্যাপারটা কী বুঝতে। তাঁর তো এক্স–‌ওয়াই জেড সব ক্যাটেগরির নিরাপত্তাই আছে।
ফ্যাসিস্টদের এই চক্রান্ত ও দাঙ্গার একমাত্র উত্তর:‌ শেষ দফার ভোট শান্তিপূর্ণ রাখা ও ভোটের শতাংশ বাড়ানো।
ফ্যাসিস্টরা, আর কিছু নয়, ফ্যাসিস্টই। তাদের চিনতে আমাদের দেরি হয়, নানা রকম তুল্যমূল্যতা এসে পড়ে। আপাতত সেগুলো স্থগিত রাখা যায়। ফ্যাসিস্টরা নিখাদ ফ্যাসিস্ট।
বিদ্যাসাগরও আর কিছু নন শুধুই বিদ্যাসাগর। নিজের জোরে দুশো বছর বেঁচে আছেন— আরও দু হাজার 
বছর বাঁচবেন।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top