কৃষ্ণা বসু- ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল মনে পড়লে এক বিশেষ ধরনের আবেগ অনুভব করি। সে রাতে কলকাতার পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনে আমার এবং ড. শিশিরকুমার বসুর ডিনারের নিমন্ত্রণ ছিল। পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনের অফিসার ও কর্মীরা সকলেই পূর্ব পাকিস্তানের, অর্থাৎ বাঙালি। তাঁদের সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল। বাড়িতে আসা–যাওয়া, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া— সবই চলত। সকালের খবরের কাগজে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর crackdown–এর খবর দেখে বিচলিত হলাম। ডিনার ক্যানসেল করে কোনও খবর না আসায় সন্ধেয় নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে উপস্থিত হলাম। ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলি ছাড়াও আছেন আনোয়ার–উল করিম ও আরও একজন, অপরদিকে আমি ও শিশির বসু ছাড়া ছিলেন আমাদের পুলিশের বড়কর্তা রঞ্জিত গুপ্ত। সকলেই ঢাকার এবং অন্যান্য শহরের খবরের জন্য উদ্বিগ্ন। খাওয়ার মতো মনের অবস্থা আমাদের কারও নেই। আমি আর্ত কণ্ঠে রঞ্জিত গুপ্তকে বললাম— ‘‌কী হবে!‌ একদিকে পুরোদস্তুর মিলিটারি আর্মি, অন্যদিকে এরা তো আমাদের মতোই ভেতো বাঙালি।’‌ কথাটা বলেই আমি মনে মনে জিভ কাটলাম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাঙালিরই অবদান বীরশ্রেষ্ঠ নেতাজি সুভাষচন্দ্র, যিনি রণক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালনা করে মুক্তি বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ শক্তিকে পরাস্ত করে পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। রঞ্জিত গুপ্ত আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘‌কোনও চিন্তা করবেন না, জোর লড়াই হবে।’‌
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে কলকাতার নেতাজি ভবন ছিল একটি বিশেষ কেন্দ্র। মনে পড়ে শহরে কার্ফু, আমরা অন্ধকারে রাত জেগে কাজ করছি। আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিপ্লবী বীণা দাস (‌ভৌমিক)‌। ট্রাঙ্কে বোঝাই করছি ওষুধবিসুধ, পাঠাতে হবে সীমান্তবর্তী ঘাঁটিতে। শিশির বসু সেই সময়ে সীমান্তের কাছাকাছি বকচরা নামে গ্রামে একটি বাড়িতে হাসপাতাল চালু করলেন, নাম নেতাজি ফিল্ড হসপিটাল। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে আনা হত, বন্ধু সার্জেন সত্যেন বসু রায় অস্ত্রোপচার করতেন। নানারকম অসুবিধের মধ্যেও শিশির বসু এবং কয়েকজন ডাক্তার বন্ধু কাজ চালাতেন, স্যালাইন ফুরিয়ে গেলে ডাবের জল ব্যবহার হত। পথে পথে দুর্দশাগ্রস্ত শরণার্থীর ভিড়, অন্তত শিশুদের দেখভাল করার দিকে দৃষ্টি ছিল শিশির বসুর।
ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা জোরকদমে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। নেতাজি ভবনে রাতে কাজ করছি, কে যেন খবর দিল যশোরের পতন হয়েছে। আমরা মহা আনন্দে এক রাউন্ড সন্দেশ খেয়ে ফেললাম। তারপরে শুনি, যশোর ‘‌ফল’‌ করেনি তবে তীব্র যুদ্ধ চলছে। অবশেষে একদিন যুদ্ধ শেষ হল। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভারতের জেনারেল মানেকশর কাছে আত্মসমর্পণ করল, ভারতের হাতে নব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈনিক বন্দি। পরে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হল।
যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর একটা ছবি চোখের সামনে ভাসছে। বর্তমান বাংলাদেশ মিশনের প্রাসাদোপম অট্টালিকার প্রাঙ্গণে আমি, শিশির বসু এবং আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছি। বাড়িটি তখনও পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশন। আমাদের চোখের সামনে পাকিস্তানের পতাকা অবনমিত হল আর পতপত করে উড়তে লাগল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। আমার হাতে কে যেন একগুচ্ছ ফুল ধরিয়ে দিলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে হোসেন আলি সাহেবের হাতে ফুল দিলাম। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার, হয়ে গেলেন ভারতে নিযুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের হাইকমিশনার।
পাকিস্তানের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২–এর ১০ জানুয়ারি ঢাকা পৌঁছলেন। একটি অ্যাম্বুল্যান্স ভর্তি ওষুধবিসুধ নিয়ে নেতাজি ভবন থেকে রওনা হয়ে শিশিরকুমার বসু ঢাকা পৌঁছলেন ১৭ জানুয়ারি। সেদিন তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এক আবেগপূর্ণ সাক্ষাৎ হয়েছিল। শিশিরকুমারকে জড়িয়ে ধরে বঙ্গবন্ধু চোখের জল ফেলেছিলেন। একদিকে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্যে তাঁর মনের বেদনা, অন্যদিকে কলকাতায় ছাত্রাবস্থায় নেতাজি সুভাষচন্দ্রের হাত ধরে প্রথম রাজনীতিতে পদার্পণের কথা। তিনি হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সামনে আসছে ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন। নেতাজি ভবনের প্রাঙ্গণে সমবেত জনতার জন্যে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরে রেকর্ড করা বার্তা নিয়ে পৌঁছলেন নীলিমা ইব্রাহিম। গমগম করে ধ্বনিত হল সেই বাণী— সকল মুক্তিকামী মানুষের কাছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেরণা। গত বছর শ্রদ্ধেয় শেখ হাসিনা ও তাঁর ভগিনী রেহানা নেতাজি ভবনে যখন এলেন, আর্কাইভস থেকে বার করে সেই কণ্ঠস্বর তাঁদের শোনানো হয়েছিল। দুই কন্যা পিতার কণ্ঠস্বর শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
আমার মনে বঙ্গবন্ধুর যে ছবিটি মুদ্রিত হয়ে আছে, পরিশেষে সেই কথা বলি। যুদ্ধজয়ের পর বঙ্গবন্ধু প্রথমবার কলকাতা এলেন। কলকাতার রাজভবনে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে সংবর্ধনা দিলেন। রাষ্ট্রীয় ভোজের পর পাশের ঘরে সঙ্গীতের আসর। প্রথম সারিতে বসে আছি, পাশে শিশির বসু, ইন্দিরা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর দুই তরুণ পুত্র। সামনে বসে গান ধরেছেন সুচিত্রা মিত্র। সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।‌

নিবন্ধকার প্রাক্তন সাংসদ

জনপ্রিয়

Back To Top