হিরণ্ময় মাইতি- এক পাখি–‌পাগল সাহেব গড়ের মাঠে অবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন কেন একটি  ফিঙে তার স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে কলকাতার গড়ের মাঠে মাটিতে নেমে এসে বসেছে। সাহেব হলেন ফ্রাঙ্ক ফিন। সময় ১৮৯৪। কলকাতা যাদুঘরের প্রথম সহকারী সুপারিনটেন্ডেন্ট। কলকাতার পাখিদের নিয়ে তাঁর গভীর ভালবাসার প্রকাশ তাঁর একশো ছত্রিশ পৃষ্ঠার বইটি। আর পাখ–‌পাখালি মানেই গাছ–‌গাছালি। কলকাতা শহরের অন্যতম ঐশ্বর্য কলকাতার গাছ। তার পথ–‌তরুর সারি। তার সবুজ বাগান। গঙ্গার পাড়, মন্দিরের আশপাশ, কবরখানা, ব্যক্তিগত বাগান দেশি–‌বিদেশি কত না গাছের সমারোহে ভরে আছে! নগর কলকাতার ভিতর ওই সবুজ কৈলকাতা! আর তার আড়ালবাসী অধিবাসীরা হল প্রধানত পাখি, কীটপতঙ্গ সেই সঙ্গে কাঠবেড়ালি, ভাম, বেজিদের মতো স্তন্যপায়ীরা ও সরীসৃপেরা, যারা এ শহরেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমফানে শহর কলকাতা লন্ডভন্ড। চারদিকে 
মৃত সবুজ গাছের সারি। উপড়ানো। দমড়ানো। মোচড়ানো। কলকাতা ও শহরতলি মৃত গাছে ঢাকা পড়ে আছে।
কিন্তু ঝড়ে গাছ মরলে কাদের কেরামতি বাড়ে?
মহানগরের বুকে পড়ে–‌থাকা মরে–‌থাকা হাজার হাজার গাছকে দেখে কেউ কেউ লিস্টি বানিয়েছেন কোন কোন গাছের এবার থেকে শহরে প্রবেশ নিষেধ। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে নানানভাবে প্রচার করছেন।
কিন্তু মনে রাখা দরকার এই ঝড়টি সাধারণ ঝড় ছিল না। আর নিষেধের সেই লিস্ট দেখে বোঝা যাবে না কোন গাছ কীভাবে ঝড়ের সঙ্গে লড়তে লড়তে একসময় পড়ে গেছে? কীভাবে শহরকে বুক দিয়ে আগলেছে? অথচ কোন গাছ কতটা ঝড়ের ঘাত–‌সহ এক লহমায় পড়ে গেল তার হিসেবনিকেশ চলছে!
সারা বছর যে গাছ–‌গাছালি কলকাতার ফুসফুসকে অক্সিজেন জোগান দিয়েছে, তার দূষণের গ্লানি শোষণ করেছে আজ এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শহরের ইকো সিস্টেমের গভীর পরিবর্তন আগামী দিনে অন্য ধরনের সঙ্কট ডেকে আনবে। গাছ কি কেবল কলকাতা শহরে পড়েছে? চারটে জেলায় বৃক্ষের মৃত্যুর ছবি নির্মম।
কিন্তু শহরের মধ্যে শেকড়ের মাপে নির্বাচিত গাছ যদি বেছে বেছে লাগাতে হয় তাহলে কলকাতার বৃক্ষবৈচিত্রের কী হবে? কোনও একটি অঞ্চলের পাখিরা তাদের চেনা গাছপালার উপাদান দিয়ে বাসা বানায়, খাদ্য সংগ্রহ করে। সেই ইকোসিস্টেমের সূক্ষ্ম সম্পর্কগুলোর কথা ভাবা যে জরুরি, সে কথা যেন ভুলে না যাই, কারণ গাছ শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটানোর উপাদান শুধু নয়। এই শহরের আরেক রাখাল, ফ্রাঙ্ক ফিনের একশো বছর পরে প্রায় ২৬০টি পাখির কথা নথিভুক্ত করেছিলেন কলকাতা মহানগর ও তার আশপাশের এলাকায়। আর বলেছিলেন কলকাতার গাছ কলকাতার ভবিষ্যৎ।
 রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, কদম, শিরীষ, খিরীষ, কালোজাম, জঙ্গলি জিলিপি, কাঠবাদাম, জ্যাকারান্ডা, শিমুল, রুদ্রপলাশ বাতিলের কথা শোনা যাচ্ছে। কারণ এই ঝড়ে কোনওটা বা উপড়ে পড়েছে, কোনওটার বা ডাল ভেঙেছে। এরা ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। বহু ক্ষেত্রে আজ নাগরিক অসুবিধার কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
কিন্তু সব গাছ তো প্রবলঘাত‌সহ হয় না। গাছের গুরুত্ব কি কেবল ঝড়–‌সহনশীলতা দিয়ে মাপা হবে?
আমাদের চেনা রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া, কদম, কালোজাম, শিরীষ, খিরীষ, জ্যাকারান্ডা অন্য গাছদের তুলনায় কম ঘাতসহ। কিন্তু তবু কেন তাদের কদর লোকে করে?
 জ্যাকারান্ডার ফুল, রাধাচূড়ার বা কৃষ্ণচূড়ার ফুল যে কলকাতার অলঙ্কার। তাই শুধুই জাঁদরেল লড়াকু গাছে কলকাতা মুড়ে ফেলা ঠিক হবে না।
জারুলের ফুল হোক বা অমলতাস কিংবা কদম অথবা ছাতিম ঘোমো ক্লান্ত কলকাতার কপাল মুছিয়ে পরের দিনের জন্যে আবার প্রস্তুত করিয়ে দেয়, সে কথা নিশ্চয় বন দপ্তর, পুরসভা ভাবছে। শহরময় ছড়িয়ে থাকা গাছগুলি জুড়ে জুড়ে কলকাতার মাথায় যে সবচেয়ে বড় ছাতাটি ধরে আছে কত কাল। প্রবল গরমে এরাই পথ জুড়ে বিছিয়ে রাখে শীতলপাটি।
এই অভিজ্ঞতার পরে  নিশ্চয়ই তাদের স্থান নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে, কিন্তু সম্পূর্ণ বাতিল করার আগে ভাবা দরকার। বন দপ্তর, পুরসভা এ ব্যাপারে যেভাবে ভাবছে তা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু মনে রাখা দরকার পড়ে যাওয়া একটি বড় গাছ যে পরিষেবা দেয় তা পূরণ করা চটজলদি সম্ভব নয়, তার জায়গায় কমপক্ষে দশ থেকে পনেরোটি চারা লাগানো দরকার।
 অতীতে কলকাতা ও শহরতলি কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু এবারে তা হয়নি। আর হয়নি বলেই অনেক প্রস্তুতির আর অনেক অপ্রস্তুতির কথা আজ উঠছে।
নানা ধরনের গাছপালা নিয়ে যে এত বিপুল সবুজ সম্পদ আছে কলকাতায় তার নির্মম ধ্বংসের পরে যেন আমাদের সম্বিত ফিরেছে। এত গাছ ছিল আমাদের কলকাতায়! সেই গাছবৈচিত্র বাঁচিয়ে রাখা হবে একটি জরুরি সিদ্ধান্ত। আমাদের চেনা পাখির তালিকায় বসন্তবৌরি, হরিয়াল, কোকিল, টিয়া, মদনা বা বেনেবউদের কথা ভাবতে হবে যারা ফল খেয়ে বাঁচে। পেঁচা বা কাঠঠোকরা, চড়ুই, শালিক, বুলবুল, দোয়েল কিংবা টুনটুনিরাও এই শহরের বাসিন্দা এবং শহরের গাছে তাদেরও অধিকার আছে। অধিকার আছে দেখা, না–‌দেখা কীটপতঙ্গ ও সরীসৃপদের যারা এ শহরে থাকে।
গাছ–‌বৈচিত্রের কথা মাথায় রেখে করতে হবে গাছ নির্বাচন। কুরচি, কাঞ্চন, কলকে, স্বর্ণচাঁপা, বকুল, রক্তকরবীর মতো আকারে ছোট ছোট গাছ পথের পাশে লাগানো যেতে পারে। খেলার মাঠের পাশে বা যেখানে ফাঁকা জায়গা আছে মুচকুন্দ, পরশপিপুল, পুত্রঞ্জীব, আমলকী, অশোক, তেঁতুল, খিরীষ, শিরীষ, পলাশ, শিশু, করঞ্জা, নিম, কুসুম, মহুয়া ইত্যাদির কথা ভাবা যেতে পারে। আর লাগানো দরকার ফলের গাছ। পাশাপাশি ঝড়ের পরে যারা থাকল তাদের যত্নের কথা ভুললে চলবে না।

আমফান ঝড়ে গাছের মৃত্যু। কলকাতায়। ছবি: সুপ্রিয় নাগ

লেখক ‘‌জল জঙ্গল’‌ পত্রিকার সম্পাদক

জনপ্রিয়

Back To Top