সুচিক্কণ দাস- আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস। ভারী খটোমটো নাম। কিন্তু এই খটোমটো নামেই লুকিয়ে রয়েছে গভীর আশার বাণী। আপাতত তেমনটাই বিশ্বাস বিজ্ঞানীদের। 
আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস আসলে একটা জীবাণুর নাম। নামটা দিয়েছেন জাপানের নারা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানী শোসুকে ইয়োশিদা। ৪০০–৫০০ বছরেও মাটির সঙ্গে মিশে যায় না যে প্লাস্টিক, তাকে সহজেই জীর্ণ করে দিতে পারে এই জীবাণু। 
সারা বিশ্বের সামনে প্লাস্টিক দূষণ এখন নতুন আতঙ্ক। সেই প্লাস্টিক খেয়ে হজম করে ফেলতে পারে এই আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস, সংক্ষেপে সাকাই। ওসাকার একটা প্লাস্টিক বোতল প্রসেসিং প্ল্যান্টের মাটিতে এই জীবাণুর সন্ধান পান বিজ্ঞানী ইয়োশিদা। গবেষকদের দলে ছিলেন কিয়োতো ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অ্যাপ্লায়েড বায়োলজির প্রফেসর এমেরিটাস কোহেই ওদা। এই জীবাণুকে নিয়েই এখন নতুন আশা জেগেছে বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে।
প্লাস্টিকের সুদৃশ্য বোতল ছাড়া আজকের দিনের সংসার ভাবাই যায় না। ঝুপড়ি থেকে প্রাসাদ, সর্বত্র অবাধ গতি প্লাস্টিক বোতলের। সুদৃশ্য এই সব বোতলের মধ্যে থাকে সিন্থেটিক আঠা পলিথাইলিন টেরেফথালেট বা PET। বিজ্ঞানীরা জানতেন, পেট্রোলিয়াম বর্জ্য থেকে তৈরি PET–‌কে কোনওভাবেই সহজে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায় না। পেটই সবরকম প্লাস্টিক পণ্যকে দেয় কয়েকশো বছরের আয়ু। আর এরই জেরে গত ৫০ বছরে উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্য অবর্ণনীয় দূষণে ঢেকে ফেলেছে প্রায় গোটা বিশ্বকে। তাই পেট–বিধ্বংসী দুটি নতুন এনজাইমের খোঁজ মেলায় আশাবাদী বিজ্ঞানীমহল। তবে সব গবেষণাই এখন রয়েছে প্রাথমিক স্তরে। কাজ এখনও অনেক বাকি। 
এই নতুন আবিষ্কার ঘিরে গড়ে ওঠা প্রত্যাশার পারদের গুরুত্ব যদি বুঝতে হয়, তবে প্লাস্টিক দূষণ কতদূর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে সেই ছবিটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। 
তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতোই এখন প্লাস্টিক আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে গোটা দুনিয়াকে। এখন পৃথিবীর স্থলভূমিকে ঘিরে থাকা সমুদ্রের বিভিন্ন অংশে যত প্লাস্টিক জমেছে, তাতে আক্রান্ত ৮০০ প্রজাতির প্রাণী। এই তথ্য দিয়েছে স্বয়ং রাষ্ট্রসঙ্ঘ। তথ্য বলছে, এখন প্রতি বছর পৃথিবীর সমুদ্রগুলিতে জড়ো হয় ১৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক। মাছ, সামুদ্রিক পাখি ও কচ্ছপ, অন্যান্য জলচর প্রাণী, সবাই জড়িয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে ভেসে থাকা এই প্লাস্টিকের স্তূপে। তারপর দমবন্ধ হয়ে, না খেতে পেয়ে কিংবা জলে ডুবে গিয়ে তারা অকালমৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। সাধারণত, প্লাস্টিক মাটির সঙ্গে মিশে যেতে লাগে কয়েকশো বছর। তবে কিছু প্লাস্টিক দ্রুত ছোট ছোট কণায় ভেঙে গিয়ে সামুদ্রিক খাবারের মধ্যে দিয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের পাকস্থলীতেও। যাচ্ছে কড, হ্যাডক, ম্যাকারেল মাছ ও শেলফিশের মধ্যে দিয়ে। মার্কিন ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ সার্ভিস সংস্থা জানাচ্ছে, প্লাস্টিক দূষণে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে লক্ষাধিক সামুদ্রিক পাখি। বহু মৃত পাখি ও কচ্ছপের পাকস্থলীতে মিলছে আস্ত প্লাস্টিক। বিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রায় ৬০ শতাংশ সামুদ্রিক পাখি ইতিমধ্যেই প্লাস্টিক খেয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ সামুদ্রিক পাখিদের ৯৯ শতাংশের পেটেই মিলবে প্লাস্টিক। 
গত বছর জুলাই মাসে সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল যে, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে যত প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয়েছে তার পরিমাণ হবে ৮০০ কোটি ৩০ লক্ষ টন। এর ৭৯ শতাংশই এখন বর্জ্য যা নানা ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীতে। ২০১৬ সালের একটা হিসাব বলছে, গোটা বিশ্বে সে বছর বিক্রি হয়েছিল ৪৮০ বিলিয়ন প্লাস্টিকের বোতল। হিসাব কষে দেখা গেছে তখন মিনিটে বিক্রি হত ১০ লক্ষ বোতল। এর মধ্যে কোকাকোলারই দরকার হত ১১০ বিলিয়ন বোতল। সর্বশেষ হিসাব বলছে, এখন প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক জড়ো হচ্ছে পৃথিবীর সমুদ্রগুলিতে।
সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত ২০১৫ সালের এক নিবন্ধে জানা গেছে,  সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের জন্য দায়ী ১৯২টি উপকূলবর্তী দেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে ওপরের দিকে রয়েছে ২০টি দেশ। এদের মধ্যে ১৩টি দেশই এশিয়ার। প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে আমেরিকাও। জনপ্রতি প্লাস্টিক দূষণের বিচারে এখনও আমেরিকা শীর্ষে। 
প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের সেই সব জায়গায় জড়ো হচ্ছে যেখানে বাতাসের ধাক্কায় জলের স্রোত ঘুরতে থাকে। বাংলায় এই জায়গাগুলোর নাম দেওয়া যায় স্রোতের বলয়। এই সব এলাকায় যা কিছু ভাসে তাকে গ্রাস করে স্রোতের বলয়। সারা বিশ্বের সমুদ্রে এমন পাঁচটি বলয় রয়েছে। এদের মধ্যে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় বলয়টি সবচেয়ে পরিচিত। এই সব বলয়ে জড়ো হয়েছে লক্ষ লক্ষ ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্র। 
তাহলে ভয়ঙ্কর এই দূষণ থেকে সভ্যতা বাঁচবে কী করে? কীভাবে দূষণের কবল থেকে রক্ষা পাবে সমুদ্র? কীভাবে প্লাস্টিকের গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে সামুদ্রিক প্রাণীরা ? এ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। 
আর ঠিক এখানেই উঠে আসছে আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস–এর প্রসঙ্গ। ওসাকার গবেষণাগারে দেখা গেছে এই জীবাণু ০.২ মিলিমিটার পুরু পেট পর্দাকে এক মাসের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড ও জলে পরিণত করে দিতে পারে। ২০১৬ সালে অধ্যাপক ওদা যখন তাঁর প্রবন্ধে সামনে নিয়ে এলেন প্লাস্টিকখেকো এই জীবাণুর কথা তখন স্তম্ভিত হয়েছিল গোটা বিশ্ব। 
এরপর ২০১৭ সালে চীনা বিজ্ঞানীদের একটা দল  পেট–বিধ্বংসী একটা এনজাইমের কাঠামো বিশ্লেষণ করলেন। তাঁরা সেই এনজাইমের নাম দিলেন PETase। এরপর ওই এনজাইমের কাঠামো নিেয় বিস্তারিত লিখলেন দক্ষিণ কোরিয়া ও চিলির বিজ্ঞানীরা। যে এনজাইম প্লাস্টিককে জীর্ণ করে তার ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা। এরপরেই সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হল এই খবর যে, পেট বোতলকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা ও প্লাস্টিকের আরও কার্যকর পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিপ্লবের সূচনা করতে পারে আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস। একই ধরনের অন্য একটা এনজাইমের নাম দেওয়া হল MHETase। এই এনজাইমের ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ করে তাক লাগিেয় দিলেন জার্মান বিজ্ঞানীরা। প্রফেসর এমেরিটাস ওদার মতে, যদিও অনেকটা সময় লাগবে, তবু প্লাস্টিক দূষণের সমস্যা মেটাতে অনুঘটকের কাজ করবে জীবাণু আইডিওনেল্লা সাকাইএনসিস–ই। এ খবর সামনে আসার পর প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে ইতিমধ্যেই খোঁজখবর করতে শুরু করেছে বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থাগুলি। এর ফলে কীভাবে একটা এনজাইম পেটকে জীর্ণ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে, সেই গবেষণাও রীতিমতো গতি পেয়েছে। সত্যিই যদি জীবাণু সাকাই গণহারে পেটকে জীর্ণ করে কার্বন অক্সাইড ও জলে পরিণত করতে পারে, তাহলে ব্যাপক হারে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাবে পৃথিবী। ক্লেদমুক্ত হবে দূষণের কবলে পড়া সমুদ্র। রক্ষা পাবে সামুদ্রিক প্রাণীর দল। মানব সভ্যতা রক্ষা পাবে তার নিজেরই প্রয়োজনে সৃষ্টি করা একটা দূষণের হাত থেকে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top