দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী:  ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌বিরোধী ঐক্যের কথা যতই হোক না কেন, বিরোধীরা এখন স্পষ্টতই দুটো শিবিরে বিভক্ত। একটা শিবির সরাসরি কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষপাতী। মহারাষ্ট্রের শারদ পাওয়ার, কর্ণাটকের এইচ ডি দেবগৌড়া, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী ও অখিলেশ যাদব, এবং অবশ্যই বিহারের লালুপ্রসাদ রয়েছেন এই শিবিরে। কারণ, কংগ্রেসের সহযোগী হিসাবেই বিভিন্ন রাজ্যে এঁদের বাড়বাড়ন্ত হওয়া সম্ভব। বিরোধীদের অন্য শিবিরে আছেন ওড়িশার নবীন পট্টনায়ক, তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও (‌কেসিআর নামে যিনি বেশি পরিচিত)‌ ‌ও অন্ধ্রের জগন্মোহন রেড্ডি। এঁরা স্পষ্টতই কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক বা সহযোগিতার বিরুদ্ধে। এখন এঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। আলাদা আলাদা কারণে এঁরা কেউই কংগ্রেসের সঙ্গে আসতে রাজি নন। কেজরিওয়াল তো আবার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি কোনও বিরোধী জোটেই থাকবেন না। এমন একটা পরিস্থিতি যে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে পরম পছন্দের তাতে কোনও সংশয় নেই। কারণ, তাঁর দলের আসন ২০১৯–এ ৬০ থেকে ৮০টা কমে যেতে পারে। দাঁড়াতে পারে ২০০ বরাবর। তারপরেও কিন্তু সরকার গড়তে তাঁর অসুবিধা হবে না, যদি বিরোধী শিবিরের কংগ্রেস–বিরোধী দলগুলির সমর্থন তিনি পেয়ে যান। 
তা সত্বেও, নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে কোনও মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে উঠবে না, এমন কিছু এখনও বলা যাচ্ছে না। কারণ, এই দুই শিবিরের মধ্যে সেতুর কাজ করতে পারেন মমতা ব্যানার্জি। বিরোধীদের এই দুই শিবিরের কাছেই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা সমান। কারণ তিনি কোনওভাবেই কংগ্রেসর ওপর নির্ভরশীল নন, আবার কংগ্রেসেকে অচ্ছুত বলেও মনে করেন না। কংগ্রেস যদি রাজ্য সরকারের বিরোধিতা বন্ধ করার বিনিময়ে লোকসভার ভোটে রাজ্যে ৩–৪টি আসন চায়, তাহলে তিনি তা ছেড়ে দিতেই পারেন। আবার কংগ্রেস যদি আলাদা লড়ে, তাহলেও তাঁর কিছু এসে যাবে না। কিন্তু এই দুটো শিবিরকে মেলানো মোটেই সহজ নয়। কিছুদিন আগে রাজ্যসভায় ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে ভোটাভুটির সময় যা হল, তা থেকেই একথা স্পষ্ট। ওই পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের নেতা বি কে হরিপ্রসাদকে অনেকটা পিছনে রেখে এনডিএ প্রার্থী হরিবংশ নারায়ণ সিং সহজ জয় পেয়ে গেছিলেন। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আপ ও জগন্মোহন রেড্ডির ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সাংসদরা কংগ্রেসের প্রার্থীকে ভোট দেবেন না বলে ভোটাভুটিতে অংশ নেননি। আর নবীনবাবুর বিজু জনতা দল ও কেসিআর–এর তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি সরাসরি সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আপ–এর তরফে সঞ্জয় সিং পরে বলেন, রাহুল গান্ধী ফোন করে কেজরিওয়ালের কাছে তাঁদের সমর্থন চাননি বলেই তাঁরা ভোট দেননি। তাঁর প্রশ্ন ছিল, রাহুল গান্ধী লোকসভায় প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে পারলে একটা ফোন কেন করতে পারেন না অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে?‌ প্রশ্নটার মধ্যে খোঁচাটা সহজবোধ্য। 
একই রকম সহজবোধ্য আর একটা কথাও। লোকসভা ভোটের পরে নবীনবাবু বা চন্দ্রশেখর রাওয়ের সঙ্গে বিজেপির সমঝাতার রাস্তা খোলা থাকল। একইভাবে অন্ধ্রের জগন্মোহন রেড্ডির সঙ্গে পরোক্ষ সমঝোতার পথও খোলা আছে, ‌যেহেতু তাঁর প্রতিপক্ষ চন্দ্রবাবু নাইডু আপাতত কংগ্রেস শিবিরে আছেন। স্পষ্টতই বিরোধী শিবিরের এই কংগ্রেস–বিরোধী অংশ রাহুল গান্ধীর ‘‌হাগ অ্যান্ড উইঙ্ক’‌ (‌জড়িয়ে ধরা ও চোখ টেপা)‌ রাজনীতি বরদাস্ত করতে রাজি নন। রাহুলকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, ২০১৯–এ বিজেপিকে বাদ রেখে কোনও সরকার তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিলেও এঁরা চাইবেন না কংগ্রেস তাতে যোগ দিক। এই অবস্থায় এই দুই শিবিরের রফা কী করে হতে পারে, সেই সূত্র খুঁজে বার করতে হবে। কী হবে সেই সূত্র, তা জানা নেই। শুধু এইটুকু জানা আছে, সেই চেষ্টাটা মমতা ব্যানার্জিকে এখনই শুরু করতে হবে। না–হলে দেরি হয়ে যাবে।
‌বিরোধী শিবিরের কিছু দল কেন এমন অবস্থান নিচ্ছেন সেটাও স্পষ্ট। এবং সেটা বেশ মজারও। নবীনবাবু আর কেসিআর ঠিক উল্টো কারণে কংগ্রেসের ছোঁয়াচ বাঁচাতে চান। নবীনবাবুর সঙ্গে এখনও ওড়িশার ৪৩–৪৪ শতাংশের মতো ভোটার আছেন। উল্টোদিকে, তাঁর বিরোধী শিবিরের দুই দল বিজেপি আর কংগ্রেসের দিকেও প্রায় সমপরিমাণ ভোটার আছেন। কিছুদিন হল কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে দ্রুত উঠে আসছে বিজেপি। বিজেপির এই উত্থানে ভোট কমছে কংগ্রেসের, কিন্তু নবীনবাবুর ক্ষতি হচ্ছে না। এখন নবীনবাবু যদি কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলান, তাহলে কংগ্রেসের পুরো ভোট বিজেপি–র দিকে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বিজেপি ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে যেতে পারে। তাহলে নবীনবাবুর ঘোর বিপদ। কিন্তু বিজেপি যদি নবীনবাবুর সাহায্য নেয়, তাহলে বিজেপি–র ভোটের একটা অংশ কংগ্রেসের দিকে চলে যেতে পারে। তাতে নবীনবাবুর কোনও ক্ষতি নেই। বিজেপি আর কংগ্রেসের ভোটের ব্যবধান যত কমবে, তত আসন বাড়বে শাসক দলের। তাই নবীনবাবু কংগ্রেসের সঙ্গে যেতে পারবেন না। উল্টোদিকে, কেসিআর কংগ্রেসের সঙ্গে গেলে তাঁর ভোট কংগ্রেসের দিকে চলে যেতে পারে। তাই কেসিআর চাইবেন না কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসুক। কিন্তু বিজেপি যেহেতু রাজ্যের ছোট শক্তি, তাই তাদের সঙ্গে গেলে এই মুহূর্তে কেসিআর–এর খুব একটা ক্ষতি নেই। তবে রাজ্যের মুসলিম ভোটারদের কথা মাথায় রেখে কেসিআর কখনওই বিজেপি–র সঙ্গে প্রাক–নির্বাচনী সমঝোতায় যাবেন না।
কেজরিওয়াল আর অন্ধ্রের জগন্মোহন রেড্ডির গল্পগুলোও আলাদা আলাদা। এঁদের সরাসরি বিজেপির সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। তবে ভবিষ্যতে লোকসভা থেকে ওয়াকআউট করে বা ভোটদানে বিরত থেকে বিজেপির সুবিধা করে দিতেও আপত্তি থাকারও কথা নয়। জগন্মোহন রেড্ডি, সম্ভবত, এখন অন্ধ্রের সবথেকে বড় রাজনৈতিক শক্তি। তাঁর বাবা, কংগ্রেসের ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি, খুবই জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ওয়াই এস আরের আকস্মিক মৃত্যুর পর সোনিয়া গান্ধী দলের দায়িত্ব পুত্র জগন্মোহনকে দিতে রাজি না–হওয়ায় তিনি বাবার নামে আলাদা দল গড়েন। এখন রাজ্যে তাঁর প্রতিপক্ষ চন্দ্রবাবু নাইডু কংগ্রেসের কাছের লোক। তাই জগন্মোহন কংগ্রেসকে বরদাস্ত করবেন না। অন্যদিকে কেজরিওয়াল বেশ কিছুদিন ধরে কট্টর বিজেপি–বিরোধী হিসাবে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। কংগ্রেসকে তিনি দিল্লির ২–৩টি আসন ছেড়ে দিতে রাজি ছিলেন। পরিবর্তে পাঞ্জাব–হরিয়ানায় কয়েকটি আসনের প্রত্যাশা নিশ্চয়ই ছিল তাঁর। কিন্তু দিল্লিতেই তাঁকে জমি ছাড়তে নারাজ কংগ্রেস। আপ আলাদা লড়লে পঞ্জাব, হরিয়ানাতেও বিজেপি–বিরোধী ভোটে কিছুটা ভাগ বসাতে পারে।‌‌‌
দেশের নেতা হওয়ার মতো পরিপক্কতা এখনও রাহুল গান্ধীর নেই। বিভিন্ন দলের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্যতাও নেই। নিঃসন্দেহে সেই গ্রহণযোগ্যতা মমতা ব্যানার্জির আছে। এখনই তিনি উদ্যোগী না–হলে ২০১৯–এ সার্বিক বিরোধী ঐক্যের ছবি তৈরি হবে না। সেই ছবি তৈরি না হলে বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে থাকবেন। সেক্ষেত্রে কিন্তু নরেন্দ্র মোদি আরও একবার ওয়াকওভার পেয়ে যেতে পারেন।  ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top