মালা শেলী‌‌: পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যার কথা আমরা ভাবি না। হয়তো প্রয়োজনও নেই। কিন্তু ভারত–‌পাকিস্তান সম্পর্কের স্বরূপ জানতে হলে পাকিস্তানের বর্তমান বিমূর্ত সমস্যাগুলো আমাদের অনুধাবন করতে হবে।
আশ্চর্যের বিষয়, পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যা হল তার নিজস্ব সংজ্ঞা নির্ধারণ। পাকিস্তান কি এক ‘‌মুসলিম রাষ্ট্র’‌ না ‘‌ইসলামি রাষ্ট্র‌’, ‌অথবা ভারতবর্ষেরই ‘‌‌‌ইসলাম অধ্যুষিত’‌ অংশ। এই শ্রেণিবিন্যাস আপাতদৃষ্টিতে এক অর্থহীন শ্রেণিবিভাজন নয়, পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যা এই শ্রেণিবিভাজনের মধ্যেই বিধৃত রয়েছে। পাকিস্তানের প্রথম অধিকর্তা মহম্মদ আলি জিন্নার কাছে ‘‌ইসলাম ধর্ম’‌ একান্তভাবেই রাজনৈতিক প্রয়োজনে অনুভূত হত। জিন্নার কাছে কংগ্রেসের বিপ্রতীপে মুসলিম লিগের প্রতিযোগী অবস্থানের জন্যই লিগের প্রয়োজন হয়েছিল। এবং তা সম্ভব হয়নি বলেই বিভাজনের মাধ্যমে জিন্না নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। দেশ–‌বিভাগ তারই পরিণাম।
ইসলামের প্রয়োজন হয় আরও পরে যখন পূর্ববাংলা, উত্তর–‌পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল এই সমস্ত বিভিন্নতাকে একত্রিত করার জন্য—‌ অবশ্যই পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে রক্ষণশীল ‘‌দেওবন্দী‌’‌ উলেমারাও কিন্তু একান্তভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদেই আস্থা রাখতেন এবং দেশ–‌বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু এঁদেরই এক বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশ মব্বির আহমেদ উসমানী—‌ ১৯৪৫ সাল নাগাদ দেশ–বিভাগ সমর্থন করা আরম্ভ করলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তাঁরা বললেন এই ‘‌উলমা‌’‌, দেশের ধর্মনেতারাই দেশ–শাসনের ব্যাপারে ‘‌শরিয়ত–‌নির্ধারিত‌’‌ পন্থার অনুসরণ করবে। এবং তার নির্দেশ দেবে।
অন্যদিকে ছিলেন আর এক গোষ্ঠী, যার নেতা ছিলেন ‘‌মৌলানা মৌদুদী’‌। তাঁর পেশা ছিল সাংবাদিকতা। তিনি দেশ–‌বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। অবশ্য অন্য কারণে। তিনি চেয়েছিলেন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, যেখানে ইসলাম ধর্মের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রের পরিচালনা। এবং জাতীয়তাবাদ। যদিও এই প্রাচীনপন্থী উলেমা এবং একান্তভাবেই ইসলামপন্থীদের মধ্যে পার্থক্য সত্ত্বেও তঁারা কিন্তু পাকিস্তানের সংবিধানে উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে পাকিস্তানের সংবিধানে উদারনীতি বর্জন করতে সমর্থ হন।
আধুনিকতাবাদী ইসলাম, ঐতিহ্যিক ইসলাম এবং মৌলিক ইসলাম— এই তিন ভাবধারার পারস্পরিক বিরোধিতা পাকিস্তানের পক্ষে অত্যন্ত অসুবিধার সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আরও প্রকটভাবে। সর্বোপরি উৎপত্তিগত বিচারে ভারতের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পরিচয় অস্বীকার করা যায় না। তাদের কাছে বর্তমানে সেটাও বাঞ্ছনীয় নয়।
কিন্তু এই ভারতীয় অতীতকে অস্বীকার করার ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় উপমহাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করলেও, সংস্কৃতির সমস্ত বিভাগে, আহার, বিহার, ভাবধারা, কথাবার্তা, সঙ্গীত—‌ সব কিছুতেই ভারতীয় অভিজ্ঞান, পাকিস্তান এখনও অস্বীকার করতে পারছে না। 
পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যা তাই। ভারতীয়তার এই কুটাভাস তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। এবং এটাই পাকিস্তানবাসীদের বর্তমান মানসিক সমস্যা যার সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। এই অপারগতাই তাদের ভারত–‌বিদ্বেষের আসল কারণ। স্বদেশের সংস্কৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য যতদিন তাদের মনে সন্নিযুক্ত ‌‌না হয় ততদিন ভারত–বিদ্বেষের অবসান হওয়া সম্ভব নয়।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top