সরোজ উপাধ্যায়: মোদি সরকারের চার বছর পূর্তি  হওয়ার পর কয়েকটি মাস চলে গেল। ২০১৯–এর সাধারণ নির্বাচনের দামামা বাজতে চলেছে। গত নির্বাচনের আগে মোদি দেশবাসীকে ‘‌আচ্ছে দিন’–এর স্বপ্ন ফেরি করেছিলেন। ‘‌সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’‌ বা ইনক্লুসিভ গ্রোথ–এর কথাও বলেছেন। আর্থিকবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ মাত্রাকে ছুঁয়েছে। বিমুদ্রাকরণের অসঙ্গতি কাটিয়ে এই বছর দেশের আর্থিকবৃদ্ধি ঘটতে চলেছে ৭.‌৫ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার নিয়ে ভারত চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে, যদিও চীনের জাতীয় উৎপাদন ভারতের ৫ গুণ। আর্থিকবৃদ্ধি হলেও অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী সঞ্চয়, বিনিয়োগ বেড়ে চলে। এমন অবস্থায় কর্মসংস্থানের হারও বাড়ার কথা। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। সংগঠিত ক্ষেত্রে ২০০৯ থেকে ২০১১–‌র মধ্যে গড়ে ১০ লক্ষের ওপর কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রতি বছর। অর্থাৎ তিন বছরে চাকরির সৃষ্টি হয় ৩০ লক্ষের ওপর। কিন্তু ২০১৫ ও ২০১৬–‌তে এই দুই বছরে সংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়োগের হার ২ লক্ষের বেশি অতিক্রম করেনি। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব আনার দিন ভাষণ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, লেবার ব্যুরোর সমীক্ষা অনুযায়ী গত চার বছরে মোট চার লক্ষ চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৭ থেকে বিমুদ্রাকরণজনিত পরিস্থিতি উপলক্ষে দেশে কর্মসংস্থান কমে গেছে। গত এক বছরে যদিও বিকাশের হার বেড়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বছরে ২ কোটি চাকরির স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই কর্মহীন অবস্থাই সৃষ্টি করেছে জবলেস গ্রোথ বা কর্মহীন আয়বৃদ্ধি। 
এমন অবস্থা হল কেন?‌ বিশ্ববাজারে আপেক্ষিক মন্দা, বড় বড় দেশগুলির মধ্যে শুল্ক যুদ্ধ রপ্তানিকে বাড়তে দিচ্ছে না। এর ফলে রপ্তানিকারক সংস্থার আয় কমেছে, খরচ বাঁচাতে তারা কর্মী সঙ্কোচন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও একটা স্থবিরতা চোখে পড়ছে। শিল্প–উৎপাদন সূচক টালমাটাল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে বারবার। 
পরিকাঠামো, নির্মাণ–শিল্প এমনকী টেলিকম ক্ষেত্রেও মন্দার ভাব এসেছে। বহু কোম্পানি তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ হয়েছে ১০ লক্ষ কোটি টাকা। বহু কোম্পানির ভাগ্য এখন ঝুলে রয়েছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল’‌ ট্রাইবুনালের হাতে যারা স্বাভাবিক উৎপাদন করতে না পেরে কর্মসংস্থান করতে পারেনি। অন্যদিকে দেশের এই আর্থিকবৃদ্ধি মূলত ঘটেছে চাহিদাবৃদ্ধি ও ভোগব্যয়বৃদ্ধির জন্য। জাতীয় আয়ের শতকরা ৭০ ভাগের কাছাকাছি ভোগব্যয়ে চলে যাচ্ছে। মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে প্রয়োজনাতিরিক্ত টাকা, ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণকারী ক্ষেত্রগুলিতে (‌পরিভাষায় যাকে বলে কনসপিকুয়াস কনজাম্পশন)‌। যেমন বিলাসী গাড়ি, বাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, হোটেল বিল, হীরে, গয়না প্রমুখ বিলাসবহুল ক্ষেত্রে যা কর্মসংস্থান বাড়াতে অক্ষম। দেশের যে আটটি ক্ষেত্র যা সব থেকে বেশি লোককে নিয়োগ করে সেগুলি হল টেক্সটাইলস, চর্মশিল্প, পরিবহণ, অটোমোবাইল, মেটাল, জেমস জুয়েলারি, আইটিও, বিপিও এইগুলির সবকটি ক্ষেত্রেই কর্মসঙ্কোচন ঘটেছে। জিএসটি ব্যবস্থার হঠাৎ প্রবর্তন হওয়ার জন্য অপ্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থায় একটি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। (‌জিএসটিকে এখন বাস্তবমুখী করার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন ভাবে)‌। রাতারাতি জিএসটি চালু হওয়ার ফলে বহু জিনিসের দাম অপ্রত্যাশিত ভাবে বেড়ে গিয়ে সেই জিনিসগুলির চাহিদায় মন্দাভাব লক্ষিত হয় এবং উৎপাদন অনিশ্চয়তা এনে কর্মসঙ্কোচন ঘটায়।
 সরকার রাজকোষ ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে একটি যান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করেছে। বহু প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়োগ করা হয়নি। ফলে সরকারি নিয়োগ বাড়েনি। সরকারের সুসংহত বিনিয়োগ নীতির অভাবে সরকারি ক্ষেত্রগুলিতেও নিয়োগ অপ্রতুল। দেশে যখন কর্মসংস্থান কম থাকে, তখন সরকার বহু দেশে পরিকাঠামো শিল্পে বিনিয়োগের মারফত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। বাজপেয়ী সরকার সোনালি চতুর্ভুজ তৈরি করে একটি উল্লেখযোগ্য উৎপাদনমুখী কাজ করেছিল, কিন্তু বর্তমান সরকার তেমন কোনও সুসংহত প্রকল্প পরিকাঠামো ক্ষেত্রে গ্রহণ করেনি। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকগুলি প্রকল্প চালু আছে, সেগুলি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। 
সুদের হার কমানোর ফলে ঋণের বাজারে অনিশ্চয়তা এসেছে। আমানত সংগ্রহ, সঞ্চয়ের হার হ্রাস পেয়েছে। নেট বিনিয়োগও কমে গেছে। সরকারের মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচি তেমন সফলতার মুখ দেখেনি। সরকার চেষ্টা করেছে ডিজিটাল ইন্ডিয়া, ই–‌কমার্স, ডেটা ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিংকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কিন্তু এখনও সেগুলি সামগ্রিক রূপ পায়নি। ফলে এক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান হয়নি। 
কর্মসংস্থান এবং উদ্যোগ বাড়ানোর জন্য ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের  মধ্যে দিয়ে অনেক ট্রেনিং স্কিম চালু হয়েছে  কিন্তু কাজের বাজারের সামগ্রিক ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র‌্যহীনতার অভাবে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ১০ জনের মধ্যে ৩ জন চাকুরি পেয়েছেন। অনেকে আবার ট্রেনিং নিয়েও কোনও ব্যবসা শুরু করতে পারেননি বা উদ্যোগ আরম্ভ করেননি। সুতরাং স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের প্রচেষ্টায় কর্মসংস্থান খুব একটা ব্যাপকতা লাভ করেনি। 
ভারতের মোট চাকুরিরত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই কাজ করেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে। সরকার কর্মসংস্থানের তথ্যগুলিকে সঠিকভাবে সামনে আনার জন্য অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়োগের তথ্যগুলিকেও সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। কিন্তু এ কথা বলা বাহুল্য দেশের শিক্ষিত যুবক–যুবতীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে গেলে সংগঠিত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। যে বিভাগগুলিতে শূন্যপদ রয়েছে, সেগুলি যথা সম্ভব পূরণ করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিষেবা, গ্রামোন্নয়ন প্রমুখ ক্ষেত্রে প্রচুর লোক দরকার। এইসব ক্ষেত্রে নিয়োগ শুরু হলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হবে ও দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জোয়ার আসবে। কিন্তু শুধু বাজার অর্থনীতির ওপর পরিস্থিতিকে ছেড়ে রাখলে কাজের কাজ কিছু হবে না। 
স্বনিযুক্তি প্রকল্পকে উৎসাহ দিয়ে সরকার ব্যাঙ্ক মারফত ‘‌মুদ্রা’‌ যোজনার খাতে ছোট উদ্যোগপতিদের ৫০০০০ থেকে ১০০০০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে চেয়েছে। এই খাতে কেউ বলছেন ৫ কোটি, কেউ বলছেন ৭ কোটি লোক সাহায্য পেয়েছেন কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন মুদ্রা যোজনায় ২ কোটির বেশি লোক লোন নেননি। অধিকাংশ লোনের গড় আকার ৫২০০০–এর বেশি নয়। এই সাইজের লোনে সূদূরপ্রসারী কর্মসংস্থান হয় না। অন্তত ৫ লক্ষ টাকা লোন না হলে কোনও অর্থবহ প্রোজেক্ট হয় না। 
কর্মসংস্থান না হওয়ার জন্য যুব সমাজে ক্ষোভ বাড়ছে। ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি স্তোকবাক্যে পরিণত হয়েছে। সরকার যদি কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেয়, তা হলে যুব সমাজের হতাশা এক নির্মম পরিণতির দিকে সমাজকে নিয়ে যাবে। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top