সুমন সেনগুপ্ত: ভারতের গণতন্ত্রের খেলা আর যে মাঠে খেলাটা চলছে তার নাম ভারতের সংসদ। কখনও লোকসভা কখনও রাজ্যসভা সব জায়গায় সরকারপক্ষ জিতে চলেছে। একের পর এক বিল আসছে, একের পর এক বিল পাশ হচ্ছে। যদি সংখ্যায় কোনও কমতি হয় তো বিরোধী পক্ষের কিছু সাংসদকে কখনও ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কখনও জোর করে ‘অনুরোধ’ করা হচ্ছে, যাতে সব বিল খুব সহজেই পাশ হয়ে যায়। একটি বিল পাশ হয়েছে যার পোশাকি নাম ‘তথ্যের অধিকার সংশোধনী বিল’। 
২০০৫ সালের ইউপিএ সরকারের আমলে এই বিলটি আনা হয়। মূলত একজন সাধারণ নাগরিককে আরও বেশি সচেতন ও ক্ষমতাসীন করার জন্যই এই বিল আনা হয়েছিল। দৈনন্দিন জীবনে মুদির দোকান থেকে শুরু করে দুধ বিক্রেতার কাছেও হিসেব চান, তাহলে আপনি সরকারের কাছে হিসেব চাইবেন না কেন? আসলে কোথাও একটা আমরা ভুলে যাই যে, ভোট দিয়ে সরকারকে এনেছি তাই সরকারের দায়িত্ব বর্তায় আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। মূলত এই নাগরিকদের আরও বেশি করে জানার অধিকার আছে সরকারি সংস্থার কাছে নোটবন্দিতে কত কালো টাকা পাওয়া গেল?‌ আধার আদৌ কোনও পরিচয়পত্র কি না?‌ আবাস যোজনায় গরিব মানুষদের জন্য কত ঘর ধার্য হয়েছে?‌ ভারতের সাধারণ মানুষ কি এই তথ্য জানতে চাইতে পারেন না? অবশ্যই পারেন। সেই জন্যই এই আইন আনা হয়েছিল ২০০৫ সালে। এতদিন অবধি কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য স্তরের তথ্য আধিকারিকেরা ছিলেন, যাঁদের মূল কাজ ছিল সরকারি তথ্য যদি কোনও নাগরিক জানতে চান তাহলে তাঁরা সেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা। ধরা যাক, কোনও নাগরিক জানতে চাইলেন কোনও সরকারি প্রকল্পে যত টাকা খরচ বলা হয়েছে তত টাকা কি আদৌ খরচ হয়েছে? তখন সেই আধিকারিকের দায়িত্ব এই বিষয়ে উত্তর দেওয়া। এই ভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু কি এমন হল যে আইনটিকে সংশোধন করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল এই সরকারের? আসলে এতদিন অবধি এই তথ্য আধিকারিকেরা ছিলেন সরকার নিরপেক্ষ। মানে যে সরকারই আসুক না কেন, এই আধিকারিকদের কাজ ছিল অনেকটা নির্বাচন কমিশনারের মতন। শুধু তাই নয়, এই আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল সরকার নিরপেক্ষ এবং তাঁদের চাকরিরও একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। এই আধিকারিকদের কাজ ছিল দেশের নাগরিকদের এবং সরকারের মধ্যে যে দূরত্ব থাকে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সরকারের স্বচ্ছতা এবং ভাবমূর্তি রক্ষা করা।
প্রচুর অসুবিধা সত্ত্বেও গত এক দশক ধরে এই আইন চলে আসছিল। গত এক দশকে বেশ কিছু মানুষ এই তথ্য জানতে চেয়ে সরকারের রোষানলে পড়ে প্রাণ অবধি দিয়েছেন। কিন্তু তাও সারা দেশে বহু আরটিআই কর্মী বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে বেশ বিব্রত করেছেন তাঁদের নির্দিষ্ট প্রশ্ন করে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন সময়ে তথ্য জানানোর জন্য বিভিন্ন মানুষকে উৎসাহিতও করেছেন বেশ কিছু আরটিআই কর্মী। নতুন সংশোধনীতে কি আছে?
যে সংশোধনী আনার কথা বলা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, এবার থেকে কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করবে কাকে তাঁরা তথ্য আধিকারিক হিসেবে নির্বাচিত করবে, তাঁর বেতন কত হবে এবং কতদিন তিনি এই পদে আসীন থাকতে পারবেন। এমনিতে খালি চোখে দেখলে খুব বেশি অসুবিধার মনে না হলেও এর পিছনে যে কেন্দ্রীয় সরকারের একটা সূক্ষ্ম চাল আছে সেটা বুঝে নেওয়া জরুরি। যদি সরকার কাউকে তথ্য আধিকারিক হিসেবে নির্বাচিত করে এবং তাঁর কাজের মেয়াদ কিংবা বেতন ঠিক করে দেয়, তা হলে সেই আধিকারিক কি পারবেন নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রশ্নের উত্তর দিতে? গত নির্বাচনে ভারতের নির্বাচন কমিশনার তাঁর ভূমিকা দেখিয়েছেন। তাতে একটা কথা পরিষ্কার। তথ্য আধিকারিকদের চাকরি যদি সরকারি মন্ত্রীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তা হলে ভারতের গণতন্ত্রের যে ভারসাম্য এতদিন এই আইনের সাহায্যে নাগরিকেরা পেতেন তা থেকে নাগরিকেরা অচিরেই বঞ্চিত হবেন। এটা বলতে কি খুব বেশি সাধারণ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়? আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। এই সংশোধনী আনার কারণ কিন্তু সরকার জানায়নি। কেন ১৫ বছরের পুরনো এই আইনটিকে বদলানোর প্রয়োজন অনুভব করল সরকার?
সারা দেশে এতদিন অবধি কী কী তথ্য মূলত নাগরিকেরা জানতে চেয়েছেন? প্রতি মাসে আপনার কতটা রেশন পাওয়া উচিত কিংবা আপনার রেশন দোকানে কতটা রেশন আসে? আপনার গ্রামে কেন পাকা রাস্তা নেই, কিংবা কত টাকা খরচ হয়েছে গ্রামের রাস্তা মেরামত করতে? কবে বিদ্যুৎ পৌঁছবে আপনার বাড়িতে? বার্ধক্য ভাতা পেতে সরকারি নিয়ম কী? প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কী কী ধরনের সুবিধা পাওয়া উচিত?‌— এই ধরনের নানা প্রশ্ন আজ অবধি ক্ষমতাসীন সরকারকে করা হয়েছে যাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দুর্নীতিও সামনে এসেছে। ঘটনাচক্রে এখনকার সরকার ক্ষমতায় এসেছিল গত ইউপিএ সরকারের দুর্নীতির কথা বলেই এবং তাও তথ্য জানার অধিকার আইনের হাতিয়ারকে সামনে রেখেই। কিন্তু তাও এই সংশোধনী আনার পিছনে সরকার চাইছে যে একটা ধারণাকে সমূলে বিনাশ করতে। কী সেই ধারণা? ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। নাগরিকদের রায়ে সরকার নির্বাচিত হয়। নাগরিকদের দেওয়া করের টাকায় সরকার চলে। বাজার থেকে কোনও জিনিস কিনতে গেলে যখন জিএসটি দিতে হয় তাহলে একজন নাগরিক কেন সরকারের কাছে তাঁর দেয় করের টাকার হিসেব চাইবে না? নাগরিকই সরকারের চালক— এই যে ধারণা, এটা ভেঙে ফেলতে পারলেই হবে। তখন প্রতিটি নাগরিক হয়ে যাবে সরকারের ক্রীতদাস। আসলে এই সরকার ভীত, মানুষের শক্তির কাছে ভীত। তাই তারা তড়িঘড়ি এই বিলগুলো আনছে এবং নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারকে খর্ব করতে চাইছে। যাতে কেউ প্রশ্ন না করেন, সেটাকে নিশ্চিত করতে চাইছে। 
আমরা কি একটুও চিন্তিত হব না? আমরা কি নিজেকে প্রশ্ন করব না নাকি শুধুমাত্র বেতন বা ডিএ–‌র আন্দোলনেই আমাদের অধিকারকে সুনিশ্চিত করব? নাকি আমরা এতটাই স্বার্থপর হয়ে গেছি যে চোখ বুজে থাকা ছাড়া আমাদের আর কিছু করণীয় নেই? নাকি আমাদের গোটা রাগ ক্ষোভ উগরানোর জায়গা হয়ে যাবে সোশ্যাল মিডিয়া? রাজস্থানে এই তথ্য জানার অধিকার একটা সময়ে বিরাট সাড়া ফেলেছিল। আবারও কি সময় হয়নি একজন একজন করে মানুষকে বুঝিয়ে নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে আনার?‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top