তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: পূর্ব উত্তরপ্রদেশের দেহাতকে কখনও বিস্মৃত হননি, বিদিয়াধর (‌বিদ্যাধর)‌ সুরজপ্রসাদ নইপল। ছিয়াশি বছরে এই সেদিন পৃথিবী–‌বিখ্যাত লেখক প্রয়াত হলেন। যাওয়ার আগে রেখে গেলেন একগুচ্ছ বই যেখানে নিজের চিন্তাভাবনাকে পরিষ্কারভাবে মেলে ধরেছেন এই লেখক। আর তাঁর চিন্তাভাবনার একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে ঔপনিবেশিকতা, রাজনৈতিক হিংস্রতা, দেশান্তরণ, যা মানুষের শেকড় মাটি থেকে টেনে তুলে এনে তাকে ছিন্নমূল করে ছাড়ে। কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনিও তো ভারতের এক ছিন্নমূল পরিবারের সন্তান।
তাঁর ঠাকুর্দাকে সপরিবারে পূর্ব উত্তরপ্রদেশের গ্রাম থেকে মোটা রোজগারের লোভ দেখিয়ে আড়কাঠিদের সাহায্যে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের আখের খেতের শ্বেতমালিকরা নিয়ে গিয়েছিল। প্রতিশ্রুতির প্র–টুকুও তারা পালন করেনি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিদিয়াধরের দেহাতি ঠাকুর্দা ও তাঁর পরিবার জাহাজের খোলের মধ্যে আরও কয়েকশো পরিবারের সঙ্গে গরু–‌ছাগলের মতো যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আধখানা পৃথিবী ঘুরে কলকাতা থেকে সেই সব জাহাজ যখন পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কোনও দ্বীপে পৌঁছোত, ততদিনে খোলের আশ্রিতদের অর্ধেকই ‘‌নেই’‌ হয়ে যেতেন। তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হত বালির বস্তার মতো দেহগুলি মহাসমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে।
বিদিয়াধরের অশেষ সৌভাগ্য, তাঁর ঠাকুর্দা বালির বস্তায় পরিণত হননি। তাঁর বাবা নিজে পড়াশোনা করেন এবং বিদিয়াধর ও শিব, দুই ছেলেকে সুশিক্ষার সুযোগ দেন। বড় বিদিয়াধর অক্সফোর্ডে যান স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে, তাঁর চেয়ে ১৩ বছরের ছোট শিবপালও। দু’‌জনেই ইংরেজি ভাষার প্রথম শ্রেণির লেখকের মর্যাদা পান। শিবপাল জীবিত ছিলেন মাত্র ৪০ বছর। 
বিদিয়াধর সম্ভবত তাঁর শেকড়কে বিস্মৃত না হওয়ার জন্যই প্রথম নামটি বিদ্যাধর বানানে না লিখে বিদিয়াধর বানানে লেখেন। যাঁরা ভারতের হিন্দি ভাষাভাষী অঞ্চলের গ্রামের অভিজ্ঞতা রাখেন, তাঁরা জানেন ওই এলাকার মানুষের উচ্চারণে একটা টান থাকে। যথা, ‘‌অ রে বিদিয়াধর।’‌ আরে এই বিদ্যাধর। আমার ধারণা এটা খুব সজ্ঞানে, ভেবেচিন্তেই তিনি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পর তিনিই দ্বিতীয় ভারতীয় (‌নাগরিকত্বে নয়)‌ বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ পান ১৯১৩ সালে, আর তার ৮৮ বছর পরে নইপল ২০০১–‌এ। মনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ‘‌গীতাঞ্জলি’‌র জন্য নয়, ইংরেজি অনুবাদে ‘‌সং অফারিংস’‌–এর জন্য নোবেল পুরস্কার পান।
তাঁর লেখার বিষয়বস্তুর সঙ্গে পাঠকরা পোলিশ জাত জোসেফ কনরাডের লেখ্যবস্তুর মিল পান। কনরাড তাঁর সব লেখাই লেখেন ইংরেজিতে। নইপলও তা–ই। স্ব–পরিবারের বিষয়বস্তুর ওপর লেখা ‘‌আ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’‌, সম্ভবত নইপলের সবচেয়ে আলোচিত ও পঠিত উপন্যাস। এই বইটি আমাকে বহুবার নারায়ণ সান্যালের ‘‌বকুলতলা পি এল ক্যাম্প’‌ বা জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘‌বারো ঘর এক উঠোন’‌–এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তফাত, অন্য দু’‌জন কোনও পুরস্কার পাননি এবং তাঁদের সমসাময়িক পাঠকদের সঙ্গে তাঁরাও আজ বিস্মৃত।
আর এক জায়গায় নইপল পড়তে পড়তে আমার নীরদ সি চৌধুরীর কথা মনে পড়েছে। নইপলের ‘‌অ্যান এরিয়া অফ ডার্কনেস’‌ ও ‘‌ইন্ডিয়া: আ মিলিয়ন মিউটিনিস’‌–‌এ খুঁজে পেয়েছি, স্বদেশ–হারানো লেখকের তীব্র তিরস্কারের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর সমবেদনা, হারানো দেশ ও দেশবাসীর জন্য।
তিনটি বিয়ে তিন মহাদেশের রমণীর সঙ্গে, বিপুল পরিমাণ খ্যাতি ও অর্থ নিজের চেষ্টায় অর্জন করেও যে বিদিয়াধর তৃপ্তি পাননি, তা তাঁর লেখায় অত্যন্ত স্পষ্ট। আমার যে বন্ধুরা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়াতেন, তাঁদের কথাতেই ‘‌নইপল ইংরেজদের ইংরেজি শিখিয়ে ছেড়েছেন।’‌‌‌
খুব খাঁটি কথা। তার চেয়েও বড় কথা, নইপল মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায়, তিনি শ্বেতচামড়ার মালিকদের যে সত্যটা বলতে চেয়েছেন তা হল, বহু বছর ধরে তাঁরা যে বলে আসছিলেন কালা ও বাদামিরা ‘‌হোয়াইটমেন’‌স বার্ডেন’, তা আদ্যোপান্ত অসত্য। কারণ একটা সময় হোয়াইটমেনরা ওই কালা ও বাদামিদেরই বার্ডেন ছিলেন। কালের নিয়মে বোঝা বওয়ার কাঁধটা শুধু বদলে গিয়েছে। আর তা তো হবেই। তাঁর নির্ভার গদ্যের ঝর্নাধারায় মূল্য সত্য রয়ে গেছে যেন অবগুণ্ঠিত রমণী।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top