অশোক ঘোষ

লোকসভার চালু অধিবেশনে পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যু প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে শ্রমমন্ত্রীর ‘‌তথ্য নেই’‌ বিবৃতিতে মুখ পুড়েছে সরকারের।
অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা, বেঁচে থাকার উপায়–‌উপকরণের ওপর আগুন লাগিয়েছে সরকার। ক্রমাগত মিথ্যাচার চালিয়ে কার্যত নিজের মুখ নিজে পোড়াচ্ছে।
তবে লজ্জা বস্তুটি একবার ঝেড়ে ফেলতে পারলে মস্ত সুবিধা, কোনও ঘটনাতেই আর লজ্জিত হওয়ার দায় থাকে না। কেন্দ্রীয় সরকার বোধহয় লজ্জাহীনতার শেষপর্বে উপনীত হয়েছে। না হলে সংসদে যখন প্রশ্ন ওঠে লকডাউনের পর ঘরে ফেরার পথে কত সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে, তখন শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ার সম্ভবত চোখ কান বন্ধ করে উত্তর দিলেন দেশের সরকার জানে না ঘরে ফেরার পথে কত পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সরকারের ঘরে কোনও তথ্য নেই।
কোভিড অতিমারী ভারতীয় অর্থনীতির নীচের তলার ছবিটা স্পষ্ট করেছে, যা সাধারণত অন্তরালেই থেকে যায়। ভারতীয় অর্থনীতিতে পরিযায়ী শ্রমিক সংখ্যা গত দু’‌দশক ধরে ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৭ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৯০ লক্ষ মানুষ এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজের সন্ধানে পাড়ি দিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক নিজেদের কর্মভূমিতে সরকারি প্রশাসন এদের নাগরিকের স্বীকৃতি দেয়নি।
দেশজুড়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের মর্মান্তিক দশা, তাদের নিজের নিজের বাড়ি ঘরে ফেরার প্রয়াস এবং তার ফলে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু প্রমাণ করেছে যে, যদিও ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি পরিযায়ী শ্রমিক, কিন্তু তাদের জীবনের ও জীবিকার, ভালমন্দের ভাবনা–‌চিন্তা রাষ্ট্রের কাছে উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে।
স্বাধীনতার পরে লকডাউনের কারণে দেশের মানুষ সর্ববৃহৎ মানবিক সঙ্কটের মুখোমুখি। এই সঙ্কটের সুরাহার নৈতিক দায়–‌দায়িত্ব ছিল সরকারের। শত শত মাইল অন্নহীন মানুষ পায়ে হেঁটেছেন ঘরে ফেরার জন্য। লজ্জায় সরকারের মাথা নত হওয়ার কথা। কিন্তু সে–‌সব দূরে থাক, মন্ত্রী মহোদয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে নির্বিকার হয়ে জানালেন তাঁর কাছে কোনও তথ্য নেই। এই ধরনের পরিসংখ্যান রাখার রেওয়াজ নেই। পায়ে হাঁটা ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত শ্রমিকদের রেললাইনের ওপর ঘুমিয়ে পড়া ও ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে মৃত্যু দেশে নিয়মিত ঘটে না। এ–‌সব কোনও স্বাভাবিক ঘটনাও নয়। আর সরকারের পরিসংখ্যান রাখার কথাও না। কিন্তু সরকারের অবিবেচনায় বিপন্ন শ্রমজীবী মানুষেরা পথেঘাটে, ট্রেনের কামরায়, প্ল্যাটফর্মে, রেললাইনে মারা যাচ্ছে, তা দেখার পরেও এবং প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে বহু ঘটনা প্রকাশ হওয়া সত্ত্বেও কেন সরকার পরিসংখ্যান রাখার কাজ করলেন না!‌
যারা উমর খালিদের বিরুদ্ধে ১১ লক্ষ পাতার প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে, তাদের পক্ষে পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান রাখা অসম্ভব কাজ ছিল না। সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, যেহেতু শ্রম দপ্তরের কাছে কোনও পরিসংখ্যান নেই, অতএব ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও কোনও প্রশ্ন নেই। এর মূল কারণ সরকার দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। সরকারের নির্বিকল্প সমাধি না ঘটলে সংসদে শ্রমমন্ত্রী সব দায়–‌দায়িত্ব অস্বীকার করতেন না। এই ধরনের বিবৃতির পরে সরকার বুঝতেও পারছে না জনসমক্ষে তাদের মুখ পুড়েছে।
অথচ রেলের কাছেই পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যুর কিছু হিসাব তো আছে। শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন চালুর পর মে মাস পর্যন্ত ট্রেন লাইনের প্ল্যাটফর্মে চত্বরে মারা গিয়েছেন ৮০ জন পরিযায়ী শ্রমিক কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরা। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত মৃত্যুর হিসাব যোগ করলে সেটা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। তথ্য জানার অধিকার আইনে এক আবেদনের উত্তরে মধ্য রেল কয়েকজন মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম ঠিকানা দিয়েছিল। সংসদে শ্রমমন্ত্রী অন্তত সেই তথ্যের ভিত্তিতেই উত্তরটা দিতে পারতেন।
সংসদে শ্রমমন্ত্রীর বিবৃতি একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি ‌শুধু ক্ষতিপূরণের নয়। সরকার যদি মৃত পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা না রাখে, তার অর্থ এই মৃত্যুকে সরকার স্বীকৃতি দিচ্ছে না। যে মানুষগুলি সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন, সরকারের কয়েক ঘণ্টার আচমকা নোটিসে যাদের জীবন উথাল–‌পাতাল হয়ে গেল, সেই মানুষগুলোর বিপন্নতার কোনও নৈতিক দায়ই সরকার স্বীকার করছে না। অর্থাৎ সন্তোষ গাঙ্গোয়ার জানিয়ে দিলেন এই মানুষগুলোর মৃত্যু সরকারের চোখে অহেতুক।
হিসাব রাখার সংস্থান আইনেই নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ‘‌আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন’‌ প্রয়োগে আগ্রহী থাকলে সরকার জানতে পারত কোন রাজ্য থেকে কতজন পরিযায়ী শ্রমিক কোন কোন রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছে। এই আইন কেন্দ্রীয় আইন। আইনে বলা আছে, যে রাজ্য থেকে শ্রমিকরা যাচ্ছে তাদের তালিকা রাখতে হবে, আবার যে রাজ্যে যাচ্ছে তাদেরও তালিকা রাখতে হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, কাজ হারানো পরিযায়ী শ্রমিকদের এক বড় অংশ নাম লিখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ রোজগার অভিযানে। তাদের দক্ষতা মাপতে ওয়েবসাইট চালু করেছে কেন্দ্র। এই কর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই নাকি চালু করা হয়েছে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প। তাহলে কাজ হারানো শ্রমিকদের সংখ্যা সম্পর্কে কেন্দ্র এখনও অন্ধকারে থাকে কীভাবে?
ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গৌণ, কিন্তু এই ব্যবস্থা থাকলে অন্তত এটুকু বোঝার উপায় থাকত যে, রাষ্ট্র নিজের আচরণের ফলাফল বোঝে, তার জন্য হয়তো রাষ্ট্র লজ্জিত হলেও হতে পারত। একজন মানুষ রাষ্ট্রীয় সুযোগ–‌সুবিধা তখনই পাবেন যখন রাষ্ট্র তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করবে। কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে চলেছে।
সরকারকে বলা হয় ‘‌আইডিয়াল এমপ্লয়ার’‌ বা আদর্শ মালিক। সেই সরকার যদি নিজের তৈরি আইন নিজেই কার্যকর না করে, তাহলে বেসরকারি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। দায়হীন সরকার ও বেসরকারি মালিকপক্ষ গড়ে তোলে লজ্জাহীন প্রশাসন, যা শেষ পর্যন্ত নির্মম আচরণ করে। আর মানুষ হয়ে পড়ে অসহায়।

জনপ্রিয়

Back To Top