রাজীব ঘোষ: ‌চাই বা না চাই, কিছু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকতেই হয়। সেই সব গ্রুপে অনেকেই অচেনা, চেনা মানুষও আছেন বইকি। ইদানীং সেই চেনা মানুষগুলোর কথাবার্তা খুব অবাক করে দিচ্ছে। সেদিন অমর্ত্য সেনের ছবি দিয়ে একটি পোস্ট এল। বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদির প্রতি শ্লেষ। ব্যস, আর যায় কোথায়!‌ রে রে করে তেড়ে এলেন আমাদের এক বন্ধু। শুরু হয়ে গেল অমর্ত্যর মুণ্ডপাত। সেই সঙ্গে কংগ্রেস আমলের কাজকর্ম নিয়ে নিন্দেমন্দ। লক্ষ করে দেখুন, যে কোনও মঞ্চেই মোদি সরকারের কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই শুরু হচ্ছে ভয়ঙ্কর ‘‌ট্রোল’‌। যুক্তি, আলোচনা, বিতর্কের কোনও বালাই নেই। এই পরিস্থিতির একটু ব্যাখ্যা খোঁজা প্রয়োজন।
২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষিতটা অন্যরকম ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের এক প্রচারক নরেন্দ্র মোদি তখন গুজরাটের নিরীক্ষাগার থেকে বেরিয়ে ভারতের মসনদে বসতে যাচ্ছেন, তখন হিন্দুদের ভোট সংহত করাই ছিল অ্যাজেন্ডা। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বিকাশ বা উন্নয়নের স্লোগানকে শিখণ্ডী করে চমৎকার এগোচ্ছিল বিভাজনের রাজনীতি। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি, রাহুল গান্ধীরা সরাসরি সঙ্ঘকেই আক্রমণ শুরু করলেন। ওঁরা রুখে দাঁড়াতেই সঙ্ঘ পরিবার আবার সংহত। বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সঙ্ঘীরা তাঁদের মতাদর্শ গেলাতে শুরু করেছেন। আসল প্রভু কে বাংলার প্রার্থী–তালিকা দেখে বিজেপি কর্মীরাও তা উপলব্ধি করেছেন। মোদ্দা কথা এবার মোদি না ফিরলে সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাজেন্ডা বিশ বছর পিছিয়ে যাবে। তাই নির্বাচনকে ভারত–‌পাকিস্তান, জঙ্গি মোকাবিলার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ করুন, সঙ্ঘের তরফ থেকে তাদের নিজস্ব ইস্যু আদৌ তোলা হচ্ছে না। যেমন রামমন্দির। কারণ ওই বিষয়টি তুললেই সাধারণ মানুষ জানতে চাইবেন, গত পাঁচ বছরে তোমরা তাহলে কী করলে?‌ উঠছে না কর্মসংস্থানের কথা, কৃষকের দুর্দশার কথাও। সব প্রশ্ন চাপা দিতে ওই পাকিস্তান। যেমন সঙ্ঘের নেতা ইন্দ্রেশ কুমার বলছেন, ‘‌মোদির সরকার এলেই কেল্লা ফতে। এরপর চাইলে লাহোর বা রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়ে জমিজমা কিনতে পারবেন!‌’‌ কেউ বলছেন, আর একটু সময় পেলেই ভারতের বিমানবাহিনী লাহোর গুঁড়িয়ে দিত, লাহোরে গিয়ে তেরঙা উড়িয়ে আসত!‌’‌ আবার ধরুন সাক্ষী মহারাজের মন্তব্য। তিনি বলছেন, এবার মোদি জিতে গেলে ভারতে আর নির্বাচনের দরকার হবে না। ল্যাঠাই চুকে যাবে!‌ ভাবছেন পাগলামি?‌ না। এটাই ওঁদের অ্যাজেন্ডা। সঙ্ঘের নেতারা অখণ্ড ভারতবর্ষেরই স্বপ্ন দেখান। নাগপুরে সঙ্ঘের সদরে যে মানচিত্র, সেখানে আফগানিস্থান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ জুড়েই তাঁরা ভারতবর্ষ দেখেন। ভারতে রাষ্ট্রপতি–প্রধান শাসন চালু করতে গেলে কী লাগবে?‌ সংসদের দুই সভায় দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা লাগবে। চাই যথেষ্টসংখ্যক রাজ্য বিধানসভার সম্মতি। যেনতেনপ্রকারেণ, এমনকী গোয়ার মতো ছোট রাজ্যেও দু’‌জন করে উপমুখ্যমন্ত্রী বসিয়ে রাজ্য দখল করার পেছনে একটা নির্দিষ্ট রূপরেখা আছে বইকি। রাজ্য দখল হলেই রাজ্যসভার আসন বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব। খুবই সহজ কাজ। জানি না, এদেশের কত মানুষ এই আশঙ্কার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। আসন নিয়ে আকচা–‌আকচির ঊর্ধ্বে উঠে বিরোধীরাও কি এই ভয়ঙ্কর প্রবণতার কথা মাথায় রেখেছেন?‌ সেদিন একমাত্র প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকেই বলতে শোনা গেল, ‘‌এবার দেশ বাঁচাবার নির্বাচন।’‌
দেশ দখলের আর একটা ভয়ঙ্কর খেলা চলছে। নির্বাচনের খরচ আছে। আর কে না জানে, এই নির্বাচনেই সবচেয়ে বেশি কালো টাকার রমরমা দেখা যায়। আগে নিয়ম ছিল ২৯(‌সি)‌ ধারায় ২০ হাজার টাকার বেশি কোনও দলকে চাঁদা দিতে গেলে নাম–‌ধাম জানাতেই হবে। আর ১৮২ ধারায় নিয়ম ছিল, কোনও শিল্পসংস্থা তাদের গড় আয়ের ৭.‌৫ শতাংশের বেশি কোনও দলকে দিতে পারবে না। এতে বড় হ্যাপা। মোদি সরকার বলল, নগদ নেব না। তারা ১৩৫, ১৩৬ ধারা বদলে দিয়েছে। এখনও যে কেউ কোনও ব্যাঙ্ক থেকে নির্বাচন বন্ড কিনতে পারে। হাজার, দশ হাজার, লাখ বা কোটি টাকার। কেউ নাম জানবে না, জানতে চাইবেও না। এবার যে কেউ কোটি টাকার বন্ড তার পছন্দের রাজনৈতিক দলকে দিতে পারে। সেই দল ব্যাঙ্ক থেকে বন্ড ভাঙিয়ে নেবে। বিদেশ থেকে ১০ ডলার আনলেও আপনাকে যাবতীয় তথ্য দিতে হবে, কিন্তু শিল্পসংস্থা কোটি কোটি টাকা দিলেও কোনও রাজনৈতিক দল জানাতে বাধ্য নয়। তারা টাকা দেয় পরে ফয়দা তোলার জন্য। লক্ষ করবেন, কীভাবে পরিবেশের আইনকানুন শিকেয় তুলে একটি শিল্পসংস্থাকে খননের জন্য আদিবাসীদের জমি দেওয়া হচ্ছে। আর একটা কোম্পানি পরপর পেয়ে যাচ্ছে বিমানবন্দর রক্ষণাবেক্ষণের বরাত। এবার ধরুন, চীনের কোনও প্রতিষ্ঠান এখানে স্টার্ট আপ কোম্পানি খুলল। তারপর তারা কয়েকশো কোটি টাকার বন্ড কিনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে দিল। সেক্ষেত্রে মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণায় বারবার চীন বাগড়া দিলেও চীনের ওই কোম্পানির ব্যবসা এদেশে সুরক্ষিত। ঘুরপথে বিদেশি যে কোনও রাষ্ট্র এভাবে টাকা দিতে পারে, কিনে নিতে পারে আমাদের সরকারের দণ্ডমুণ্ড। ব্রিটিশ 

জনপ্রিয়

Back To Top