গৌতম রায়: গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির বিজয় বৈজয়ন্তী দেখে, দেশের মানুষের ধারণা হয়ে গিয়েছিল, হিন্দু সাম্প্রদায়িক চিন্তা–চেতনা বুঝি আমাদের দেশের আর্থ–সামাজিক–রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কার্যত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘটিয়ে ফেলল। বস্তুত, গত লোকসভা নির্বাচনের পর লোকসভার প্রথম অধিবেশনে যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানের ৩৭০  নম্বর ধারা এবং ৩৫–এ ধারার অবলুপ্তি ঘটানো হয়, সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমি যখন কেবলমাত্র একাংশের হিন্দুদের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ‘‌রামলালা’‌ র জমি বলে সাব্যস্ত করে, মসজিদ স্থানান্তরের রায় দান করে, তখন স্তম্ভিত ভারত বিবেক, গুমরে কেঁদে উঠেছিল।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের সরকার হিন্দু মুসলমানের চরম বিভাজনের উদ্দেশ্য নিয়ে এনআরসি চালুর যে প্রেক্ষাপট রচনা করে এবং পরবর্তীকালে সিএএ এবং এনপিআর–এর পর্যায়ক্রমেটিকে প্রলম্বিত করে, তা থেকে খুব পরিষ্কার হয়ে যায় যে এনডিএ নামক নীতিহীন সুবিধাবাদী যে জোটের নেতৃত্ব বিজেপি দিচ্ছে, সেই জোটের মধ্যেও কিন্তু একক গরিষ্ঠতায় সাউথ ব্লক দখল করা বিজেপি আদৌ স্বস্তির জায়গায় নেই।
শিবসেনা, যে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে বিজেপির একমাত্র আদর্শগত সখ্যতা ছিল, ক্ষমতা দখলের তাগিদ থেকেই হোক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের রাজনীতি থেকেই হোক, সেই দলটি কিন্তু মহারাষ্ট্র বিধানসভার সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর, এনডিএ তথা বিজেপির সামগ্রিক ছত্রছায়ায় বাইরে রয়েছে। এ কথা মনে করার কোনও কারণ নেই যে মারাঠি অস্মিতা এবং রাজনৈতিক হিন্দু চেতনাকে অবলম্বন করে বিকাশ লাভ করা আঞ্চলিক শক্তি শিবসেনা রাতারাতি তার উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
তবে বিজেপির সাম্প্রদায়িক অভিযাত্রাকে তাদের সঙ্গী সাথীরা যে খুব ভালো চোখে দেখছে না, শিবসেনা বিজেপি পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে পৃথকভাবে মহারাষ্ট্রের সরকার তৈরি করার ভেতর দিয়ে তা কিন্তু স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এনআরসি ঘিরে কিছু ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থান শিবসেনা রাখলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা কিন্তু দুই হাত তুলে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে সমর্থন জানাচ্ছে না। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের ভেতর আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির হিন্দুত্বকে ঘিরে;‌ সামাজিক বিভাজনের রাজনীতিকে তীব্র করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করবার নোংরা ষড়যন্ত্রকে ঘিরে। মতবিরোধ–বিতর্ক–মতভেদ যে কত তীব্র হয়ে উঠেছে, তা বুঝতে পারা গেল এনডিএ–তে বিজেপির জোটসঙ্গী শিরোমণি অকালি দলের অতি সাম্প্রতিক অবস্থানের ভেতর দিয়ে।
অকালি দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা মনজিনদর সিং সিরসা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন— মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়নের যাবতীয় অপকর্মের সঙ্গে তাঁর দল কোনওভাবেই সম্পৃক্ত থাকবে না। দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে জোটসঙ্গী শিরোমণি অকালি দল বিজেপির সঙ্গে একযোগে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এই সিদ্ধান্তে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের রাষ্ট্রহীন করার লক্ষ্যে, বিজেপির সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের সঙ্গীরাও ভালোভাবে নিতে পারছে না।
বস্তুত শিরোমণি অকালি দল কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের জোটসঙ্গী হওয়ার দরুন নিজের রাজ্যে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। পাঞ্জাবের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার সে রাজ্যের বিধানসভাতে, কেরলের মতোই এনআরসিসি  বিরোধী প্রস্তাব গ্রহণ করার পর শিরোমণি অকালি দল রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এই প্রেক্ষিতটি জাতীয় রাজনীতিকে আগামী দিনে আরও অনেক বেশিই যে প্রভাবিত করবে— তেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top