প্রদীপকুমার দাস, সিদ্ধার্থ জোয়ারদার

কোভিড অতিমারী ভারতে অর্থনীতি ও জীবন–জীবিকায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। দেশের গড় জাতীয় উৎপাদন শেষ পর্যন্ত কতটা কমতে পারে, তার হিসেব চলছে। গবেষণা চলছে কাজ হারানো মানুষেরা কীভাবে আত্মনির্ভরশীল সমাজে যুক্ত হবেন। কিন্তু গবেষণার বাইরে থেকে যাচ্ছে, কোভিড প্রতিরোধে গত ৬ মাস ধরে যে অপবিজ্ঞানের প্রসার ঘটেছে, তার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে!‌ কিছু বিশ্বাস ও কুসংস্কারের মাধ্যমে কোভিড অতিমারী নিয়ন্ত্রণের যে কর্মসূচি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচার হয়েছে, তা অনেকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। এর সঙ্গে কিছু বিজ্ঞানী, ডাক্তার, সমাজের অগ্রণী অংশের প্রভাবশালীদের করোনা ভাইরাস নিয়ে অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যুক্তিবাদী মনে আঘাত হেনেছে।
জাতীয় স্তরে প্রথম অপবিজ্ঞানের ঘটনা ২২ মার্চ, ২০২০। জনতা কার্ফুতে ১৪ ঘণ্টা গৃহবন্দি থেকে করোনা–যোদ্ধা ডাক্তার, স্বাস্থ্য ও জরুরি পরিষেবা কর্মীদের প্রতি পঁাচ মিনিট হাততালির কথা বলা হয়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শৃঙ্খল ভাঙার উদ্দেশ্য ছিল এই কর্মসূচির। কিন্তু সরকারি বাণী যে মানুষ যথাযথ গ্রহণ করেনি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল। দলবদ্ধভাবে মধ্যরাত পর্যন্ত এলাকায় এলাকায় বেশ কিছু মানুষ করোনা ভাইরাস বিতাড়নের কীর্তন করে বেড়ালেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন রাস্তাঘাটে পারস্পরিক দূরত্ব রেখে চলাফেরার পরামর্শ দিচ্ছে, তখন সরকারের জাতীয় কর্মসূচিতে আবেগতাড়িত হয়ে একদল মানুষ ভাইরাসের শৃঙ্খল–জোড়ার কাজই করে গেলেন। বিজ্ঞান বা যুক্তি পিছু হঠল আবেগের কাছে।
রাষ্ট্রের তরফে আবার ঘোষণা হল, ৫ এপ্রিল রাত নটায় নয় মিনিটের জন্য দেশের নাগরিকরা যেন বৈদ্যুতিক আলো বন্ধ করে মোমবাতি বা অনুরূপ কোনও আলো জ্বালান। ‘‌৯’‌ সংখ্যাটিকে গুরুত্ব দিতে সকাল নটায় ভিডিও বার্তা দেওয়া হল। তার সপক্ষে প্রচারে বলা হল, বছরের চতুর্থ মাসের পঞ্চম দিন তো নয়–‌ই হয় [৪ (মাস) + ৫ (দিন) = ৯]। কর্মসূ‌চিকে বিজ্ঞানের মোড়কে নিয়ে এসে প্রচার চালানো হল। বলা হল ১৩০টি মোমবাতি একসঙ্গে জ্বালালে যে তাপ তৈরি হবে, তা নাকি বায়ুমণ্ডলে নয় ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বাড়াবে। একদল জ্যোতিষীর মুখ দি‌য়ে প্রচার করানো হল নবম গ্রহ জ্যোতিষের বিচারে মঙ্গল। মঙ্গল হল আলো ও তাপের গ্রহ। কাজেই মোমবাতি আর মঙ্গলের প্রভাবে আলো ও তাপে বিনাশ ঘটবে করোনা ভাইরাসের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সময় ঘোষণা করেছিল, শুধু গরম নয়, জলবায়ুর সঙ্গে করোনা ভাইরাসের বিস্তার, বা বিনাশের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেই যুক্তিকে উড়িয়ে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভূতপূর্ব প্রধান জানালেন, রাষ্ট্রের ঘোষণাটি হল বশিষ্ঠমুনির চলার পথ। যে পথে সকলের চেতনা একসঙ্গে জাগ্রত হলে (রাত ৯টায় একসঙ্গে মোমবাতি জ্বালালে) ফুসফুসের ‘ACE–2’ রিসেপ্টর (‌যে জৈব কণাটির সঙ্গে সার্স–কোভিড ২ ভাইরাস যুক্ত হয়ে  শরীরে রোগের বিস্তার ঘটায়) তার কার্যকারিতা হারাবে। মনগড়া এমন অবৈজ্ঞানিক যুক্তিও বৈদ্যুতিন মাধ্যমে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘‌ভাইরাল’‌ হয়ে গেল। সেলেব্রিটিরা কীভাবে কাদের সঙ্গে কোন কায়দায় মোমবাতি জ্বালবেন, সেই খবর শিরোনাম হল। ভাইরাস দমনের নামে অপবিজ্ঞানের ঢেউ উঠল দেশ জুড়ে।
অনেক শিক্ষিত মানুষের মনে এই নিয়ে দ্বিধা কাজ করলেও আবেগে বাড়ির আলোটা নিভিয়ে ফেলেছিলেন। তখন দেশে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৬৪ জন (বিশ্বের মোট আক্রান্তের ০.১৭%), আর পৃথিবীর দীর্ঘতম ১০০ দিন লকডাউনের পর, প্রায় ৬ মাসের শেষে সেই সংখ্যাটা ৫২.০৬ লক্ষ, বিশ্বে মোট আক্রান্তের ১৭.৫১%, অর্থাৎ ১০০ গুণ বেশি। সহজেই বোঝা যায়, ওইসব কর্মসূচি করোনা ভাইরাস দমনে কার্যকরী পদক্ষেপ ছিল না। যখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের চলাফেরা ও ব্যাপক রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনের কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলেছে, তখন একপক্ষের তরফে গোমূত্র, গোময়, বিস্কুট, পাঁপড়, গঙ্গাজল ইত্যাদি টোটকার প্রচার শুরু হল। বলা হল, এগুলো নাকি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এমনকী ভাইরাসকেও নির্মূল করতে পারে। পাশাপাশি প্রচারে আনা হল আমিষ আহার বর্জনের কথা। প্রচার চালানো হল বাদুড়ের মতো মুরগি থেকেও করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছে। সমুদ্রে ফেলে দেওয়া করোনা রোগীর মৃতদেহ খেয়ে সামুদ্রিক মাছের করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছে।
অর্থাৎ একদিকে অপবিজ্ঞানের সাহায্যে কিছু মানুষের বিস্কুট ইত্যাদির মতো কাল্পনিক করোনা প্রতিরোধকের ফাটকা ব্যবসা বৃদ্ধি; অন্যদিকে দেশের গরিব, প্রান্তিক খামারিদের জীবিকায় সরাসরি আঘাত। গোময়, গোমূত্রর করোনা প্রতিরোধক কার্যকারিতার কোনও গবেষণালব্ধ ফল আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড রোগ সৃষ্টিকারী সার্স–কোভিড ২ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করিয়েও হাঁস ও মুরগিতে ভাইরাসের বিস্তার ঘটছে না এবং কোনও রোগের লক্ষণও প্রকাশ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা জানালেন, কোভিড অতিমারীর বিস্তার কেবল মানুষ থেকে মানুষেই হচ্ছে।
ভাইরাস দমনে গরম–তত্ত্বকেও চতুরভাবে উপস্থাপন করা হল। গরম জল খাওয়া, গরম জলে স্নান। এসবের পাশাপাশি অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে করোনা ভাইরাস মেরে ফেলা, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে করোনা ভাইরাসকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর জিনিসের বিক্রি বেড়ে গেল। এক শ্রেণির চিকিৎসক এ–‌ও বললেন, সূর্যগ্রহণের সময় প্রচুর সংখ্যক করোনা ভাইরাসের মৃত্যু ঘটবে। এর পাশাপাশি আদা ইত্যাদির মতো নানা মহৌষধি খেয়ে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর তত্ত্বও প্রচারিত হল। বেড়ে গেল সুস্থ সবল মানুষের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন সি খাওয়ার প্রবণতা। গলায় চেপেছে ভগবানদত্ত করোনা নিবারণী কার্ড। এমনকী তা ঘুরেছে সমাজের প্রভাবশালীদের গলাতেও। করোনা রোগীদের চাপ এড়াতে সরকারের তরফে বাড়িতে অক্সিমিটার রেখে রক্তে অক্সিজেন মাপার উপদেশ দেওয়া হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা নিয়ে প্রতারণার কথা শোনা গেছে। নিঃশব্দে ঘরে বসে অনেকেই এই অভ্যাস করে গেছেন।
কিন্তু এতসব করেও যখন লোকে করোনা আক্রান্ত হল স্রেফ স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে, তখনও যে সমাজের অন্যরা অপবিজ্ঞানের মোহ থেকে মুক্ত হয়েছেন একথা বলা যাচ্ছে না। অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার প্রথম কাজটি হল তথ্য–মহামারী, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘‌ইনফোডেমিক’‌— তার বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা। মানুষ হল হোমিওথার্ম জাতের প্রাণী। বাইরের তাপমাত্রা যা–‌ই হোক না কেন শরীরের ভিতরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি ধরে রাখতে চেষ্টা করে। ফলে মার্চ থেকে দেশে সাধারণভাবে যে তাপমাত্রা ছিল, তাতে গরম জলে স্নান করে শরীরে করোনা নিবারণী কোনও শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া ঘটতে পারে না। শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে থার্মাল স্ক্যানারে বোঝা যায়। কিন্তু তা থেকে শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। দেশে যেহেতু উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাই থার্মাল স্ক্যানারও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, রোগ প্রতিরোধে অতিরিক্ত ক্ষমতাবর্ধক জিনিস না খেয়ে শরীর ও মনকে সুস্থ ও চাঙ্গা রাখলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে সাবলীল থাকে। মাস্ক নিয়ে যত বিভ্ৰান্তিই থাক, এটি ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় এই কারণে যে, ভারতে উপসর্গহীন কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে; র‌্যাপিড টেস্টে করোনার উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে করোনা ভাইরাস বহনকারীদের নিঃশ্বাসের জলকণা সমেত নির্গত ভাইরাসকে আটকাতে মাস্ক সকলের কাছে গ্রহণীয় সহজলভ্য সংক্রমণ প্রতিরোধক একটি জিনিস। জানা বিষয়েরও বারবার প্রচার দরকার, বিশেষত আজকের দিনে পরিকল্পিত অপবিজ্ঞানের প্রসার রোধে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে কোভিড অতিমারী একদিন নিয়ন্ত্রিত হবেই। কিন্তু কোভিডকে কেন্দ্র করে যে অপবিজ্ঞান  ও কুসংঙ্কারের ছটা প্রকাশ পেল, মানসিকভাবে দুর্বল মানুষের মনে তাতে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার প্রবণতা বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে সমাজ জীবনের নানান ক্ষেত্রে। তাই শুধু কোভিড নিয়ন্ত্রণ নয়, উন্নততর সমাজ গঠনে চাই সঠিক বিজ্ঞান ভাবনার প্রসার। ধারাবাহিক সুস্থ ও যুক্তিবাদী ভাবনার নিবিড় প্রচারই পারবে একে প্রতিহত করতে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top