সুদীপ্ত চক্রবর্তী: ফ্যাসিবাদী পথে আমাদের দেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। এবার থেকে কোনও ব্যক্তি সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপে যুক্ত রয়েছে বলে শুধুমাত্র সন্দেহ হলেই তাকে জঙ্গি হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থাকে (এনআইএ)। এতদিন কেবল কোনও গোষ্ঠী বা সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করার অধিকার ছিল তদন্ত সংস্থাটির।
ইউএপিএ আইনের ৪ নম্বর ধারায় পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে মন্ত্রিসভায়, বিল পাশ হয়েছে সংসদে। তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম–‌সহ সমস্ত বিরোধী দলের সাংসদরা এই বিলের বিরোধিতায় সংসদের অধিবেশন থেকে ‘‌ওয়াক আউট’‌ করেন, বিলটি ২৮৭–‌৮ ভোটে পাশ হয়ে যায়।
নতুন করে এই আইন সংশোধন করার ফলে যে কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী মনে করতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার। স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতেই সন্ত্রাসবাদরোধী কঠোর ধারায় ব্যবস্থাও নিতে পারবে কেন্দ্র। পুলিশ বা প্রশাসনের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়াই যে কোনও রাজ্য থেকে সন্দেহভাজন যে কাউকে ধরেও আনতে পারবে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাটি। যদিও বেআইনি কার্যকলাপ রোধের আইন ইউএপিএ–‌র এই সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্কে বিরোধীরা বলেছেন, রাজনৈতিক ভিন্নমত নিয়ে সরব যে কাউকে এই আইনের সাহায্যে নিশানা বানাতে পারবে কেন্দ্র; রাজনৈতিক লক্ষ্যে অপব্যবহারের যথেষ্ট শঙ্কাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয়ের পদ্ধতিই তুলে দেওয়া হয়েছে বিলে। বিরোধীদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রের যদি মনে হয় কেউ সরকার বিরোধিতায় মুখ খুলছেন, তাকেও ‘‌সন্ত্রাসবাদী’‌ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে।
আশ্চর্য সমাপতন হল এই যে, এখন থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে ইংরেজ শাসকরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করবার জন্য একটি কালা আইন চালু করেছিল। ব্রিটিশ সরকার বিচারপতি রাওলাটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ‘সিডিশন কমিশন’ (Sedition Commission) গঠন করেছিল। রাওলাটের নেতৃত্বে সেই কমিশন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আঁচ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে কিছু সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ১৯১৯ সালের ১৮ মার্চ ব্রিটিশ সরকার এক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এবং দমনমূলক আইন প্রবর্তন করে। এই আইনই ইতিহাসে কুখ্যাত ‘রাওলাট আইন’ (The Rowlatt Act of 1919) নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এই আইনের মাধ্যমে ইংরেজ সরকার প্রকৃতপক্ষে ভারতীয়দের সামান্যতম অধিকারও কেড়ে নেয়। সরকার বিরোধী যে কোনও কাজকেই দণ্ডনীয় অপরাধ বলে এই আইনে বলা হয়। সবথেকে বড় কথা, কোনওরকম প্রমাণ ছাড়াই কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, বিনাবিচারে যতদিন খুশি আটক রাখার অবাধ ক্ষমতা, যখন তখন বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাশির অধিকার সরকারকে দেওয়া হয়। মজার কথা এই যে, সেই সময় যে সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিভিন্নভাবে ইংরেজদের কাছে মাথা নত করেছিলেন (মুচলেকা প্রদান ইত্যাদি), তাদেরই উত্তরসূরিরা দেশে ক্ষমতায় আসীন হয়ে সমস্ত বিরোধী স্বরকে দমাতে ইউএপিএ আইনে পরিবর্তন আনতে সংসদে বিল পাশ করেছে।
সরকারের কাছে যুক্তির অবশ্য অভাব নেই, ঠিক যেমন নেই দুরাত্মার ছলের অভাব। দেশের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু, পরিস্থিতি কি সত্যি এমনই ভয়াবহ যে কোনও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগহীন ব্যক্তিকেও ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করিবার অধিকার দাবি করতে পারে রাষ্ট্র?
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে বিজেপির শাসনে ভারতীয় রাষ্ট্রের দমন–‌প্রবণতা এখন অত্যন্ত প্রবল। সিবিআই, ইডি, আয়কর দপ্তর–‌সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে, বিরোধী দলগুলোকে চাপে রাখতে। পাশ হওয়া জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (সংশোধনী) বিল ও ইউএপিএ (সংশোধনী) বিলের অভিমুখ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার দিকেই আঙুল নির্দেশ করে। 
দেশের প্রবর্তিত বিভিন্ন আইনকে আরও দমনমূলক করে তোলার বিপদ কোথায়, তা বুঝতে আমাদের কোনও অসুবিধা হয় না। এই কঠোরতর আইনের হাতে বলি হতে পারে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার অর্থাৎ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা। আমরা বেশ কিছু উদাহরণ ইতিমধ্যেই পেয়েছি। মহারাষ্ট্রে দলিত আন্দোলনে সমর্থন জানানোর কারণে তুলে নিয়ে জেলে পোরা হয় বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের। তখনই আরএসএস এবং বিজেপি ‘শহুরে মাওবাদী’ শব্দবন্ধেরও আমদানি করে। যদিও আমরা প্রত্যেকেই জানি, ‘‌শহুরে মাওবাদী’ নিতান্তই রাজনৈতিক অভিযোগ। আইনি কোনও সংজ্ঞা নেই। বিরোধীরা বলেছেন, অনির্দিষ্ট এই অভিযোগ তুলে সন্ত্রাসবাদ দমনের দায়িত্বে থাকা এনআইএ–‌কে লেলিয়ে দেওয়া হতে পারে প্রতিবাদে শামিল যে কারও বিরুদ্ধে।
ইউএপিএ (সংশোধনী) বিলের সঙ্গে একই সঙ্গে পাশ হয়েছে তথ্যের অধিকার (সংশোধনী) বিলও। এই বিলের মাধ্যমেও একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার সঙ্কোচন আর রাজ্য সরকারকে টপকে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাবৃদ্ধির ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তথ্যের অধিকার আইনটি এ দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটা বিরাট ক্ষমতা দিয়েছিল। যে দেশে সরকার পরিচালনায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, সরকারি আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই দুর্নীতি এবং দুরাচার দিয়ে ক্ষমতায় আসীন থাকেন, সাধারণ মানুষ যেখানে ন্যূনতম অধিকার থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন এবং নাগরিকের সাধারণ অধিকারটুকু আদায় বা রক্ষা করা আইনি লড়াই ছাড়া অসম্ভব— সেই দেশে ২০০৫ সালে তথ্যের অধিকার আইন দেশবাসীর হাতে অবশ্যই লড়াইয়ের একটা অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। এই আইনি অস্ত্রের মাধ্যমে সরকারি তথ্য জেনে বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে পারতেন। কিন্তু তথ্যের অধিকার আইনের সংশোধনী বিলটি পাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পথটা প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। নতুন আইন অনুযায়ী তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত কোনও দায়দায়িত্বই যেমন রাজ্য সরকারের হাতে থাকবে না, তেমনই পুরো দপ্তরটাই সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চলে যাবে। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, শুধু বলা যায়, এই আইনটির মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে সরকারের যে সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, সেটা অস্বীকার করা হল। নোটবন্দি, রাফাল চুক্তি, নির্বাচনী বন্ড ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগ এবার আর তথ্যের অধিকার আইনের বলে প্রকাশ্যে আনা যাবে না, সরকারি ইচ্ছা–‌অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। স্বাধীনতা পরবর্তী জরুরি অবস্থার সময় ছাড়া এভাবে নাগরিক অধিকার খর্ব করার উদাহরণ আমাদের দেশে নেই।
দেশের আইন প্রণয়নকারীদের মনে রাখা দরকার, প্রতিস্পর্ধী কণ্ঠস্বর কিন্তু নাগরিক স্বাধীনতারই একটি প্রকার। রাষ্ট্র যদি কোনও অন্যায় করে, ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করে, দেশের যে কোনও নাগরিক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভুলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই পারেন, মতপ্রকাশ করতেই পারেন। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সাঁড়াশি আরও কঠোর হলে বিবেচনার অবকাশগুলি, ভুল শোধরানোর সুযোগ ক্রমে সঙ্কুচিত হবে। এটা কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। ইউএপিএ (সংশোধনী) বিলটি সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা (বিচার পাওয়ার অধিকার) লঙ্ঘন করছে বলেও অনেকে মতপ্রকাশ করেছেন।
আসলে ভারতীয় গণতন্ত্রের কবর আগেই খনন করা হয়েছিল, এবারে সেটিকে পাকাপোক্ত করা হল, একেবারে প্রায় নিঃশব্দে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, লোকসভায় বিল পাশ হলেই তো আর আইন হল না, রাজ্যসভাতেও পাশ করাতে হবে আর এখনও রাজ্যসভাতে বিজেপির গরিষ্ঠতা নেই। যদিও তথ্যের অধিকার (সংশোধন) আইনটি রাজ্যসভাতেও পাশ হয়ে গেছে। অন্যদিকে এটাও সত্যি যে, কর্ণাটক বিধানসভার আস্থা ভোট প্রমাণ করে দিয়েছে রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তারপর, ভারত নামের যে দেশটা রয়েছে তাকে আমূল পাল্টে ফেলার ব্যবস্থা নিশ্চিন্তেই করে ফেলতে পারবে বর্তমান সরকারের রাওলাটরা।
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রর কথা অনুযায়ী, শোনা যাচ্ছে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি।‌‌

ছবি: দ্য ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস

জনপ্রিয়

Back To Top