অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

তাঁকে নিয়ে অনেক গল্প। সেই সব গল্প এমনি এমনি গড়ে ওঠেনি। সত্যির চেয়েও বেশি সত্যি লুকিয়ে আছে সেই সব গল্পে। সেই যে মায়ের ডাকে অনেক রাতে যখন কোনও নৌকো পাওয়া গেল না, তখন, ঝড়–‌ঝঞ্ঝার দামোদর সাঁতরে বীরসিংহের ঈশ্বর পৌঁছেছিলেন মা ভগবতীর কাছে। কোনও কোনও গবেষক কঠিন পরিশ্রম করে বলতে চেয়েছেন, এটা আসলে মিথ, সত্যি ঘটনা নয়।
মিথ?‌ কী এসে যায় তাতে?‌ মিথ, কিন্তু মিথ্যা নয়। মা ডাকলে এমন একটা কেন, দু–‌দশটা দামোদর সাঁতরে পেরিয়ে যাওয়ার অসীম শক্তি ছিল তাঁর। আরে, গাঁয়ের শক্তপোক্ত গাট্টাগোট্টা এই ছেলের কাছে সাঁতার কিংবা হাঁটা তো জলভাত।
সেই যে বাবা ঠাকুরদাসের সঙ্গে একরত্তি বালক ঈশ্বর হাঁটতে হাঁটতে কলকাতা এসেছিল, আর, মাইল ফলকের হিসেব দেখতে দেখতে সংখ্যা চেনা হয়ে গিয়েছিল তার— এ গল্পও তো আমাদের জানা।
এর বহু বছর পরে একবার হজমের গন্ডগোলের জন্য ঈশ্বরচন্দ্রকে দেখছেন এক নাম‌করা ডাক্তার। সামান্য ওষুধ–টষুধ দিয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, রোজ কিছুটা সময় হাঁটতে হবে আপনাকে।
বিদ্যাসাগর জিজ্ঞেস করলেন, কতক্ষণ হাঁটব?‌ ডাক্তারবাবু বললেন, যতক্ষণ না ক্লান্ত হচ্ছেন। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, হেঁটে তো আমি ক্লান্ত হব না। যতই হাঁটি না কেন!‌
সেই যে বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কলকাতায় এসেছিলেন, তারপর আর কখনও তাঁর হাঁটা থামেনি। বাংলা ভাষার জন্যে, বাংলার নারীদের জন্যে, বাংলার দীন দুঃখী মানুষদের জন্য অবিরাম হেঁটে গেছেন তিনি। খানাখন্দময় পথ, বিরোধিতায় আকীর্ণ পথ, নিন্দা–‌মন্দ অবজ্ঞায় ভরা পথকে অগ্রাহ্য করে তিনি হেঁটেছেন। অবিরত। একক।
‘‌বৃহৎ বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গলের পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে— বিদ্যাসাগর সেই রূপ বয়োবৃদ্ধিসহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর ক্ষুদ্রতাজাল হইতে ক্রমশই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উত্থান করিয়াছিলেন;‌ সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফলদান করিতেন;‌ কিন্তু আমাদের শতশহস্র ক্ষণজীবী সভা–‌সমিতির ঝিল্লী ঝংকার হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিলেন।’‌ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর বছর তিনেক বাদে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
এমন একজন মানুষ এক জীবনে কত কাজ করেছেন, তার হিসেব কষতে বসলে আশ্চর্য হতে হয়। আমাদের ‘‌বর্ণপরিচয়’‌ করিয়েছেন তিনি। অন্তত ৫০টি বই লিখেছেন। বর্ণপরিচয়ের, ভাষা পরিচয়েরই শুধু নয়, প্রকৃত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছেন আমাদের। লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন। সু–‌সাহিত্যের দরজা খুলে দিয়েছেন আমাদের সামনে। সাধে কি আর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‌বঙ্গসাহিত্যে আমার কৃতিত্ব দেশের লোক যদি স্বীকার করে থাকেন, তবে আমি যেন স্বীকার করি, একদা তার দ্বার উদ্‌ঘাটন করেছেন বিদ্যাসাগর।
মেয়েদের অন্তঃপুরের অন্ধকারে রেখে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রথম যদি সরব হয়ে থাকেন রামমোহন রায়, সেই পথকে আলোর দিকে পৌঁছে দিয়েছেন বিদ্যাসাগর। মেয়েদের স্কুল খুলেছেন। শুধু কলকাতায় নয়, বর্ধমান থেকে শুরু করে নানান জেলায় বিদ্যাসাগর একা ৩৫টা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মেয়েদের জন্য। এটা ১৮৫৭/‌৫৮ সালের ঘটনা। সাত মাসে যে ৩৫টা স্কুল খুলেছিলেন তিনি, তার সব খরচ শুরুতে একাই চালিয়েছিলেন তিনি। ভাবতে গেলে প্রায় অসম্ভব, অবাস্তব বলে মনে হয়। কিন্তু বিদ্যাসাগর তো আমাদের বাস্তব থেকে অনেক দূরের বাস্তবে বাস করেছেন চিরকাল।
বিধবা বিবাহ আইন তৈরির জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সফল হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে ব্যঙ্গবিদ্রুপে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ‘‌বিশিষ্ট’ সব বঙ্গবাসী। এমনকী তাঁকে হত্যার চক্রান্তও হয়েছে। যারা ষড়যন্ত্র করেছে, চক্রান্ত করেছে, তাদের জানা ছিল না, এই সাগরে আগুন আছে। ‘‌সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়’‌। কবি জানতেন। বিদ্যাসাগরকে দেখে অবিশ্বাসী বঙ্গবাসীরও প্রত্যয় হয়েছে, হ্যাঁ, সাগরে অগ্নি থাকে বটে। সে সাগরের নাম বিদ্যাসাগর। সে সাগরের নাম করুণাসাগর। আর, সেই আগুন সাগরের ভেতরে যিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর মা ভগবতী দেবী।
বিধবা বিবাহ নিয়ে তখন তোলপাড় সারা দেশ। বিয়ের পর কয়েকজন বিধবা নারী এসেছেন বিদ্যাসাগরের বাড়ি। কেউ কেউ তাঁদের দেখে ঠাট্টা করল ‘‌জাত গেছে’‌ বলে। তাঁদের চোখে জল। ভগবতী দেবী তাঁদের সঙ্গে এক পাতে খেলেন। বললেন, বুঝলে তো, তোমাদের জাত যায়নি।
একবার বিদ্যাসাগরের বীরসিংহের বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে মাকে কলকাতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করলেন তিনি। মা ভগবতী বলেছিলেন, গরিবের যে সব ছেলে বীরসিংহ স্কুলে পড়ে, আমি চলে গেলে কী খেয়ে তারা ইস্কুলে যাবে?‌
মাকে প্রণাম করে ধন্য হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। আরও ধন্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মাকে একবার জিজ্ঞেস করলেন, মা, তোমার কী কী গয়না পরতে ইচ্ছে করে?‌
ভগবতী দেবী বলেছিলেন, তিনটে গয়না পরবার বড় সাধ।
ছেলে তো বিরাট খুশি। আহা, মায়ের একটু সাধ মেটানো যাবে।
ছেলেকে তিনটি গয়নার কথা বললেন ভগবতী দেবী। এক, গ্রামের ছেলেদের জন্য একটা দাতব্য স্কুল। দুই, গ্রামের গরিব মানুষদের জন্য একটা দাতব্য হাসপাতাল। তিন, গ্রামের গরিব ছেলেদের থাকা–‌খাওয়ার বন্দোবস্ত।
মাকে এই তিনটি গয়না দিতে পেরে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিলেন ভগবতী–‌পুত্র।
একবার বাড়ির জন্যে ছ’‌টা লেপ পাঠিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। সব কটাই গরিব–‌দুঃখীদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন ভগবতী দেবী। আহা, এদের কত কষ্ট। আবার কয়েকটা লেপ চেয়ে পাঠালেন তিনি। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, আমার মায়ের গায়ে যেন একটা লেপ ওঠে। সেইটা ধরে মোট কতগুলো লাগবে তুমি জানাও।
বিদ্যাসাগর সেই সব লেপ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভগবতী দেবী কতদিন লেপটা গায়ে দিয়েছিলেন জানা নেই। গরিব–‌দুঃখীর তো অভাব ছিল না।
এই ছিলেন ভগবতী দেবী। যেমন মা, তাঁর তেমন ব্যাটা। মায়ের কথা বলতে গিয়ে বিদ্যাসাগর বলতেন, আমি যদি আমার মায়ের গুণের একশো ভাগের এক ভাগও পেতাম, তাহলে কৃতার্থ হতাম। আমি যে এমন মায়ের সন্তান, এই আমার গর্ব।
১৮৭১ সালের ১২ এপ্রিল ভগবতী দেবী যখন কাশীতে মারা যান, বিদ্যাসাগর তখন সেখানে ছিলেন না। এই কষ্ট কোনওদিন ভুলতে পারেননি তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর এক বছর তিনি খালি পায়ে হেঁটেছেন, ছাতাও ব্যবহার করেননি, নিজে হাতে রান্না করে একবেলা নিরামিষ খেয়েছেন।
বাবা, মা দুজনকেই জ্যান্ত ঈশ্বর বলে মনে করতেন তিনি। তবে, মায়ের প্রতি ভক্তির কোনও সীমা ছিল না। মনে করতেন, তাঁর যেটুকু ক্ষমতা, যেটুকু কাজ, সবই মায়ের গুণে।
বিদ্যাসাগর গান–‌টান তেমন পছন্দ করতেন বলে শোনা যায়নি। কিন্তু কোনও গানে যদি মায়ের কথা থাকত, ‘‌মা’‌ শব্দটিও থাকত, তিনি স্থির হয়ে যেতেন। মনে হত, ওই ‘‌মা’‌ শব্দেই তিনি ছুঁতে পারছেন নিজের মাকে। এক অন্ধ মুসলমান ভিক্ষুক বেহালা বাজিয়ে শ্যামাসঙ্গীত গাইতেন। বিদ্যাসাগর তাঁকে ডেকে এনে গান শুনতেন। মায়ের গান শুনে ভাসতেন চোখের জলে। আর, উজাড় করে সাহায্য করতেন সেই অন্ধ গায়ককে।
মনে করতেন, তাঁর‌ চালিকা শক্তি তাঁর মা। তাঁর আরব্ধ কাজ শেষ করবার শক্তি যেন তাঁর মা জোগাতেন। এই বিশ্বাস থেকে কোনওদিন একচুলও টলেননি তিনি। এবং যে কাজে হাত দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ না করে বিচ্যুত হননি তাঁর সাধনা থেকে।
তাঁর কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‌আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না;‌ আড়ম্বর করি, কাজ করি না;‌ যা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না;‌ যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না।’‌ এই বাঙালি–‌স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীতে ছিলেন বিদ্যাসাগর। ঘাস জঙ্গলের রাজত্বে বনস্পতির মতো। আর, তিনি বলতেন, এ–‌সবই তাঁর মায়ের জন্য। মায়ের গুণের একশো ভাগের এক ভাগ নিয়েই নাকি এত কিছু।
বিদ্যাসাগরের কথা অমৃত সমান। তাঁর মায়ের কথা অমৃতের অধিক।
বিদ্যাসাগরের জন্মের ২০০ বছরে আজ তাঁর পায়ের কাছে বসে শক্তি ভিক্ষা করতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে করে, তাঁর ভেতরে যে আগুন, সেই সাগরের ভেতরে থাকা আগুনের একটু ফুলকি যেন এসে লাগে আমাদের গায়ে। আমরা যেন আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে পাই তাঁর আলোয়। মনে হয় দু’‌দণ্ড বসি তাঁর পায়ের কাছে। নতুন করে বেঁচে থাকার প্রতিজ্ঞা করি যেন। মনে হয় চোখের জলে ভিজিয়ে দিই দুটো পা তাঁর। ভগবতী–‌পুত্রের। ঈশ্বরের।
(‌ঋণ:‌ রবীন্দ্রনাথের ‘‌বিদ্যাসাগর চরিত’‌, 
শঙ্খ ঘোষের ‘‌বিদ্যাসাগর’‌, ইন্দ্রমিত্রের ‘‌করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’‌)‌   ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top