তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: এক–‌দুবছর অন্তর শ্রাবণের শেষ বা ভাদ্রে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা যে ভরা বর্ষায় ডিভিসি–‌র ছাড়া জলে ভাসবে, এ প্রায় অবধারিত সত্য। অথচ ডিভিসি অর্থাৎ দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন গঠনের প্রধান কারণই ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ। ১৯৪৩ সালে দামোদরের ভয়াবহ বন্যায় গোটা দক্ষিণবঙ্গ ভেসে গিয়েছিল যা ব্রিটিশ–‌ভারত সরকারকে ফ্লাড কমিশন–‌এর সাহায্য নিয়ে করণীয় বিষয় স্থির করতে হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে গোটা দেশ তখন ব্যস্ত, ব্রিটিশরা প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া হল ১৯৪৮ সালে। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে এবং বিহারের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী  ড.‌ শ্রীকৃষ্ণ সিনহার আগ্রহে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গঠন করেন দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন। স্বাধীন ভারতের প্রথম বহুমুখী নদী নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বা নিগম। এর শরিক তিন সরকার— পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং কেন্দ্র। বিহার দামোদরের বন্যায় কখনও বিপন্ন হয়নি, হয়েছে বাংলা। কিন্তু দামোদর ও তার উপ ও শাখানদীগুলির উৎপত্তি তদানীন্তন বিহারের বর্তমান ঝাড়খণ্ডের পাহাড়ি এলাকায়, তাই তাকে না নিলে কর্পোরেশন গঠনই হয়ে যেত অসম্পূর্ণ। এই কর্পোরেশনের প্রধান কাজ ছিল দামোদর, বরাকর ইত্যাদি নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ। এর বাইরে নদীবাঁধ ও ব্যারেজের জল থেকে উৎপন্ন জলবিদ্যুৎ দিয়ে ডিভিসি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বিদ্যুৎ সমস্যা মেটানো। জলাধারে মাছের চাষ, সেচের জল চাষের সময় মাঠে মাঠে পাঠানো ইত্যাদি। গোটা প্রকল্পটি আমেরিকার টেনেসি ভ্যালি অথরিটির আদলে গড়া হয়। টিভিএ–‌র রূপকার বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার ভুরডুইন নেহরুর ডাকে ভারতে এসে দামোদরের গোটা এলাকা পরিদর্শন করে পরামর্শ দেন ৭টি বাঁধ ও একটি ব্যারেজ করার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঞ্চেত, মাইথন, কোনার ও তিলাইয়ায় ৪টি বাঁধ ও দুর্গাপুরে একটি ব্যারেজ গড়েই আমরা বেদম হয়ে পড়ি। ফলে দু’‌এক বছর অন্তর পাঞ্চেত, মাইথন বা তিলাইয়ার বাঁধ থেকে যে বাড়তি জল বর্ষায় ডিভিসি ছাড়ে তাতে বর্ধমানের দক্ষিণাংশে, হুগলি ও হাওড়া বিপন্ন হয়ে পড়ে।
বামফ্রন্ট আমলে বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জি এই ধরনের বন্যায় ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘‌এটা ম্যান মেড বন্যা।’‌ সম্ভবত ইঙ্গিত করেছিলেন বন্যার রাজনীতির প্রতি। কারণ, বন্যা হলে মুখ্যমন্ত্রী হেলিকপ্টারে ভাসমান এলাকা আকাশপথে পরিদর্শন করবেন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীও একবার আকাশপথে বন্যার দৃশ্য দেখে যেতে পারেন। সর্বোপরি কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষক দল আসবে। রাজ্য সরকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেবে, কেন্দ্র কখনই সেই হিসাবের সঙ্গে একমত হবে না। তবে অনেকটা ক্ষতিপূরণ হিসাবে মোটা টাকাই দেবে। ওই টাকার প্রতি রাজনৈতিক নেতা বা শাসকদের অদৃশ্য হাতের খেলার প্রতি ইঙ্গিতই ছিল সেদিন মমতা ব্যানার্জির ম্যান মেড ফ্লাডের কটাক্ষ।
ঠিক এই প্রশ্নটিই ক’‌দিন আগে করেছিলাম ডিভিসি–‌র বর্তমান চেয়ারম্যান প্রবীরকুমার মুখোপাধ্যায়কে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৫–‌র ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ইন্দিরা গান্ধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিধারী প্রবীরবাবু। আমার প্রশ্নটি অর্থাৎ এই বন্যা কতটা ম্যান মেড, শুনে স্পষ্ট বললেন, ‘‌এখন যে কোনও কোনও বছর ডিভিসি–‌র ছাড়া বাঁধের বাড়তি জলে দক্ষিণবঙ্গের কোনও কোনও এলাকা ভেসে যে যায় তার জন্য ডিভিসি দায়ী নয়, দায়ী সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার।’‌
সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘‌ডিভিসি নিজের বাঁধ বাঁচানোর জন্য বাড়তি জল ছাড়ায় যদি দক্ষিণবঙ্গের কোনও কোনও অঞ্চলে বানভাসি পরিস্থিতি হয় তার জন্য তো ডিভিসিই দায়ী হবে, সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার কেন হবে?‌’‌‌
এবার খানিকটা ইতিহাস তুলে ধরে, বাকিটা ব্যাখ্যা করে প্রবীরবাবু বললেন, ‌১৯৬৪ সালে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের অনুরোধে দুর্গাপুর ব্যারেজ, তার লাগোয়া দুদিকের দুটি সেচ খাল সমেত গোটা দক্ষিণবঙ্গের ভার ডিভিসি তুলে দেয় পশ্চিমবঙ্গের হাতে। তখনই সতর্কতা জারি করে ডিভিসি রাজ্য সরকারকে বলেছিল নদীখাতে জল থাকুক বা না থাকুক সর্বদা ২.‌৩ লক্ষ কিউসেক জল বহনের ক্ষমতা যেন ওই মরাখাতেরও থাকে। ওই মরাখাতে যেন জনবসতি না গড়ে ওঠে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। দামোদরের এবং তার শাখা ও উপনদীর মাঝখানে অজস্র জনবসতি গড়ে উঠেছে। আর এই বসতি রাজনৈতিক সম্মতি ছাড়া গড়ে উঠতে পারে না। মাইথন জলাধারে ৪৮০ থেকে ৪৯৫ ফুট পর্যন্ত জল ধরে রাখা যায়, পাঞ্চেতে ৪১০ থেকে ৪৩৫ ফুট। এর বেশি জল হঠাৎ এসে গেলে বাঁধ বাঁচানোর জল ছাড়তেই হবে। এবং জল ছাড়ার ব্যাপারে ডিভিসি–‌কে অনুমতি নিতে হয় দামোদর ভ্যালি রিজার্ভারের রেগুলেটরি কমিটির, যার তিন সদস্য হলেন পশ্চিমবঙ্গের সেচ দপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার, ঝাড়খণ্ডেরও তাই এবং ডিভিসি–‌র চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এর চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় জলসম্পদ কমিশনের মেম্বার–‌সেক্রেটারি।
এই কমিটি অনুমতি দিলে, এবং কতটা জল ছাড়তে হবে তা–‌ও পরিষ্কার জানালে ডিভিসি জল ছাড়ে। তার আগে নয়।
আলোচনায় ইতি টানলেন প্রবীরবাবু এই বলে, ‘‌ডিভিসি এই ধরনের বন্যার জন্য কখনই দায়ী নয়।’‌ তারপর যা ঘুরিয়ে বললেন, তার অর্থ, এখন যে বন্যা হয় নিম্ন–‌দামোদর অববাহিকায় তা মমতা ব্যানার্জির  মন্তব্য মাফিক, ম্যান মেড। কারণ মরা নদীখাতে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্য নেতারাই জনবসতি গড়ে ওঠায় সমর্থন দিয়েছেন। মূলে সেই ভোটের রাজনীতি। যত বসাও বাড়বে তত ভোট। ডাঙায় জমির অভাবে নদীর মরাখাতই সই। এখন বাংলা সেই সমর্থনের খেসারত দিচ্ছে। পইপই করে বলা সত্ত্বেও ভরা বর্ষায় বন্যার ২.‌৩ লক্ষ কিউসেক জল বার করে দেওয়ায় মতো নদীখাত নেই দক্ষিণবঙ্গে।     ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top