উদ্দালক ভট্টাচার্য: মারুন। এমন মার মারবেন, যেন সারাজীবন মনে থাকে। মারতে মারতে পায়ের তলার চামড়া তুলবেন প্রথমে, ‌তারপর পিঠের। বয়স হয়েছে তো কী?‌ মারতে মারতে একেবারে পঙ্গু করেও দিতে পারেন। কেউ কিছু বলবে না। কারণ আপনি বলেছেন, ‘‌ওরা দেশদ্রোহী’‌। আপনি বলেছেন, ওরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ছক করেছিল। যদিও কিছুই প্রমাণ হয়নি এখনও, তাতে কী?‌ প্রজাতন্ত্রে রাজার সন্দেহই যথেষ্ট।
কে সুধা ভরদ্বাজ?‌ হতে পারে তাঁর মায়ের নাম ছিল কৃষ্ণা ভরদ্বাজ। হতে পারে পরাধীন ভারতে উল্লেখযোগ্য অর্থনীতিবিদদের তালিকায় তাঁর স্থান ছিল ওপরের দিকে। হতে পারে তিনি ইংল্যান্ডে পড়াতে গিয়েছিলেন, চাইলেই পারতেন বাকি জীবনটা সেখানেই পড়িয়ে কাটিয়ে দিতে। দেননি, ফিরে এসেছিলেন দেশে। শিক্ষকতা করেছিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। এ সব হতেই পারে, কিন্তু তাতে কার কী?‌ আসল কথা হল, সুধা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন ছত্তিশগড়ে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে। আর আদিবাসী, ছত্তিশগড়, জঙ্গল, এই কথাগুলো শুনলেই তো মাওবাদী–মাওবাদী গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু আদিবাসী উন্নয়নের ‘‌কুকথা’‌ বিশ্বাস করার ইচ্ছে রাষ্ট্রের নেই। একটাই দৃঢ় বিশ্বাস তাদের, বোমা, গুলি, বন্দুক হাতে প্রধানমন্ত্রীকে মারতে মাঠে সেপাই পাঠিয়েছিলেন এই মধ্যবয়স্কা মহিলা। সেই জন্যই গ্রেপ্তার। দেশের নির্বাচিত সরকারের কি ভুল হতে পারে? তাই সন্দেহই যথেষ্ট  গ্রেপ্তারির জন্য।
একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাসখানেক আগে সুধা চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, যদি কেউ সরাসরি মাওবাদীদের সঙ্গে বা ভীমা কোরেগাঁও বিস্ফোরণের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র প্রমাণ করতে পারে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধরা দেবেন। এই অভিযোগের পরে মানহানির মামলাও করেছিলেন তিনি। তাতেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় ‘‌সক্রিয়’ পুলিসকে টলানো যায়নি। মেয়ে–সহ গ্রেপ্তার হয়ে গেছেন সুধা ভরদ্বাজ। মামলা হয়েছে একাধিক ধারায়। কিন্তু গণতন্ত্রের কী অপার লীলা, সেই একই পুলিস এখনও খুঁজে বের করতে পারেনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিব হমেদকে। উন্নাও ধর্ষণ কাণ্ডের সাক্ষীর হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে, ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁকে কবর দেওয়াও হয়ে গিয়েছে। এই পুলিসই ওদিকটা দেখতে পায়নি। কে জানে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে তারা ভয়ানক ব্যস্ত ছিল মনে হয়।
ভারভারা রাওয়ের নামে একটি চিঠি পেয়েছে পুলিস। জানিয়েছে, ভীমা কোরেগাঁও বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে আগে গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনদের থেকে সেই চিঠি উদ্ধার হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে মারার জন্য এম ৫৪ রাইফেল ও ৪ রাউন্ড কার্তুজ কেনার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দরকার ৮ কোটি টাকা। সেখানেই কোথাও একটা লেখা ছিল ভারভারা রাওয়ের নাম। তাই কবিয়ালও গ্রেপ্তার। তা হলে, এই নিয়ে দুই হল, সমাজকর্মী, কবিয়াল, এরপর আসবেন আরেক সমাজকর্মী ও সাংবাদিক। তাঁর নাম গৌতম নওলাখা। কংগ্রেস আমলে তখন সদ্য গ্রিন হান্ট অপারেশন শুরু হয়েছে। কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে কথা বলতে এসেছিলেন লেখিকা অরুন্ধতী রায় আর গৌতম নওলাখা, ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির সম্পাদকীয় দপ্তরের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী। আজীবন তিনি মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেদিনও বক্সাইট খনির প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের কাছে দেবতার সমান পাহাড়গুলোকে তৎকালীন সরকার বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভেবেছিল বেসরকারি সংস্থাকে, সে কথা বলেছিলেন তিনি। দৃঢ় কণ্ঠে। তাই তাঁরও গলাটা চেপে ধরা দরকার। এমনিতেই দেশে অনেক লোক অনেক কথা বলে চলেছে, এঁরাও যদি রোহিত ভেমুলার মৃত্যু নিয়ে, বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি নিয়ে কিংবা কাশ্মীর নিয়ে দুটো কথা বাড়িয়ে ফেলেন, তা হলে তো মুশকিল। তাই, অ্যারেস্ট।
ও হ্যাঁ, একটা কথা তো বলাই হল না, কর্ণাটকের এক বাসিন্দা ছিলেন, তিনি পেশায় সাংবাদিক, তাঁর নাম গৌরী লঙ্কেশ। তাঁকে আর গ্রেপ্তারের সুযোগ দেয়নি গুন্ডারা, এক চান্সে খাল্লাস করে দিয়েছিল। তাঁর খুনিদের ধরার সময়েও কিন্তু এত তৎপরতা দেখাতে পারেনি পুলিস। কারণ, ওই একটাই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় তারা ব্যস্ত ছিল হয়তো। শুধু কি তাই, পুলিস তো সেদিনও খুব ব্যস্ত ছিল, যেদিন পার্লামেন্টের ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে জেএনইউর ছাত্র উমর খালিদকে গুলি করে মারতে গিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। পুলিস সেদিনও খুব ব্যস্ত ছিল, যখন নরেন্দ্র দাভোলকরকে গুলি করে মেরে দেওয়া হয়েছিল। এদের কারওর জীবনের দাম কি আর প্রধানমন্ত্রীর জীবনের মতো? গৌরী লঙ্কেশ একাধিকবার পুলিসে বলেছিলেন, তাঁর জীবন নিরাপদ নয়!‌ কী করা যাবে?‌ তখনও যে ব্যস্ত ছিল পুলিস। তাই বেঙ্গালুরুতে গুলি খেতে হয়েছিল গৌরী লঙ্কেশকে। হল, তো হল!‌ ‘‌পাবলিক’‌–এর কী হল, তাতে কার কী এসে যায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মারার ছক?‌ ভাবলেই তো ফাঁসি দেওয়া উচিত।
ভারতের সমাজ অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থার যা দৌড়, তাতে মানবাধিকার ব্যপারটা কী, সেটাই দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ বোঝেন না। দেশকে রক্ষা করা, ভোট দেওয়া, বারবার এ সব একই কথা বলে দেশের মানুষকে কর্তব্য মনে করিয়ে দেন নেতারা। কিন্তু অধিকার কী, তা বোঝানোর কোনও দায় নেই। আর যাঁরা তা বোঝাতে যান, তাঁরা হয় দেশদ্রোহী, নয় মাওবাদী। এটা সরকার নির্বিশেষে একটা মান্য পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সেটা মেনেই আমাদের চলতে হবে। চুপ করে বসে থাকাও যেতে পারে। আঙুল চোষা যেতে পারে, মাঝে মাঝে বন্দেমাতরম্‌ গাওয়া যেতে পারে, সব সময় জয় হিন্দ বলা যেতে পারে, সিনেমা দেখা যেতে পারে, আর বাঁচতে হলে ভারত মাতা কী জয় বলাও যেতে পারে। কিন্তু ও সব মানবাধিকার–ফাধিকার করা যাবে না। ও সব সংখ্যালঘু–টঘুও বাদ দিতে হবে। পড়ে থাকবে গেরুয়া ঝান্ডা, না নিলে পিঠে ডান্ডা, কপালে বুলেট।
এ কথা ঠিক, ভারত কেন, পৃথিবীর কোনও দেশই হয়তো আদর্শ মানবাধিকাররক্ষার নিয়মগুলো পালন করতে পারে না। তাই ভারতেও সেসব নিয়ে বেশি চেঁচামেচি পছন্দ করছে না মোদি সরকার। তার থেকে মুম্বইয়ে শিবাজির মূর্তি হচ্ছে তা নিয়ে উৎসব অনেক বেশি আনন্দের, গর্বের। সরকার চায়, মানুষ সেসব নিয়েই ছাপান্ন ইঞ্চি ছাতি বাজিয়ে মেতে থাকুক। গরুর মাংস গোটা দেশে নিষিদ্ধ হয়ে যাক, মন্দির–মসজিদ নিয়ে মাঝে মাঝে আরও ঝামেলা বাধুক। ব্যস, ঝান্ডা পতপত করে উড়বে দিল্লির হাইটেক দলীয় দপ্তরে। তবে মাঝে মাঝে ভয়ও করে। কি? করে না?‌ ভয় করে, কারণ মাঝে মাঝে খেপে ওঠে মানুষ। একটা লক্ষ কৃষকের মিছিল চলে আসে মারাঠা গেরুয়া রাজ ভেদ করে। চায় বিচার। ভয় করে, কারণ, হায়দরাবাদে বসে থাকেন মৃত রোহিত ভেমুলার মা। তাঁর শরীরে ঠান্ডা রক্ত নিয়ে। হাতে পোস্টার, ‘‌জাস্টিস ফর রোহিত ভেমুলা’‌। ভয় করে, কারণ হাজার চেষ্টা করেও পশ্চিমবঙ্গে রাম–রহিমের মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দেওয়া যায় না। ভয় করে, কারণ নির্বাচন আভাস দিচ্ছে, কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। ভয় করে, ২০১৯ সালের নির্বাচনে যদি.‌.‌.‌‌ তারপর?‌ তারপর কী হবে?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top