দেবেশ রায়- বাংলা সাহিত্যে চিরকালের এক শ্রেষ্ঠ গল্পকার দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌শোকমিছিল’‌ গল্পটা মনে পড়ছে। এক পুরনো কমিউনিস্ট পরিবার। পুরনো কংগ্রেসি পরিবার বলতে এককালে যেমন বোঝাত—‌ সেই বোঝার সঙ্গে কিছু বিশেষ ধরনের আচরণেরও স্বীকৃতি ছিল। বাড়ির সবাই খদ্দর পরতেন। কেউ–কেউ চরকা কাটতেন। সাধারণ চাকরি করতেন। অনেক সময় কেউ–কেউ গরিব ছেলেমেয়েদের পাঠশালা বসাতেন নিজের বাড়িতেই। এটা আমাদের বাঙালি সমাজের অংশ হয়ে আছে।
তেমনি কমিউনিস্ট‌ পরিবারও বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। বাড়ির মা–‌বাবা পার্টি করতে–করতেই বিয়ে করেছেন। বিয়ে করার আগে পার্টির অনুমতি নিয়েছেন। নিতে হত। বিয়ে করলে পার্টির কাজ করার সুবিধে হবে। কমিউনিস্টরা আর শান্তিনিকেতনিকরাই পাজামাকে বাঙালি সমাজের পোশাক হিসেবে চালু করেন। মা ও বাবা দুজনই, বা কখনও একজন মাঝেমধ্যেই জেলে যেতেন। ‘‌উভয়ের শিশুপুত্র কোথা/‌মাতাপিতা সঙ্গহীন বাড়ে।’‌ কোনও ‌ কোনও বড় বাড়ির ছেলে পার্টির হোলটাইমার হয়ে যেতেন। পার্টি অফিসে বা কমিউনে থাকতেন। তার শেষ প্রতিনিধি বোধহয় আজ বিমান বসু, সিপিআই(এম)‌‌–‌এর।
দীপেনের গল্পটিতে এমনই একটি কমিউনিস্ট পরিবারের ভবিতব্য চিরকালের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ গল্পের আয়তনে অক্ষয় হয়ে আছে। বাবা–‌মা আদি কমিউনিস্ট পার্টিতে। দুই ছেলের একজন পার্টি থেকে বেরিয়ে সি‌পি‌আই(‌‌এম)‌‌–‌এ গেছে। ছোট ভাই আরও কিছুদিন পর নকশাল হয়ে গেল। বাড়ির চারটি প্রাণীর প্রত্যেকে প্রত্যেকের শত্রু হয়ে গেল। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতে কেউ কারও ব্যক্তিগত শত্রু হয় না। হয় শ্রেণীশত্রু, সুতরাং বিপ্লবের শত্রু। বিপ্লবের শত্রুর চাইতে বড় শত্রু আর কে?‌ কোনও এক শ্রেণী সংগ্রামের গুপ্ত মারণ অভিযানে দুই ভাই–‌ই মারা গেল। দুই ভাইকে নিয়ে তাদের দুই পার্টি মিছিল বের করে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছে। মা–‌বাবা— দুজনেই শ্মশানে যাবে। গল্পটির শেষ লাইনে ছিল, ‘‌শ্মশানে দেখা হবে।’‌‌
গল্পটির শেষের দিকে মায়ের মনে পড়ছে— একবার পুলিস সার্চ করতে এসে লেনিনের একটা ঝোলানো ছবি দেখে কুচ্ছিৎ মন্তব্য করেছিল। মা তার গালে চড় কষিয়েছিলেন। আজও পুলিস এসেছিল। লেনিনের সেই ছবিটা সুতো ছেঁড়া ঝুলছিল। মা ঘর পরিষ্কার করতে ছবিটা বাইরে ফেলে দিলেন।
বাংলার কমিউনিস্টদের মতো আত্মহননে পৃথিবীর আর কোনও দেশের কমিউনিস্টরা প্রাণ দেননি। কোনও কারণ ছিল না, কোনও কারণ ছিল না। শুধু এক টুকরো দেয়ালে মাও–‌এর একটা টিনকাটা ছবি জাপানি কালিতে ফুটিয়ে তুলতে চারতলার কার্নিশ থেকে সোজা মাটিতে পড়ে গেছে পুলিসের গুলিতে এইটুকু না–‌জেনে যে মাও সে তুঙ ভারতের বিপ্লবের নেতা হতে পারেন না। কিন্তু আজও তো তেমন একটা ভুল বিশ্বাসের নেতা হতে পারেন না। কিন্তু আজও তো তেমন একটা ভুল বিশ্বাসের বশেই ছত্তিশগড়ের সীমান্তের ১২ জন মাওবাদীকে কাউন্টার–‌ইনসারজেনসির ছুতো তুলে এমন এক পুলিসি হত্যাকারী আইনসিদ্ধ গ্রুপের হাতে মরে পড়ে থাকতে হল। সিপিআই(‌এম)‌–‌এর রাজ্য সম্মিলন থেকে এমন কথা তোলা কি প্রত্যাশিত ছিল না যে, কাউন্টার–‌ইনসারজেন্সির এই তত্ত্ব পুলিসকে কোনও অঘোষিত যুদ্ধের অধিকার দিতে পারে না। সিপিআই(‌এম)‌–‌এর মনে পড়ল না, গুজরাটের শোহরাবুদ্দিনের কাউন্টার–‌ইমার্জেন্সির মামলা বিজেপি–‌র সভাপতি অমিত শাহের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চলছে— ও সেই এজলাস তৈরি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারকের বিরুদ্ধে তাঁর সহকর্মী চার প্রবীণ বিচারক আপত্তি জানিয়েছেন। বিপদটা এখানেই। কাগজে যেটুকু পড়েছি, তাতে মনে হল, যেসব বিষয় নিয়ে সম্মিলনে আলোচনা হল, পাঁচ বছর আগেও সেই সব বিষয় নিয়ে এই রকমই কথা হত। এক বাঁধা–‌ধরা, তথ্যহীন কথা।
কৃষিপণ্যের দাম নিয়ে মধ্যভারত–‌মহারাষ্ট্র–‌রাজস্থান তোলপাড় হয়ে গেল অথচ পশ্চিমবাংলায় কেন হল না— এটা তো এই সম্মিলনের প্রধান আলোচ্য হওয়া উচিত ছিল। কারণটা খুব সোজা— অপারেশন বর্গার ফলে আড়তদারি পশ্চিমবাংলা থেকে উঠে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কৃষিপণ্যের উচ্চতর দাম দেয়ায় বর্গাদাররা সোজা সরকারের কাছে বেচেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যদি এটা করে থাকে, তা হলেই বা তা হলেও কি এটা কৃষকবিরোধী ব্যবস্থা?‌
প্রকাশ কারাত কী ধরনের নেতা বা তাত্ত্বিক আমি জানি না। কিন্তু সিপিআই(‌এম)‌–‌‌র রাজ্য সম্মিলনে তিনি একথা বললেন কী করে যে, আরএসএস যেমন একেবারে ভিতে গিয়ে কাজ করে, পার্টি কমরেডদের তেমন করতে হবে। আর এর সঙ্গেই উনি যোগ করলেন— ভোট নিয়ে বড় বেশি অকারণ দুশ্চিন্তা করা হয়। ভোটে কী হবে, তা ভোটের সময় বোঝা যাবে।
মানে?‌ করছেন তো পার্লামেন্টারি রাজনীতি। হঠাৎ করে পার্টিকর্মীদের আদর্শ হিসেবে আরএসএসে‌র কথা মনে পড়ল কেন। উনি হয়তো উপমা হিসেবেই বলেছেন। কিন্তু উপমা দেওয়াও তো শিখতে হয়। আরএসএসের গুন্ডারা লেনিন থেকে পেরিয়ার থেকে আম্বেদকরের মূর্তি ভাঙছে আর তখনই তাঁর মনে পড়ল— আরএসএসের কর্মীদের জনভিত্তির কথা?‌  ‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top