তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: ‌সপ্তদশ লোকসভার সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে বেছে নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে ৬ রাউন্ড ভোট নেওয়া হয়ে গিয়েছে। বাকি আর এক রাউন্ড‌, যা অনুষ্ঠিত হবে আগামী রবিবার, ১৯ মে। কিন্তু এর মধ্যে ইলেকশন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীরা শুধু অভিযোগই করেনি, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তারা আর্জি পেশ করেছে। কিন্তু আজ থেকে ৬৭/‌৬৮ বছর আগে স্বাধীন ভারতে যেবার প্রথম ভোট নেওয়া হয়, তাতে ত্রুটি–‌বিচ্যুতির অভাব না থাকলেও, তদানীন্তন নির্বাচন কমিশনার (‌তখন একজনই কমিশনার ছিলেন),‌ সুকু বা সুকুমার সেনের নিরপেক্ষতা ও সততা নিয়ে শাসক বা বিরোধী কোনও পক্ষই কোনও অভিযোগ তুলতে পারেননি। যেমন পারেননি কেউ জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ভিত্তি নিয়ে কোনও অভিযোগ তুলতে। ওই আইনের বলেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই আইনের মূল খসড়া তৈরি করেছিলেন প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনের মতোই আর এক বঙ্গসন্তান। মৃগাঙ্কমৌলি বোস। এই সেন ও বোস দুজনেই ছিলেন আইসিএস অফিসার। সুকুমার সেন নির্বাচন কমিশনার, আগে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব। মৃগাঙ্কমৌলি বা এম এম বোসও পরে রাজ্যের মুখ্য সচিব হয়েই রিটায়ার করেন।
শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর ক্যাবিনেটের আইনমন্ত্রী, বিখ্যাত ব্যারিস্টার অশোক সেনের বড়দা ছিলেন সুকুমার সেন। ডা.‌ বিধানচন্দ্র রায়ের স্নেহধন্য অফিসার। অথচ পণ্ডিত নেহরু যখন ডা.‌ রায়কে চিঠি লিখে জানালেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন রাষ্ট্রপতি ড.‌ রাজেন্দ্র প্রসাদের সই পেয়ে গেছে, তখন আর দেরি নয়। ভোটটা সেরে ফেলা যাক। তার জন্য নেহরু চান একজন উপযুক্ত মর্যাদাসম্পন্ন, সৎ ও নিরপেক্ষ অফিসার যিনি হবেন দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। আর সেই সুবাদে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঠিক কী হওয়া উচিত তাও তাঁর কাজই বলে দেবে।
১৯৫১ সালের মাঝামাঝি ওই চিঠি পেয়ে সুকুমার সেনকে নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠান ডা.‌ রায় এবং বলেন, আর পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের জন্য তাঁকে কাজ করতে হবে। চেইন স্মোকার সুকুমার সেন বয়সে অনেক ছোট হলেও ডা.‌ রায়ের সামনেই সিগারেট খেতেন। ডা.‌ রায় কিছুক্ষণ লক্ষ করে বললেন, ‘‌সুকু তুমি অত্যন্ত বেশি সিগারেট খাচ্ছো, একটু কমাও।’‌ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুটে এল, ‘‌এ কথা কি ডাক্তার হিসেবে বলছেন, না মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে?‌’‌ ডা.‌ রায় হাসতে হাসতে বললেন, ‘‌ডাক্তার হিসেবে, তোমার শুভানুধ্যায়ী হিসেবেই।’‌
প্রথমবার ভোট হয় ৭৩ দিন ধরে। শুরু হয় ১০ ডিসেম্বর, ১৯৫১ এবং শেষ হয় ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ভোটার ছিল প্রায় সাড়ে সতেরো কোটি। ভোট হয়েছিল ‘‌অ্যাডাল্ট সাফ্রেজ’‌ বা ২১ বছর বয়সি নারী বা পুরুষ হলেই ভোটদানের অধিকারী। গণতন্ত্রের পীঠস্থান ইংল্যান্ডে মেয়েদের ভোটাধিকার পাওয়ার আগে ৭০ বছর ধরে আন্দোলন করতে হয়েছে। পুলিশের গুলিতে আন্দোলনরতা ইংরেজ মহিলাদের মৃত্যুও হয়েছে। অথচ ভারতের সংবিধান প্রণেতা গণপরিষদ বা কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি সব ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ সহ্য করে কলমের এক খোঁচায় বয়সের ভিত্তিই ভোটের একমাত্র উপায় বলে স্থির করেন। তাঁর আগে ১৯৪৬ সালে ওই গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল, শিক্ষা, সম্পত্তি ও আয়ের ভিত্তিতে। তখনকার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ ভোটদানের অধিকারী ছিলেন।
মৃগাঙ্কমৌলি বোসের খসড়ার ওপর নির্ভর করে আইনসভায় গৃহীত জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ভিত্তিতে সুকুমার সেন প্রায় ৩ মাস ধরে প্রথম নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। ওই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ফ্র‌্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট, যিনি পরপর ৪ বার ভোটে জিতে মার্কিনি তাত্ত্বিকদের হৃৎকম্প ধরান, তাঁর বিধবা পত্নী ইলিনর ভারত সফর করছিলেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি আগাশবাণীর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‌ভারত এক নিদারুণ পরীক্ষা দিয়েছে এবং সেই পরীক্ষায় সম্পূর্ণ সফল।’‌
সারা পৃথিবীতে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। ঠিক সেই সময় সুদানের নির্বাচন আসন্ন। সুদান সরকার পণ্ডিত নেহরুর কাছে সুকুমার সেনকে কয়েক মাসের জন্য লোন হিসেবে চাইলেন। আজও খার্টুমের একটি রাজপথ সুকুমার সেনের নামে উজ্জ্বল।
পরবর্তী পর্যায়ে আরও দুটি দেশ ভারতীয় অফিসারদের দিয়ে তাদের দেশে নির্বাচন করান। নেপালে গিয়েছিলেন আইএএস রথীন সেনগুপ্ত, যিনি পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব হন। আর কম্বোডিয়া বা কাম্পুচিয়ায় গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ডিজি পুলিশ দীপক সান্যাল।
সবচেয়ে মজার কথা সেন, বসু, সেনগুপ্ত বা সান্যাল কারও নামে কলকাতায় কোনও রাজপথের নাম রাখার কথা কেউ ভাবেননি।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top