গৌতম রায়- মহাজ্ঞানী মুসলিম পণ্ডিত আলবেরুনি তাঁর ‘ভারত তত্ত্ব’ গ্রন্থে (ভাষান্তর আবু মহম্মদ হাবিবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) লিখেছেন, ভারতে আসার পথে গজনির মামুদের প্রাসাদের সামনে সোমনাথ টেম্পলের দারুমূর্তিগুলি অবহেলা ভরে পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। তার জন্য তিনি আল্লার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। তাঁর বয়ানে–এ–ইতিহাস–‌এ লিখছেন ‘ধর্মে উদার কাশ্মীরি পণ্ডিত’দের সান্নিধ্যে। আবার, মোঘল সেনাপতি ও ঐতিহাসিক মির্জা নাথান তাঁর বাহরিস্তান গায়বি গ্রন্থে (অনুবাদ খালেদ দাদ চৌধুরি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা) মোঘল সুবাদারকে যশোরের একটি সুন্দর হিন্দু মন্দির আসা–‌যাওয়ার পথে চোখের পক্ষে পীড়াদায়ক বলে ধ্বংস করে দেওয়ায় আক্ষেপ করছেন। আওরঙ্গজেব যে কাশীর মন্দির ধ্বংস করেন সে তো সবার জানা। আবার, কলকাতার একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু মহিলা বই লিখেছেন, তিনি যখন উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথ টেম্পলের অর্থদানকারী সেবায়েতের বিশেষ অধিকারে বিগ্রহের একেবারে সমুখে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত হলেন, বেদির নীচে স্বর্ণাক্ষরে লেখা দেখতে পেলেন—‘ওম, মণিপদ্মে হুম’! অর্থাৎ ‘বৌদ্ধরা ঈশ্বরে অবিশ্বাসী’ অজুহাতে বৌদ্ধ মন্দিরটি শঙ্করাচার্যের জবরদখল। এ হল মধ্যযুগের দস্তুর। অস্ত্রের জোরে দখল করা বিজিতদের ধর্মকে নিকৃষ্ট, হেয় প্রতিপন্ন করে জবরদস্তি শাসনের বৈধতা লাভ।
আর এই যদি ইতিহাস হয়, তবে আমরা যে ছোটবেলা থেকে নীতি কথার ওই গল্পে জেনে এলাম, ইতিহাসের বিচার চায় একমাত্র ধূর্ত ভিটরে শেয়াল, তার কী হবে? 
নেকড়েরূপী এক ধূর্ত শেয়াল ছাগল ছানাকে নদীর অপর পাড়ে দেখে বেশ চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলে—‘আমার নদীর জল ঘোলা করলি কেন রে?’ 
— মহাশয়, আমি তো তীরেই এখনও যাইনি, দেখুন।
— তবে ব্যাটা তোর দাদু জল ঘোলা করেছিল, সে অপরাধে এখন তোকে শাস্তি পেতে হবে।
— দাদু ! তিনি তো কবে মরে ইতিহাস। তাঁর অপরাধে.‌.‌.‌!
আজ, বাবরের রাম মন্দির ভাঙার বিচার ও শাস্তি তো তেমনই। বঙ্কিমচন্দ্র তখন চুঁচুড়ায় গঙ্গার পাড়ে জোড়াঘাটে থাকতেন। বন্দেমাতরম এখানেই লেখা। একদিন তাঁর বন্ধু কবি অক্ষয় সরকার, যঁার মাকে জোর করে এই জোড়াঘাটেই সতী হতে চিতায় তোলা হয়েছিল, নয়নের জলে ভেসে তঁাকে সে বীভৎসতার কথা শোনান—
ভীমাকারে জ্বলিল অনল।
হরিবোল দেয় লোকে,
আমি ভয়ে কিম্বা শোকে ,
ফেলিলাম নয়নের জল।
এখন যদি ৫০০ বছর আগের রাম মন্দির ভাঙার বিচার হয়, বাবর, ঔরঙ্গজেব, মির বাঁকিদের উত্তরপুরুষদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর, মুসলমানমাত্রেই বাবরের বংশধর ধরে নিয়ে যে তার বিচার করবে, তার কী বিচার হবে পাঠক তা ঠিক করুন। কিন্তু সতীদাহপন্থীদের উত্তর পুরুষকে পাওয়া যাবে। হুগলি জুড়ে গঙ্গার ঘাটে গর্বের সঙ্গে সতীদাহের
পারিবারিক শিলালিপি সেঁটে দেওয়া আছে। সেখান থেকে খুঁজে নিয়ে আমাদের মাতামহীদের যারা সতী করে পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের উত্তরপুরুষদের বিচারও শুরু হোক। কিন্তু, সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করতে বসলে, কবে কে মন্দির ভেঙেছিল, কে বৌদ্ধ মন্দির দখল করেছিল, কে সতীদাহ করেছিল— তার আজ বিচার করতে বসা হাস্যকর ও অন্যায়। কারণ, ইতিহাসের বিচার চলে না। কেন চলে না? বিচার তো সম্পন্ন হয়ে গেছে। শাস্তিপ্রাপ্তদের আবার শাস্তি দেওয়া যায় না। যে উদ্ধত শাসক অন্যায় করেছিল সে বুদ্ধের, শ্রীচৈতন্যের, কবীরের, গান্ধীর ভারতের কাছে নতজানু হয়েছে। 
এই অযোধ্যাতেই রাম চবুতরায় এক মন্দিরকে ঘিরে উত্তেজনা, প্রাণহানি ঘটে। ব্রিটিশরা যাকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে প্রমোদ খোরপোশ দিয়ে বন্দি করে রাখে সেই ওয়াজিদ আলি শাহের আমল। সে–‌মন্দিরের কাছেই একটি মসজিদ আছে। রোজ দিন একদল মৌলবাদী মুসলমান নমাজ পড়তে এসে না–পাক (অপবিত্র) সে মন্দিরের দিকে নজর যায় বলে ভাঙতে আসত। সশস্ত্র হামলা চালাত। তাতে বেশ কয়েকজন সেবায়েত মারা যান। তখন নবাব নিজে সসৈন্যে এসে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের হঠান। মুসলমান সেনা হিন্দু মন্দির রক্ষায় ঘিরে রাখে। এই বিলাসী, নৃত্যগীতের সুরসিক নবাবের সম্প্রতির ভাবনা আতরের মতোই সুরভিত। এঁর নবাবি গেলে এঁরই প্রজা, সিপাহি অযোধ্যা বলিয়ার ব্রাহ্মণ মঙ্গল পান্ডে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই মোঘল নবাব বাবরেরই উত্তর পুরুষ। তিনি, তাঁরা কিন্তু মন্দির ভাঙেননি, রক্ষা করেছেন, গড়ে দিয়েছেন, বছরভর ব্রাহ্মণদের পারিতোষিক দিয়েছেন। এটিই পূর্বপুরুষের পাপস্খালন। ইতিহাসের শেষ বিচারে এ ধরনের নবাব বাদশার কোনও অভাব ভারতে ছিল না। হিন্দু মুসলিম সিপাহিরা যেদিন দিল্লিতে প্রবেশ করেন শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শা জাফর সেই বকরি ইদে গরু কোরবানি নিষিদ্ধ করেন। যে কট্টর হিন্দুত্ববাদী শঙ্করাচার্য বৌদ্ধ মন্দির দখল করেন, তাঁর উত্তর পুরুষ হিন্দু ভারতীয়েরা তিব্বতের দখলদার চীনাদের তাড়িয়ে পালিয়ে আসা বৌদ্ধগুরু দলাই লামাকে সমাদরে ভারতে স্থান দেন। কারণ, ভারতে সবার স্থান হয়। কলকাতার বৌদ্ধ মন্দির মহাবোধি সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় সময় সিংহল থেকে বুদ্ধের অস্থি কলসটি মাথায় করে নিয়ে আসেন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। 
রাজস্থানের শেষ সতী রূপ কানোয়ারকে যারা জীবন্ত দগ্ধ করেছিল এখন জেলে পচছে। এ সবই হল ইতিহাসের বিচার সম্পন্ন হওয়া। কারণ, শেষ বিচারে ইতিহাস একটা প্যান্ডোরা বাক্স মাত্র নয়, যা খুললেই বিষধর গোখরো সাপ বেরিয়ে আসে। আর এক বাক্সও আছে। সেটি পদিপিসীর বর্মি বাক্স। খুললেই ভালবাসার হরেক চিজ বেরিয়ে আসে। দুই বাক্সে সম্পূর্ণ ইতিহাস। সম্পূর্ণ ইতিহাস সেকুলারই হয়। সেটিই প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে বহু চেষ্টা করেও বোঝাতে পারেননি ভারতীয় ইতিহাসের ডয়েন রমেশচন্দ্র মজুমদার। তারপর নেহরু যাঁদের ইতিহাস লিখতে দেন তাঁরা সুপণ্ডিত হলেও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যবাদী। দুটি উদ্দেশ্যই মিলে গেছে জাতপাতের বিভেদের অজুহাতে অন্য ধর্মের সঙ্গে ভুল তুলনা করে। হিন্দু ধর্মকে অপমান করার কাজে সরকারি ইতিহাস ব্যবহার করায়‌।

জামা মসজিদে। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top