‌উৎপল চ্যাটার্জি: ‘‌উনি একজন শহুরে মিশ্র সংস্কৃতির লেখক। এই বহুসাংস্কৃতিক প্রবণতা ওঁর মধ্যে বেশ বেশি। ওঁর নিজের ধারণা হল, ওঁর নিজস্ব কোনও শিকড় না থাকার থেকেই এর উৎপত্তি। ত্রিনিদাদের সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক দেউলিয়াপনা ওঁকে অখুশি করে। ভারতের থেকে উনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। আবার ইংল্যান্ডের সঙ্গেও কোনও মানসিক সংযোগ অনুভব করেন না। একদা ঔপনিবেশিক শক্তির ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে পারেন না।’‌ ভি এস নইপল সম্পর্কে ২০০১ সালে মন্তব্য করেছিল নোবেল পুরস্কার কমিটি।
বিদ্যাধর সূরজপ্রসাদ নইপল। পোর্ট অফ স্পেনের কাছে ত্রিনিদাদ–টোবাগোতে ১৯৩২ সালে জন্ম। বাবা–মা ছিলেন ভারতীয় হিন্দু, ত্রিনিদাদের অভিবাসী। ১৮ বছর বয়সে নইপল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন। তার পর সেদেশেই থেকে গেলেন। ৮৫ বছর বয়সে লন্ডনের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার মুহূর্তটি পর্যন্ত। 
কীভাবে নইপলের সঙ্গে আমার ‘‌বন্ধুত্ব’‌ হল?‌ সেটা নইপলের সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মাসকয়েক আগের কথা। আমরা দুজনেই সেবছর তাইল্যান্ডের ‘‌রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড’‌–এর জন্য মনোনীত হয়েছি। তাইল্যান্ডের যুবরাজ, যিনি এখন সেদেশের রাজা, নইপলকে এবং আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ব্যাঙ্ককে, তাই রাজপ্রাসাদে তঁার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। স্বাভাবিকভাবেই আমি তঁাকে দেখেই চিনেছি। সরাসরি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মিস্টার নইপল? প্রথমে একটু চমকে গেলেও‌ উনি একগাল হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। 
শুনেছিলাম নইপল খুব মেজাজি লোক। সবার সঙ্গে তঁার ঠিক জমে না। কিন্তু সেবার যতদিন ব্যাঙ্ককে থেকেছিলাম, দু’‌জনের সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় ছিল। খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগে তখনই বুঝেছি, মানুষটার পছন্দ–অপছন্দ, দুইই খুব জোরাল। ওই যে প্রথম দেখাতে আমাকে পছন্দ করেছিলেন, সেই মনোভাব বদলায়নি। প্রায়ই আমরা লম্বা আড্ডা দিতাম। নানা বিষয়ে। এরকমই এক আড্ডায় মনে আছে, খুব রাগ দেখালেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। কেন অক্সফোর্ড পুরনো ইংরেজি বাতিল করে আধুনিক ইংরেজি এবং সাহিত্যকে তাদের পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করছে!‌ ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‌তার থেকে হিউম্যানিটিজ ব্যাপারটাকেই বরং বাদ দিক ওরা!‌’‌ 
অবশ্য একটু পরেই রাগ পড়ে গেল। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে রসিকতা করতে শুরু করলেন আবার। ‘‌স্যর বিদিয়া’‌ অবশ্যই একজন চিন্তাবিদ ছিলেন, তবে তিনি ছিলেন চিন্তাবিদদের চিন্তাবিদ। সেই উচ্চতর বৌদ্ধিক অবস্থানের কারণে তঁার সামাজিক মেলামেশা ছিল সীমাবদ্ধ। তার ওপর তিনি কারও মন রেখে কথা বলতেন না। যা মনে আসত, তাইই মুখে বলতেন। সেটা শুনে কে কী মনে করল, তার পরোয়া করতেন না। 
আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, আমার সঙ্গে ওঁর বয়সের বিরাট ব্যবধান সত্ত্বেও নেহাতই ঘটনাচক্রে, অথবা দুর্ঘটনাচক্রে আমরা বন্ধু হয়েছিলাম। নইপলের অনেক কথাই মনে আছে। কিন্তু একটা কথা প্রায় রোজই মনে পড়ে। বলেছিলেন, ‘‌যেদিন থেকে লিখতে শুরু করেছি, আমিই আমার প্রভু হয়েছি। অসম্ভব এক শক্তি তৈরি হয়েছে আমার মধ্যে, যে শক্তি এখনও আমার সঙ্গে আছে।’‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top