তরুণ চক্রবর্তী- কিছুদিন আগেও ৭ ছিল। এখন ৮। সিকিম নিয়ে। ৩৭০ পরবর্তীতে উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের এই ৮ রাজ্যে দেখা দিয়েছে ফের অশান্তির কালো মেঘ। বিচ্ছিন্নতাবাদের বিচরণভূমি এই অঞ্চল এমনিতেই সবসময়ে বারুদের স্তূপের ওপরেই থাকে। অশান্তি এখন একটু কমের দিকে। তবে বাড়তে বেশি সময় লাগবে না। কারণ এই অঞ্চলের সহজ–‌সরল মানুষ রাগলে ভয়ঙ্কর। স্বাধীনতার পর থেকেই চলছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এখন একটু কম। তবু থামেনি। সিকিম বাদে সব রাজ্যই রক্তস্নাত সন্ত্রাসে। এখন কিছুটা ভাটা চলছে, বড়জোর এটুকুই স্বস্তি। সীমান্তের ওপারও কাশ্মীর প্রশ্নে খুব একটা খুশি নয়। তাই চীন, বাংলাদেশ, মায়ানমার বা ভুটান ও নেপালের মাটি থেকে সরকারিভাবে না হোক, অন্যভাবেও মদত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বিচ্ছিন্নতাবাদের আঁতুড়ঘর উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাজ্য অসমে ‘স্বাধীন অসম’–‌এর দাবি নতুন কিছু নয়। এখনও পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বে সশস্ত্র লড়াই চালাচ্ছে আলফা। সেই সংগ্রামে তরুণ প্রজন্মের উৎসাহে ভাটা নেই। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) বা নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বিতর্কের সময় দেখা গিয়েছে কলেজ পড়ুয়ারাও বাড়ি থেকে পালিয়ে বেছে নিচ্ছে জঙ্গলের জীবন। মেয়েরাও রয়েছে সেই দলে। কংগ্রেস আমলে শুরু হওয়া আলফা–‌র আলোচনাপন্থীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এখনও কোনও সমাধান সূত্রে পৌঁছতে পারেনি। এই নিয়ে অরবিন্দ রাজখোয়া, অনুপ চেটিয়া, শশধর চৌধুরিরা রীতিমতো বিরক্ত। তাঁদের সঙ্গে পরেশ বড়ুয়ার এখনও যোগাযোগ রয়েছে। আলোচনাপন্থী আলফার ক্যাডাররাও কিন্তু অস্ত্র ছাড়েননি। জমা দিয়েছেন মাত্র। আলফার প্রতি সাধারণ অসমিয়াদের জনসমর্থনেরও অভাব নেই। অসমিয়া জাত্যভিমান মারাত্মক। 
শুধু আলফা নয়, অসমে বোড়ো জঙ্গিদের একটা অংশ এখনও জঙ্গলে রয়ে গিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের জন্ম তাদের নতুন করে পৃথক বোড়োল্যান্ড–‌এর দাবিকে সামনে নিয়ে আসতে সাহায্য করছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বোড়ো সংগঠন পৃথক বোড়োল্যান্ডের দাবিতে শুরু করে দিয়েছে আন্দোলন। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অসম–‌সহ গোটা উত্তর–‌ পূর্বাঞ্চলের রেল ও সড়ক যোগাযোগ অনেকটাই বোড়ো অধ্যুষিত এলাকার ওপর নির্ভরশীল। এর আগে বহুবার শুধু রক্তই ঝরেনি বোড়ো এলাকায়, অশান্তির কারণে গোটা উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলকেই বাড়তি মূল্য দিতে হয়েছে পণ্য পরিবহণের জন্য। বোড়োরা অসমিয়াদের সঙ্গে থাকতে চায় না। সশস্ত্র ও গণতান্ত্রিক উভয় আন্দোলনই বাড়তি অক্সিজেন পেল কাশ্মীর সিদ্ধান্তে।
কার্বি আংলং। বর্তমানে সেখানে রয়েছে স্বশাসিত পরিষদ। অনেকটা গোর্খা টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের মতো। সেখানেও পৃথক রাজ্যের দাবি বহুদিনের। মার ও ডিমাসা জঙ্গিরা গণহত্যায় সিদ্ধহস্ত। বহুবার রক্তাক্ত হয়েছে এই পাহাড়ি জনপদ। তারাও নতুন রাজ্যের দাবিতে ফের সরব। অসমিয়াদের সঙ্গে তাদের বিরোধ বহুদিনের। 
তবে বিরোধ থাকলেও বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় পৃথক রাজ্যের দাবি দানা বাঁধছে না। কারণ এখানকার বাঙালি এমনিতেই বহু ভাগে বিভক্ত। নিজেদের মাতৃভাষার জন্য ১১ জন শহিদ হলেও বরাক চিরকাল ব্যস্ত থেকেছে নিজেদের মধ্যে নানা মুনির নানা মত নিয়ে। অসমিয়াদের থেকে সব বিষয়ে আলাদা বরাক। ভাষা, সংস্কৃতি কোনও কিছুতেই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সঙ্গে মিল নেই এই বাঙালি ভূখণ্ডের। অনেকটা অসমের উপনিবেশের মতো অবস্থা! মাঝে মধ্যে টিম টিম করে ওঠে পৃথক রাজ্যের দাবি। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি দায়বদ্ধতা আর নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ বরাকে কখনওই পৃথক রাজ্যের দাবিকে দানা বাঁধতে দেয়নি। এমনকী, এনআরসি বাঙালি জাতিকেই ধ্বংস করতে চাইলেও রাজনৈতিক প্রভুত্ববাদীদের হাত থেকে বেরিয়ে এসে বড় ধরনের আন্দোলনে ব্যর্থ বরাক।
বরাকে না থাকলেও অসমের পাশের রাজ্য ত্রিপুরা কিন্তু বহুকাল ধরে সন্ত্রাসবাদে জর্জরিত। স্বাধীন ত্রিপুরার দাবিতে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন বাঙালি নিধন চালিয়েছে বহুদিন। বারবার রক্তাক্ত হয়েছে ত্রিপুরা। সন্ত্রাসবাদ এখনও নির্মূল হয়নি। ত্রিপুরায় বাঙালিদের সঙ্গে উপজাতিদের সঙ্ঘাত দীর্ঘদিনের। সেই সঙ্ঘাতের হাত ধরে এখন দাবি উঠেছে পৃথক তুইপ্রাল্যান্ডের। রাজ্যে বিজেপি–‌র জোট শরিক ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ তুইপ্রা (আইপিএফটি)–‌র উত্থানই হচ্ছে রাজ্যভাগের দাবিকে সামনে রেখে। বিজেপি–‌র সঙ্গে জোট বজায় রেখেই তারা ফের তুইপ্রাল্যান্ডের দাবিতে সোচ্চার। আইপিএফটি–‌র সাধারণ সম্পাদক তথা ত্রিপুরার উপজাতি কল্যাণ মন্ত্রী মেবারকুমার জমাতিয়া তো নতুন দুটি কেন্দ্রশাসিত রাজ্য গঠিত হতেই বলে দিলেন, ‘আমরা উৎসাহিত’। আর তাঁদের এই উৎসাহে মিশ্র জনবসতির ত্রিপুরায় আতঙ্কিত বাঙালিরা। এখন থেকেই ফের সন্ত্রাসের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন।
মেঘালয়ে গারো আর খাসিয়াদের লড়াই বহুদিনের। বন্দুকযুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই। মিজোরাম বেশ কিছুদিন ধরেই শান্তি বোনাস পাচ্ছে। কারণ সন্ত্রাস সেখানে নেই। কিন্তু অত্যন্ত জাত্যভিমানী মিজোরা কিন্তু কিছুতেই ‘হিন্দুত্বের আগ্রাসন’ মানবে না। এটা অতীতে বহুবার বুঝিয়ে দিয়েছেন লালডেঙারা। মনে রাখতে হবে মিজোরামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জোরাম থাঙ্গা নিজেও কিন্তু একসময়ে কট্টর জঙ্গি ছিলেন। উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসের রাজধানী বলা যেতে পারে নাগাল্যান্ড। এনএসসিএন। বৃহত্তর নাগাল্যান্ডের দাবি নিয়ে মণিপুরের সঙ্গে সঙ্ঘাত তো রয়েইছে! যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বহুবার রক্তাক্ত হয়েছে নাগাল্যান্ড। নাগারা এমনিতেই যোদ্ধার জাত! তাই রাগলে ভয়ঙ্কর। পূর্ব নাগাল্যান্ডের বাসিন্দারা পৃথক ফ্রন্টিয়ার নাগাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে এবারের স্বাধীনতা দিবস বয়কটের ডাক দিয়েছে। তাঁদের দাবি, পূর্ব দিকের ৪টি রাজ্য নিয়ে নতুন রাজ্য। আবার জঙ্গি সংগঠন এনএসসিএন-এর দাবি, উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী নাগাদের নিয়ে বৃহত্তর নাগাল্যান্ড। নাগাদের সমস্যা মেটাতে গেলে আবার রাগবেন কুকিরা। নাগাদের থেকে আলাদা হয়ে কুকিল্যান্ডের দাবিও উঠে আসছে। নাগা–‌কুকির লড়াই নতুন কিছু নয়। মণিপুরেও সেই লড়াই এখনও অব্যাহত। মণিপুরিরা আবার নিজেদের বিষয়ে খুব সচেতন। সূচ্যগ্র ছাড়তে নারাজ নিজেদের অধিকার। এই নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। দুর্গাপুজো নয়, বাংলায় পাড়ায় পাড়ায় সরস্বতী পুজো কমিটির মতো মণিপুরে রয়েছে জঙ্গি সংগঠন। ফলে পান থেকে চুন খসলেই সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানেও উত্তেজনা বাড়ছে। উত্তেজনা রয়েছে চীন সীমান্তবর্তী অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমেও। পৃথক রাজ্য না চাইলেও বাড়তি সুবিধা হাতছাড়া করতে নারাজ কেউই। বন্দুকের নলকে ভয় পান না এখানকার মানুষ। বরং বন্দুকের নল হাতে লড়াইতেই বেশি অভ্যস্ত এই সব পাহাড়ি জনপদের আবাসিকরা। 
জম্মু ও কাশ্মীরের ৩৭০ ধারার মতো এই অঞ্চলের রাজ্যগুলি ৩৭১ ধারা বলে ভোগ করত বিশেষ সুবিধা। এই ধারাবলেই এখানকার জনজাতিদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি অনেকটাই সুরক্ষিত। ব্রিটিশ আমল থেকেই নাগাল্যান্ড, মিজোরাম বা অরুণাচল প্রদেশে ভারতীয়দেরও অবাধে প্রবেশের সুযোগ নেই। প্রয়োজন হয় ইনার লাইন পারমিট। পয়সা খরচ করে অনেকটা বিদেশ ভ্রমণের ভিসা জোগাড়ের মতো কষ্ট করে নিতে হয় এই আইএলপি। ভিন রাজ্যের বাসিন্দা হলেই এই আইএলপি জরুরি। পুলিশ বা প্রশাসনের প্রধানদের জন্যও কোনও ছাড় নেই। রয়েছে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব কাস্টমারি ল। এটাই সেখানকার আইন। সেই আইনবলেই তাঁরা নিজেদের মতো করে 
রয়েছেন। বিয়ে থেকে সম্পত্তির নিষ্পত্তি হয় নিজস্ব আইনেই। এমনকী, পুর বা পঞ্চায়েতে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ভারতের অন্য রাজ্যের মতো নাগাল্যান্ড বা মিজোরামে সংরক্ষণের বালাই নেই।  
৩৭১–‌এর এ থেকে জে অবধি বিভিন্ন ধারায় উত্তর–‌ পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদির গুজরাট থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজ্যও বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। অমিত শাহ অবশ্য বলেছেন, ৩৭১ সুরক্ষিত। সুরক্ষিত উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলও। কিন্তু তাঁর কথায় ভরসা পাচ্ছেন না এখানকার মানুষ। নিজেদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতি যত্নশীল এখানকার জনগোষ্ঠীগুলি কিন্তু প্রকাশ্যেই নিজেদের ক্ষোভ আর ৩৭১ নিয়ে উদ্বেগের কথা উগরে চলেছে। ‘ইন্ডিয়া’র এক দেশ, এক আইন তাদের মানতে বাধ্য করাটা শুধু কঠিন নয়, এখনও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অসম্ভব। হ্যাঁ, ৮ রাজ্যেই বিজেপি বা তাদের বন্ধু সরকার থাকলেও এটাই বাস্তব। ‌‌‌‌

আলাদা নাগাল্যান্ডের দাবিতে সম্প্রতি কোহিমায় মিছিল।  

জনপ্রিয়

Back To Top