স্বপনকুমার ঘোষ- পৃথিবীতে হাজারো মানুষের দিন শেষ হয়ে যায়, ডাক আসে সুদূরের। এই সত্যি কথাটা জেনেও, কিন্তু যখন অতি কাছের আপনজন মানুষটিকে হারাতে হয় তখন তো আর কোনওভাবেই মন সায় দেয় না। আমরা শোকে–বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যাই। ভারতের লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার, খ্যাতকীর্তি আইনজ্ঞ, শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়–‌কে হারিয়ে আমরা বড়ই বেদনাতুর।
আশ্রমিক বলতে ধ্যানেজ্ঞানে, কর্মচাঞ্চল্যে অংশীদার মানুষকেই বোঝায়। সোমনাথবাবু সে অর্থে অবশ্যই আশ্রমিক নন, কারণ তঁার বহুধা বিস্তৃত কর্ম ও চর্চার ক্ষেত্র সংসদীয় রাজনীতি, ভারতবর্ষীয় জনজীবন এবং কখনও আন্তর্জাতিক জগৎ। কিন্তু তঁার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন তথা বিশ্বভারতী। শান্তিনিকেতন নামক জগৎখ্যাত রবীন্দ্রতীর্থের স্থানটিকে নানান কর্মে, প্রতিষ্ঠান চালনায়, এলাকার সর্বস্তরের জনজীবন সান্নিধ্যে ও তঁাদের কল্যাণ সাধনায় সোমনাথদা সবসময় থেকেছেন তৎপর। এই অর্থে তিনি একজন যথার্থ বান্ধব ও আশ্রমিক।
শান্তিনিকেতন এক ‘‌বিশ্বনীড়’‌। প্রয়াত সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এই নীড়ে স্থান করে নিয়েছেন নিজ কৃতিত্বে। দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব হিসেবে তঁাকে বহু মানুষ চেনেন, জানেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক–‌বান্ধব হিসেবে তঁাকে সম্ভবত‌ খুব বেশি লোকের জানার কথা নয়। 
আজ থেকে বছর ৭৬ আগের কথা। তখন তিনি কলকাতার ‘‌মিত্র ইনস্টিটিউশন’–এর সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। মা, ‌মাসি, দিদির সঙ্গে প্রথম শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় এসেছিলেন। সেই সোমনাথদার সঙ্গে শান্তিনিকেতনের প্রথম যোগাযোগ। তার আগে, ১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ। সেদিন সকলের সঙ্গে বালক সোমনাথও রাস্তায় দঁাড়িয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে বোলপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। যে সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন— ‘‌এই ঘটনা আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য ও মহামূল্যবান প্রাপ্তি বলে সবসময় মনে করি’‌। সাংসদ হিসেবে পৌষমেলার সঙ্গেও তঁার নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। সোমনাথদার কথায়— ‌‘‌এই এলাকায় কাজ করতে আসার সুবাদে প্রায় প্রথম থেকেই একজন মানুষের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল। পরে সেই সম্বন্ধ পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নেয়। এই মানুষটি হচ্ছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের আচার্য, রবীন্দ্র স্নেহধন্য ও যথার্থ আশ্রমিক শান্তিদেব ঘোষ। তঁার কথা আমার সবসময় মনে থাকবে। তাঁর ব্যবহার, অপরিসীম স্নেহ–‌সাহচর্য, ভালবাসা ও সুচিন্তিত পরামর্শ যা পেয়েছি, সেকথা ভেবে আজও অভিভূত হই। বিশেষ করে শ্রীনিকেতন–‌শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ (‌এস.‌এস.‌ডি.‌এ)‌–‌এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং বীরভূম জেলার সার্বিক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে শ্রদ্ধেয় শান্তিদার সক্রিয় ভূমিকা ও উৎসাহের তুলনা মেলা ভার।’‌ 
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিউড়ি থেকে কাঞ্চন সরকারের সম্পাদনায় ‘‌নয়াপ্রজন্ম’‌ পত্রিকার ‘‌অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এক লোকশিক্ষক’‌ শিরোনামে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার জন্যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের সময় তঁার কাছে জানতে চেয়েছিলাম— ‌কবিগুরুর আবাসস্থল উত্তরায়নের রবীন্দ্র–‌গৃহ ‘‌উদয়ন’–‌ এর থেকে বেশি উঁচু কোনও বাড়ি এস.‌এস.‌ডি.‌এ.‌ এলাকায় করা যাবে না, তদানীন্তন উন্নয়ন পর্ষদের পক্ষে আপনি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বভারতী এলাকা এবং তার চারপাশের পরিবেশ দেখে আপনার কী মনে হয়?‌ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘‌আমার ব্যক্তিগত ভাবে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ হচ্ছে। চারপাশের কংক্রিটের বাড়ি উদয়নের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে তো গেছেই, শান্তিনিকেতনের নির্মাণশৈলীও এক প্রকার ধূলিসাৎ হয়েছে। শান্তিনিকেতনের স্থাপত্যরীতি, তার নান্দনিকতা দেখলেই চেনা যায়। রবীন্দ্রনাথের জীবনকালে নির্মিত বাড়িগুলিই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই কারণেই উন্নয়ন পর্ষদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত নম্রতার সঙ্গে আমরা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’‌ 
শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য, রুচি, শৈলী ও নান্দনিকতা বজায় রেখে বোলপুরে সোমনাথবাবু ‘‌গীতাঞ্জলি সংস্কৃতি অঙ্গন’‌ গড়ে তুলেছিলেন। এর নির্মাণকাজে বিভিন্ন মানুষজন ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ নিয়েছিলেন। এখন বিশ্বভারতীর নানা অনুষ্ঠান, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন প্রতিষ্ঠিত ‘‌প্রতীচী’‌–র বিভিন্ন সেমিনার, জেলা ও রাজ্যের নানা উৎসব অনুষ্ঠান এবং আশ্রমগুরু রবীন্দ্রনাথ–‌কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন হয় এই গীতাঞ্জলি সংস্কৃতি কেন্দ্রটিতে। সোমনাথবাবু খুব আন্তরিকভাবেই শান্তিনিকেতন এলাকার মধ্যে, বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের নিয়মকানুন ও পরিচালনার দায়িত্ব মেনে গীতাঞ্জলি সংস্কৃতি অঙ্গন নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। সেভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ থেকে তিনি তখন কোনও সদুত্তর পাননি। 
শান্তিনিকেতনের রাস্তাঘাট, বিশেষ করে আশ্রম সংলগ্ন পিয়ার্সনপল্লী, বালিপাড়া, কালীগঞ্জ, বাগানপাড়া, বনডাঙ্গা, বনেরপুকুরডাঙ্গা, মৌলডাঙ্গা প্রভৃতি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, ক্লাবঘর নির্মাণকার্যে এসএসডিএ যুক্ত থেকেছে। এইসব উন্নয়নমূলক কাজে  অমিতা সেন, শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমনাথ হোর, ড.‌ ভবতোষ দত্ত, ড.‌ সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয় ঠাকুর প্রমুখদের কাছ থেকে সাহায্য, সমর্থন ও প্রেরণা পেয়েছেন। 
সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে স্থির বিশ্বাস ছিল যে, দেশের প্রগতির জন্য নারীশিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন, গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক— যার কোনও বিকল্প নেই। এই কথা মনে রেখে বেশ কিছু মানুষজনকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ত প্রচেষ্টা ও আন্তরিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি বোলপুরে পূর্ণিদেবী মহিলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এলাকার প্রথম মহিলা কলেজ। সেসময় তাঁর বেশ কয়েকজন ‘‌শুভার্থী’‌ বলেছিলেন বোলপুরে মহিলা কলেজ চলবে না। সোমনাথদা তাঁর দৃঢ় সঙ্কল্পে অবিচল থেকেছেন। মেয়েদের শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে বীরভূম জেলায় পূর্ণিদেবী মহিলা মহাবিদ্যালয় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। 
শ্রীনিকেতনের অন্যতম রূপকার ও রবীন্দ্র–‌বান্ধব লেনার্ড নাইট এলমহার্স্টের স্মৃতিতে তাঁরই সাক্ষাৎ–‌শিষ্য অধ্যাপক নবকুমার মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘‌এলমহার্স্ট ইনস্টিটিউট অফ কমিউনিটি স্টাডিজ’‌। সোমনাথবাবুর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের নিকট–‌সম্বন্ধ ছিল, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছেন। পরিচালনার কাজে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের সভানেত্রী খ্যাতকীর্তি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ও রবীন্দ্র স্নেহধন্যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সোমনাথবাবু, রেণু দেবী ও কন্যা অনুশীলা বসুর এক পারিবারিক সম্পর্ক ছিল।
লোকসভার বিরোধী দলের নেতা বা স্পিকার হিসেবে বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় নানা অনুষ্ঠানে বা সেমিনারে যোগ দিয়েছেন। সেখানে অনেকেই তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, তাঁর নির্বাচন–‌কেন্দ্র কোথায়। সোমনাথদা বেশ গর্বের সঙ্গে সবাইকে বলতেন— ‘‌আই অ্যাম ফ্রম টেগোর ল্যান্ড।’‌ শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন বিষয়ের কথা যখন শুনতাম, তখন তাঁর চোখ–মুখ আনন্দে–তৃপ্তিতে ভরে উঠত। তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শান্তিনিকেতনেই থাকব। সত্যিই তাই। সোমনাথদার কাছে শান্তিনিকেতন ছিল জীবনের শেষ বয়সের ভালবাসা। বরাবরই তিনি আশ্রমিক আবহে থেকেছেন। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে আন্তরিকভাবে অনুভব করতেন— ‘‌প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি’‌।

জনপ্রিয়

Back To Top