শারদোৎসব। বর্ষাসুর। যাদবপুর। কুৎসিত অপপ্রচারে এনআরসি আতঙ্ক। এত কিছুর মধ্যে একটি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে দিল্লিতে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। চেয়ার টু চেয়ার। যাওয়ার খবর আসতেই শুরু হল মন্দ খোঁজা, কেন যাচ্ছেন?‌ কাকে বাঁচাতে?‌ ইত্যাদি। এর মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেচ্ছা জানালেন। সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র বিরোধী চিৎকার, ব্যাপারটা কী?‌ ব্যাপারটা সহজ, সৌজন্য। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জন্মদিনে নিয়মিত শুভেচ্ছার ফুল পাঠান মমতা। ২৬ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিংয়ের জন্মদিনেও শুভেচ্ছা জানালেন। মন্দ খোঁজা, মোদিকে কেন শুভেচ্ছা!‌ যাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, তালিকাটা দীর্ঘ। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তেজস্বী যাদব, অখিলেশ যাদব। এবং হ্যাঁ, কেরলের বাম মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।
এতদিন বলা হত, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কেন বৈঠক করেননি মুখ্যমন্ত্রী?‌ সেই সমালোচকরাই বলছেন, কেন গেলেন!‌ রাজ্যের প্রবীণ মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি বললেন, আমরাই তো মমতাকে বলি, যাওয়া দরকার, কেন্দ্রের কাছে প্রাপ্য আদায়ের জন্য।
প্রশ্ন হল, মাঝে কেন যাননি?‌ কারণ, দেড় বছর ধরে দেশে রাজনৈতিক লড়াই চলেছে সাম্প্রদায়িক সরকারের বিরুদ্ধে। সামনে মমতা। জঘন্য প্রতিহিংসা মোদি–‌শাহদের দিক থেকে। মমতা কেন, কেউই বোঝেননি, সেই লড়াইয়ে ফাঁক রেখে দেবে কংগ্রেস। যেখানে জোট করার করেনি। রাহুল যেন ভেবেছেন, এবার বিকল্প সরকার হলেও, কংগ্রেসের আধিপত্য থাকবে না, ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য ঝাঁপাবেন। ১৩০ আসন এমনিতেই চলে আসবে, আঞ্চলিক দলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কী দরকার?‌ যে সব রাজ্যে প্রধান দায়িত্ব ছিল কংগ্রেসের, এমনকী সদ্য–‌জেতা তিন রাজ্যেও লোকসভা ভোটে বিপর্যয়। দেড় বছর ধরে আপসহীন লড়াই করেছেন মমতা। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও করেননি। এদিকে, জমেছে অনেক ইস্যু।
পুরনো ঋণ নিয়ে দাবি দীর্ঘদিনের। বলে যেতে হবে। বললেন। নানা প্রকল্পে কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের প্রাপ্য বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা। তথ্য–‌সহ দাবি পেশ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। উন্নয়নের কাজ বন্ধ হতে দেননি, কিন্তু কেন্দ্রের টাকা আসছে না কেন, জানাতে হবে, বলতে হবে। বললেন। মমতা ব্যানার্জি শুধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন, দেশের অগ্রগণ্য নেত্রী। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দেওয়ার চক্রান্ত, নানা সংস্থায় চাকরি চলে যাওয়া, ব্যাঙ্ক নিয়ে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত, বলতে তো হবে। বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ, কংগ্রেস ব্যতিব্যস্ত বিবাগী রাহুলকে নিয়ে এবং গেহলট–‌পাইলট, কমল নাথ–‌জ্যোতিরাদিত্য, এমন অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে।নিজের অবস্থানে অনড় যিনি, সেই মমতা ব্যানার্জি তাঁর সর্বভারতীয় দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বললেন। বিকল্প কণ্ঠস্বর শুনলেন নরেন্দ্র মোদি।
মন্দ খোঁজার বিরল শিল্পীরা, বাংলার বিরোধীরা, আরও একটা জায়গায় ঝাঁপালেন। দেউচা–‌পাচামি কয়লাখনি প্রকল্পের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীকে আসার জন্য কেন বলে রাখলেন মমতা?‌ দেউচা–‌পাচামি রাজ্য পেয়েছে অনেক লড়াইয়ের পর। ৫০ বছর বাংলাকে কয়লা নিয়ে ভাবতে হবে না, দেশের নানা রাজ্যেও সুবিধা পৌঁছবে। কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। জানিয়ে রেখেছেন, যথাযথ পুনর্বাসন না দিয়ে, সম্মতি না নিয়ে, একজনকেও উচ্ছেদ করা হবে না। রাজ্য ও দেশের পক্ষে এক বিরাট পদক্ষেপ। তাতে কেন্দ্রের বাড়তি নয়, স্বাভাবিক সহায়তা লাগবেই। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক লড়াইকে টেনে আনবেন কেন?‌ প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ, শুধু প্রয়োজন নয়, সৌজন্যও। তাতেও মন্দপন্থীদের চিল–‌চিৎকার। মন্দবাবুদের সুমতি ফিরুক!‌
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর কর্কশ সমালোচনা, এনআরসি নিয়ে কিছু বললেন না কেন?‌ যিনি প্রথম থেকে লড়ছেন, তাঁকেই গালমন্দ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরই মমতা জানিয়ে দিলেন, পরদিন কথা বলতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। কথা হল। প্রধান ইস্যু, অবশ্যই এনআরসি। তথ্য দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে এলেন। বাইরে এসে বললেন, অসমে ঘোর অবিচার হচ্ছে। বাংলায় কিছুতেই এনআরসি করতে দেবেন না। কথাটা বাংলায় ফিরে বলেননি, বলেছেন দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠকের পরই। মন্দপন্থীদের কুকথা কি থামল?‌ কমল, তবে থামার নয়। নেই কাজ, তাই ঝাঁঝ। এবং সেই বাতিল দিদি–‌মোদি তত্ত্ব। মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে?‌ আট বছর ধরে যে–‌মুখ্যমন্ত্রী তথা নেত্রী গেরুয়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার, তাঁকে নিয়ে বিচিত্র তত্ত্ব প্রচার!‌ মমতার বিরুদ্ধে বলার সময়ে মোদি–‌শাহের চোখের ভাষায় প্রতিহিংসা ফুটে ওঠে। দিলীপ ঘোষ থেকে শুরু করে কুচো নেতারাও জঘন্য আক্রমণ করেন। সেই মমতাকে মিথ্যা আক্রমণ ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে, অদ্ভুত নেতারা ধুলো থেকে কুড়িয়ে পরিষ্কার করতে চাইছেন। কিছু হবে না। হাস্যকর। প্রত্যাখ্যাত। তবে হ্যাঁ, একটা কথা মানতে হবে। ওঁদের মন্দ খোঁজার বিরল প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রতিভাবানরা থাকুন বিচিত্র তত্ত্ব নিয়ে। বিরল প্রতিভা, নমস্কার!‌ ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top