সংবিধান প্রণেতাদের পক্ষে বেঞ্জামিন ফ্র‌্যাঙ্কলিন সংবিধান জর্জ ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিলেন। আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনের সহাস্য প্রশ্ন, ‘‌কী দিলেন’?‌‌ ফ্র‌্যাঙ্কলিন: ‘‌দিলাম গণতন্ত্র, যদি অবশ্য আপনারা তা রক্ষা করতে পারেন!‌’‌ ভারতে কথাটা আজ প্রাসঙ্গিক, যদি রক্ষা করা যায়!‌ সংবিধান আর শুধু একটা সর্বমান্য ‘‌বই’‌ থাকল না, হয়ে উঠল হাতিয়ার। সংবিধান রক্ষার সংগ্রামে নেমেছেন ভারতবাসী।
সিএএ যে সংবিধান–‌বিরোধী তাতে সন্দেহ নেই। আম্বেদকাররা যে–‌সংবিধান আমাদের দিয়ে গিয়েছেন, তার মর্মকথার বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর আইন। সংবিধানে বলা হয়েছে সমতা, সমানাধিকারের কথা। সিএএ সেই অধিকারকে লঙ্ঘন করছে। সংবিধান বলছে, এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ। তিন দেশে ‘‌ধর্মীয় কারণে উৎপীড়িত সংখ্যালঘু’‌, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিস্টান, পার্সিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। বাদ শুধু একটি ধর্মের মানুষ। মুসলিম। তিনটে দেশের কথা বলা হয়েছে— পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ। পাকিস্তানের আহমেদিয়া সম্প্রদায় উৎপীড়িত। নেই কেন?‌ প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার তামিল হিন্দুরা বাদ কেন?‌ সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেবে, জানি না। কিন্তু, নতুন আইন যে সংবিধানের মর্মকে আঘাত করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মোদি–‌শাহর আইন যে অমানবিক, নিষ্ঠুর, তা নিয়ে সংশয় আছে?‌ অধিকাংশ দেশবাসীর নেই। নীতি, আদর্শ, যুক্তি, মানবিকতা— কোনও দিক দিয়েই ধোপে টিকছে না।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রথম বলেছিলেন, এনআরসি হতে দেব না। ক্যা নিয়েও স্পষ্ট ঘোষণা:‌ না। একে একে ১২ মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বললেন। কিন্তু পথে?‌ কেরলের পিনারাই বিজয়ন একদিন প্রতিবাদ–‌মঞ্চে। রাজস্থানের অশোক গেহলট একদিন মিছিলে। মমতা এর মধ্যে ১০টি উত্তাল মিছিল করেছেন। কলকাতায়, জেলায়। অরুন্ধতী রায় বলে গেছেন, ক্যা আটকাতে অ–‌বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে। আন্দোলনকে পথে উত্তাল করা চেষ্টা অন্য মুখ্যমন্ত্রীরা কেন করছেন না?‌
মমতা বলেছিলেন, এক ধরনের গণভোট হলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ভারতবাসী কী চাইছেন। বিরোধীরা হইচই বাধাল। হ্যাঁ, সাধারণভাবে ব্যবস্থা নেই। কিন্তু, নীতিগত দিক দিয়ে করা যায়। উদাহরণ?‌ ১৯৫৬ সাল। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কৃষ্ণ সিংহ সিদ্ধান্ত নিলেন, দুই রাজ্যকে এক করে দিতে হবে। প্রতিবাদে উত্তাল বাংলা। ঠিক তখন, মেঘনাদ সাহার প্রয়াণে উত্তর–‌পূর্ব কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন। বিধানচন্দ্র রায় বিরোধী নেতা জ্যোতি বসুকে ডেকে বললেন, ‘‌বেশ, উপনির্বাচনকে গণভোট ধরা হোক। যদি হেরে যাই, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করব।’‌ কংগ্রেস প্রার্থী অশোক সেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মোহিত মৈত্র। তখন পালঘাটে পার্টি কংগ্রেস। জ্যোতি বসু রাজ্য সম্পাদক। জ্যোতিবাবু জানিয়ে দিলেন, ‘‌এখানে বড় লড়াই। যেতে পারছি না।’‌ কংগ্রেস পরাজিত। এবং ডাঃ রায় সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এলেন।
যে–‌লড়াইটা চলছে, তা সহজ নয়। নানা মতপার্থক্য পেছনে রেখে, এই মুহূর্তের দাবি, সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের বীভৎস আইনকে 
প্রত্যাহার করতে হবে। হতে হবে একমুখী। এর মধ্যে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি থাকা চলবে না। কিন্তু চলছে। অনেকবার বলা হয়েছে, তবু বলতে হচ্ছে। বাংলার বাম নেতারা প্রতিবাদে উজ্জ্বল মমতাকে নোংরা 
আক্রমণ করে কার্যত দুর্বল করে দিতে চাইছেন লড়াইকে। চেনা কথা, আবার বলি, শুভবুদ্ধির উদয় হোক। বিভেদ তৈরি করে সঙ্কীর্ণ স্বার্থরক্ষার সময় পাবেন পরে, এখন আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।
দেশ জুড়ে কত ভাল ছবি। সংবিধানকে আঁকড়ে ধরে, সংবিধানকে হাতিয়ার করে আন্দোলন। ছাত্রছাত্রীরা মুখর, আপসহীন। তরুণ প্রজন্ম সংগ্রামে সামনে থাকলে, তেজ তো বাড়েই। এর মধ্যে দু–‌একটা কথা বলা দরকার। এবং তার বিহিত দরকার। আন্দোলনের কেন্দ্র প্রধানত কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্য সুখ্যাত। জেএনইউ, প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, হায়দরাবাদ, জামিয়া মিলিয়া। কিন্তু ‌‌ ‌ছড়াতে তো হবে। অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে–‌কলেজে আন্দোলনটাকে ছড়িয়ে দিতে না–‌পারলে আটকে যেতে হবে। অগ্রণী নিশ্চয় থাকে কয়েকটি কেন্দ্র। দুর্গ। কিন্তু, ছড়াতে হবে। এবং ছাত্র আন্দোলনকে সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করা চলবে না।
দিল্লিতে শাহিনবাগ, কলকাতায় পার্ক সার্কাস, লখনউয়ে ঘণ্টাঘর। ঘরে–‌থাকা মুসলিম মহিলারা আন্দোলনে। মহিলারা সামনে এসে প্রতিবাদ করলেন, দারুণ ব্যাপার। কিন্তু, হ্যাঁ, আবার একটা ‘‌কিন্তু’‌। শুধু মুসলিম মহিলারা থাকলে হবে?‌ সরাসরি আক্রান্ত তাঁরা, প্রতিবাদে এসেছেন। আক্রান্ত শুধু মুসলিমরা নন। নাগরিকত্ব প্রমাণের ফাঁদে কী হয়, অসমে দেখেছি। ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ (‌১২ লক্ষ হিন্দু!‌)‌। যদি লাগাতার প্রচার চলে, ছবি বেরোয়, প্রধানত মুসলিম মহিলারা বিক্ষোভে মুখর, তাতে উগ্র সাম্প্রদায়িক বিজেপি–‌র সুবিধা হয়। সুতরাং, যত বেশি সম্ভব ছড়াতে হবে। শুধু বিশেষ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নয়, শুধু মুসলিমদের নয়, আন্দোলন 
সবার, দেশের।
এসপার ওসপার। এই যুদ্ধে বিজেপি–‌বিরোধীদের মধ্যে বিভেদ থাকা চলবে না। যাঁরা তা করবেন, তাঁদের চিহ্নিত করতে হবে। অন্তত বাংলায় চিহ্নিত!‌ স্বাধীনতা আন্দোলনে আমরা ছিলাম না। আরএসএস ছিল ব্রিটিশ–‌ভক্ত। কিন্তু আমাদের আগের আগের প্রজন্মের দেশবাসী, বাঙালি তো বটেই, লড়েছেন। এবার দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। জিততে হলে ছড়াতে হবে।‌‌‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top