এমন কঠিন সময় বাংলার ইতিহাসে আর আসেনি। অতিমারির হানা। সাধ্যের বাইরে গিয়ে স্বাস্থ্য–‌পরিকাঠামো দঁাড় করাল রাজ্য সরকার। অর্থনীতি স্তব্ধ, আয় নেই, ব্যয় বিপুল। আমফান। ২৮৩ বছর পর এমন মহাদুর্যোগ। লড়ছেন মমতা, সঙ্গে প্রশাসন, সর্বস্তরের কর্মীরা। ৪ ঘণ্টার নোটিসে অপরিকল্পিত লকডাউন, পরিযায়ী শ্রমিকদের যে–‌যেখানে আছেন থাকতে বলা, তারপর সেই প্রধানমন্ত্রীই সিদ্ধান্ত নিলেন, ফিরিয়ে দাও পরিযায়ীদের, রাজ্যে রাজ্যে। ট্রেনে ঠেসে পাঠানো হল। অনেক বেশি আক্রান্ত রাজ্যগুলো থেকে বাংলায় আসা ট্রেনগুলো কি কার্যত ‘‌করোনা স্পেশ্যাল’‌ হয়ে গেল না?‌
লড়তে হচ্ছে বাংলাকে। পাল্লা দিয়ে বিষ ছড়াচ্ছে বিজেপি (‌কংগ্রেস–‌বামও পিছিয়ে নেই, তবে সেভাবে খবরে আসতে  পারছে না)‌। দিলীপ ঘোষরা বলে যাচ্ছেন, মমতা ব্যানার্জি পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরাতে চান না!‌ মিথ্যার জাহাজ। প্রায় ৯ লক্ষ পরিযায়ী ফিরে এসেছেন ট্রেনে, বাসে। আরও এক লক্ষ আসছেন। মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার বলে দিয়েছে, অন্য রাজ্য থেকে কোনও ট্রেন ঢুকতে দেবে না। আর বাংলা যথাসম্ভব সুব্যবস্থা করছে। তফাতটা মানুষ বুঝবেন, দিলীপবাবুরা চেঁচান যত খুশি। রেলভাড়া দিচ্ছে মমতার সরকার, বাসের খরচ, ‘‌স্নেহের পরশ’‌ প্রকল্পে মাথাপিছু ১০০০ টাকা, রেশন, হাতে হাতে ১০০ দিনের কাজ। ফেরাতে চান না মমতা?‌
মাঝে কয়েকটা দিন সময় চেয়েছিলেন। আমফান বিপর্যয় সামলাতে ব্যস্ত গোটা প্রশাসন, একইসঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তঁাদের সরকারি বাসে জেলায় ফেরানো, থাকার ব্যবস্থা। সামান্য বিরতি চাওয়া অন্যায়?‌
লকডাউন আগেই করা যেত। কেন্দ্র করেনি, মধ্যপ্রদেশে সরকার ফেলে ‘‌দখল’‌ করার জন্য। ‘‌দখল’‌ ছাড়া ওঁরা আর কিছু বোঝেন?‌ পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানো যেত ১৫ মার্চ থেকে। ততদিনে ভাইরাস হানা ঘঁাটি গাড়ছে ভারতে। তখন ফেরানো হল না, থাকতে বলা হল। যখন ফেরানো হচ্ছে, অনেক বেশি আক্রান্ত রাজ্য থেকে, ট্রেনগুলোকে করোনা স্পেশ্যাল বলা কি ভুল?‌ অপরিকল্পিত লকডাউন, অপরিকল্পিত ছেড়ে দেওয়া, বুঝে নিক রাজ্য!
পরিযায়ী শ্রমিকরা কোথাও কোথাও বাধা পাচ্ছেন পড়শিদের কাছ থেকে। মুখ্যমন্ত্রী আবেদন জানালেন, মানবিক হোন। খারাপ ব্যবহার পেয়েছেন অন্য রাজ্যে, এখানে সতর্ক থেকেও ভাইবোনদের ফিরিয়ে নিতে হবে। কাশ্মীরে যখন বাঙালি শ্রমিককে হত্যা করা হল, অনেকে ফিরে এলেন, তখনই মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সবারই কিছু না কিছু ব্যবস্থা হবে, বাইরে গিয়ে বিপদে পড়বেন না। এবারও বলেছেন, থাকুন, জীবিকার পথ বার করা হবে। পরিযায়ী শ্রমিক–‌বিরোধী এই মুখ্যমন্ত্রী?‌
মহারাষ্ট্র, দিল্লি, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু থেকে অনেকে এলেন ট্রেনে ঠাসাঠাসি করে, অভুক্ত থেকে। যেসব জেলা নিরাপদ ছিল, রাতারাতি ছবি পাল্টে গেল। শুধু উদ্বিগ্ন হননি মমতা। ব্যবস্থা করেছেন। বাংলায় কাজ করেন বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, উত্তরপ্রদেশের অনেকে। কেউ কি অভিযোগ করেছেন, যত্ন পাননি?‌ দেখভাল করেছে বাংলা। যঁারা ফিরতে চেয়েছেন, সঙ্গে থেকেছে রাজ্য। বাসে চড়িয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে স্টেশনে, খাবার দেওয়া হয়েছে, থার্মাল টেস্ট হয়েছে। সবাই কি ফিরলেন?‌ দুটো উদাহরণ। ব্যান্ডেল থেকে মুজফ্‌ফরপুর ‘‌শ্রমিক স্পেশাল’‌। আসন ১৫৫০, গেলেন ২১৪ জন!‌ কলকাতা থেকে লখনউ, আ‌সন ১৫০০, গেলেন ৩১২!‌ কিছু প্রমাণ হল না?‌
 মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মাস্ক–‌এ একদিন দেখলাম বাংলার মানচিত্র। অফিসারদের মাস্ক–‌এ ‘‌জয় বাংলা’‌। তৃণমূল নেতাদের মাস্ক–‌এ ‘‌বাংলা জিতবে’‌। আর দিলীপ ঘোষের?‌ পদ্ম–‌ছাপ!‌
যখন ভয়ঙ্কর সঙ্কটে লড়ছে রাজ্য, অতন্দ্র মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বললেন, সামনের বছর বাংলা দখল করব!‌ মানুষের দুর্গতি ওঁদের কষ্ট দেয় না, শুধু ‘‌দখল’‌–‌এর চিন্তা। বীরভূমের ৪ জন, রামপুরহাট স্টেশনে নেমে চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন। চিহ্নিত করা হল। কী বললেন?‌ ‘‌মহারাষ্ট্রে খুব ভাল ছিলাম, এখানে কিছু পাচ্ছি না!‌’‌ বিজেপি–‌র সাজানো ব্যাপার নয়?‌ প্রশ্ন, যদি ভালই ছিলেন, ফিরলেন কেন?‌ ১৭ টি কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে সম্ভাব্য অব্যবস্থা নিয়ে তুমুল প্রচার। অব্যবস্থা থাকলে, শুধরে নেবে রাজ্য। কিন্তু, পরিসংখ্যানটা নিন। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কতকগুলো কোয়ারেন্টিন সেন্টার হয়েছে?‌ চমকে উঠবেন না, হ্যঁা, ১১ হাজার ২০৫টি!‌
দখলবাবুরা স্বপ্ন দেখুন। বিষ ছড়ান। নির্বিষ করতে জানে বাংলা। স্বপ্ন চূর্ণ হবে। সেই ভাঙা স্বপ্ন নিয়ে কী করবেন, ভাবতে থাকুন দিলীপবাবুরা।

জনপ্রিয়

Back To Top