বাহারউদ্দিন—ভারতীয় সাংবাদিকতার, না ঠিক বলা হল না, সুদৃঢ় প্রত্যয়ে, গাঢ় উচ্চারণে বলতে হবে যে, গোটা উপমহাদেশের ‘‌গ্রেটেস্ট স্কুপম্যান’‌ কুলদীপ নায়ারের মৃত্যুতে আমাদের উদাসীনতা, আমাদের সমাজ আর রাজনীতির, বুদ্ধি ও যুক্তিচর্চার, সাম্প্রতিক ইতিহাসবোধের সংশয়াচ্ছন্ন স্তব্ধতাকে, ব্যক্তিক–‌প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসর্বস্বতাকে পোশাকশূন্য আরও হাস্যকর করে তুলল। 
সাংবাদিককুল তাঁর হঠাৎ–‌শূন্যতায় অবশ্যই শোকার্ত, স্মৃতিচারণে ব্যস্ত, শোকসভায় তাঁকে জড়িয়ে তাঁদের আমিত্বের লঘু–‌গুরু মহিমা ভনভন করছে;‌ কিন্তু তাঁর প্রতিভার, ব্যক্তিত্বের দ্যুতির, সীমান্তলঙ্ঘী মানবিকতার ধ্রুব, অধ্যাসিত ব্যবহারিকতার জরিপ কোথায়?‌
দুঃখের সঙ্গে, প্রখর ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, ভারতীয় সংবাদপত্রে মহীরুহ সাংবাদিককে ঘিরে একমাত্র শেখর গুপ্তের মনোজ্ঞ রচনা নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। তাঁর কথাবার্তা, কিছু কিছু লেখালেখি বের করেছে অন্য একটি ইংরেজি দৈনিক, যা খানিকটা বিভ্রান্তিকর, খানিকটা সত্য। আরও কয়েকটি কাগজও প্রবল অনুরাগে খতিয়ে দেখেছে তাঁর কর্মকাণ্ড। মৃত্যুর পরদিনই সামাজিক দায়বদ্ধতার জাগ্রত প্রতীক কলকাতার দৈনিক আজকাল কুলদীপের স্মৃতিতে জাগিয়ে তুলেছে তার অকৃপণ অভিজ্ঞান।
কিন্তু যে–‌সাংবাদিক, যে দুঃসাহসী রিপোর্টার, যে সম্পাদক, যে সংবাদ–‌ভাষ্যকার, তদন্তমূলক সাংবাদিকতা আর ঘটনা প্রবাহের যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা দেশভাগের পর থেকে প্রায় আট দশকজুড়ে সাংবাদিকতার ইতিহাসকে নিরন্তর ঋদ্ধ করে গেছেন, তাঁর স্মরণে, তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডকে, স্মৃতিতে, অনেকের ‘‌সম্পাদকীয়’‌ সৌজন্যের কার্পণ্য স্তম্ভিত করে দিচ্ছে। প্রতিবেশী বাংলাদেশের ইত্তিফাক যে ভাষায়, যে শ্রদ্ধায়, যে সজল উচ্চারণে লোকান্তরিত কুলদীপকে সম্মান জানিয়েছে, সেরকম মর্মস্পর্শী সদিচ্ছা প্রকাশে আমাদের ব্যর্থতার কারণ কী?‌ এটা কি নিছক উদাসীনতা?‌ প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে তাঁর ‘‌অ্যাক্টিভিস্ট কলমকে’‌ অস্বীকার করার সুপরিকল্পিত কৌশল?‌
সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, আর গঠনশীল রাজনীতির নির্মাতাদের কর্ম আর ধর্মের মুখ আর অভিমুখ অভিন্ন। কাজের ধরন আলাদা, কিন্তু তাঁদের সন্ধান–‌অনুসন্ধান অতীতকে, বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। বলে দেয়, মিথ্যার আড়ালে সত্যের নিহিত সত্য কীরকম?‌ কোন পথে এগোলে রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক খণ্ডতা অতিক্রম করে নির্বিশেষ তার ভাষিক, সাম্প্রদায়িক বা অন্যান্য ক্ষুদ্রতা পেরিয়ে সভ্যতার অসীমকে, অসীমের নির্মাণকে সহজসাধ্য করে তুলবে।
কুলদীপ নায়ারকে তাঁর লেখায়, তাঁর মানবাধিকার রক্ষার কর্মে, তাঁর মিশ্র সংস্কৃতির সচেতন সাধনায় আমরা এভাবেই লক্ষ্য করেছি। আগামীও তাঁকে অনুরূপ দৃষ্টিতে খুঁজবে। ঠুনকো ও তাৎক্ষণিক নন, যে হারিয়ে যাবেন। যাঁরা গম্ভীর স্বরে, বিদ্বজনকে গালি দিয়ে, ক্ষমতার অলিন্দ ছুঁয়ে, বা অলিন্দধন্য হওয়ার ক্ষীণ আশা নিয়ে অশ্রাব্য, নিন্দাদিত ভাষা প্রয়োগ করে চিত্তজয়ী হতে নিরন্তর সচেষ্ট, তাঁরা কুলদীপের যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যনিষ্ঠ, ইতিহাসমগ্ন অধ্যবসায় আর পরিশ্রম খতিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন, তাঁদের সঙ্গে কুলদীপের দূরত্ব কোথায়?‌ লোভী, মোহাচ্ছন্ন, আবর্জনাবাহী খাল–‌নালা চাইলেই কি মহানদ কিংবা সমুদ্র হতে পারে?‌ খালের ধর্ম আত্মসমর্পণ আর প্রশ্নহীন আনুগত্য। নদী ও সমুদ্র‌ তাঁর কর্মে আর মর্মে শ্বাশ্বত প্রবাহের বাণীকে সঙ্গে নিয়ে, মহাজাগতিক সব জলরাশিকে আত্মস্থ করে হয়ে ওঠে অনিঃশেষের, সভ্যতা আর চিরন্তনের সর্বংসহা আধার। যা অপার। অসীমেরই অংশ বিশেষ। নিছক বর্জ্যবাহী বলে সে এড়িয়ে যায় খাল–‌নালাকে। 
স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তাক্ত সংগ্রাম, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। দেশভাগের আগেই হিংসা। চোখের সামনে দেশহরণ, বয়োসন্ধি লুট, ভাঙনজনিত অব্যক্ত কান্না ও আর্তনাদ দেখতে দেখতে উদ্বাস্তু জীবন, ভাঙনের পর ভাঙন অতিক্রম করতে করতে মিশ্র ঐতিহ্য আর মহাভারতের ভারতকে অন্যভাবে গড়ে তোলার, তার ঘোষিত অঙ্গীকারকে টিকিয়ে রাখার সঙ্কল্প নিয়ে শিয়ালকোট আর লাহোর ছেড়ে বিশ্বাস আর অঙ্গপ্রত্যয়ের সম্ভার–‌সহ উর্দু ‘‌আঞ্জাম’‌ পত্রিকায় যৎসামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে যাঁর কর্মকাণ্ডের সূচনা, তিনিই একদিন অসামান্য রিপোর্টার, একাধিক পত্রিকার স্থিতধী সম্পাদক, আপসহীন ভাষ্যকার এবং স্কুপ নিউজের দুর্গ ভাঙার অজেয় কারিগর হয়ে উঠলেন। সে এক প্রায় অবিশ্বাস্য অধ্যায়। অবিশ্বাস্য হলেও বিশ্বাসযোগ্য। সত্যময়তার পূর্ণাবয়ব তাঁর লক্ষ্য।
জরুরি অবস্থার আগে–‌পরে ব্যক্তি ইন্দিরার গুণমুগ্ধ হয়েও রেহাই দিলেন না তাঁকে। ভেতরের খবর পর পর ফাঁস করছেন। অকপটে। শ্রীমতী গান্ধীর অন্দরমহলে বন্ধুদের অভাব নেই। তাঁদের সূত্রেই জানিয়ে দিলেন, অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা সামনে। এবং তা–‌ই ঘটল। দেশজুড়ে ধরপাকড় আরম্ভ হল, শুরু সংবাদপত্রের ‘‌প্রি–‌সেন্সারশিপ’‌। বাক–‌স্বাধীনতা আর যাবতীয় কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে লড়াই তাঁর যৌক্তিক আর নির্মেদ। ভাষা তথ্য ও প্রমাণে ঠাসা। মিসা আইনে আটক করল প্রশাসন। তবু অকুতোভয়। প্রশ্নমুখর। কর্মযজ্ঞ থেমে নেই। তারপর ফাঁস করলেন, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে আশু নির্বাচনের ডাক দেবেন ইন্দিরা। প্রমাণিত হল এই খবর। ’‌৭০ সাল থেকে ’‌৮০ সাল। এই একের পর এক স্কুপ নিউজ দিয়ে, সংবাদের ভাষ্য দিয়ে, ঘটনাপ্রবাহের ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত দিয়ে সংবদপত্র আর ইতিহাসের ভিন্নকণ্ঠী স্রষ্টা হয়ে উঠলেন কুলদীপ, আমাদের পরোক্ষ শিক্ষক কুলদীপ নায়ার।
বয়স তখন বাড়ছে। স্পর্শ করছে প্রৌঢ়ত্বের শৈশব কিন্তু প্রৌঢ়ত্ববোধ নেই। নিউজ রুমে কর্মচঞ্চল, হাসিখুশি। তাঁর তারুণ্য, তাঁর শ্রমস্পৃহা ছুঁয়ে যায় তরুণতর কর্মীদের। ইমার্জেন্সি উঠে গেছে, তাঁর নেতৃত্বে জরুরি অবস্থার লৌকিক বিদ্রোহকে ঘিরে শীর্ষে পৌঁছে গেল রামনাথ গোয়েঙ্কার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। গোয়েঙ্কা কৌশলী মালিক। তাঁর ভয়, কুলদীপের জনপ্রিয়তা তাঁকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কেন না, তিনিই এক্সপ্রেসের প্রধান মুখ। তরুণ মেধাবী সাংবাদিকদের সামনে কুলদীপ শুধু আইডল নন, শিক্ষক আর সুস্থ সাংবাদিকতার উজ্জ্বলতম সংগঠক। কৌশলী রামনাথ গোয়েঙ্কার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে তবু তিনি প্রধান সম্পাদক নন, পদটি এস মুলগায়কোয়াড়–‌এর দখলে, সম্পাদকীয় দায়িত্বে বঙ্গসন্তান অজিত ভট্টাচার্য আর কুলদীপ এক্সপ্রেস নিউজ–‌এর সম্পাদক মাত্র। গোয়েঙ্কা আর একটি ছক কষলেন। দুঃসাহসী অরুণ শৌরিকে ১৯৭৯ সালে ডেকে নিয়ে ওপরে বসিয়ে দিলেন। কুলদীপের বয়স ৫৫। আর অরুণ ৩৭। আক্ষরিক অর্থে অনন্য সম্পাদককে কোণঠাসা করে দিলেন গোয়েঙ্কা। কুলদীপকে এক্সপ্রেস ছাড়তে হল। সেটা কোন সাল, ’‌৮০?‌ শেখর গুপ্ত বলেছেন ’‌৮১।
স্তম্ভিত, আহত হয়েও দমে যাননি সাংবাদিকতার নায়ার। তাঁর কীসের অভাব?‌ ভেতরে জেদ। সুদৃঢ় সঙ্কল্প। প্রভূতবিদ্যা। বিশদ অভিজ্ঞতা। বাইরে দেশ–‌বিদেশে প্রবল জনপ্রিয়তা। সিন্ডিকেট কলম লিখতে শুরু করলেন। ১৪টি ভাষায়, প্রায় একসঙ্গে ৮০টিরও বেশি পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত কলম বের হয়। আরও উঁচু হতে থাকে লোকচিত্তজয়ী স্বভাব। ঠিক এরকম মুহূর্তে ঢাকার ইত্তেকাফ গোষ্ঠীতে তাঁর প্রবেশ ঘটল। এও আর একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে এর আগে কোনও ভারতীয় সম্পাদক নিয়মিত কলম লিখেছেন কিনা, জানা নেই আমাদের;‌ এত গুরুত্ব, এত সম্মান অর্জন করেছেন বলেও জানা নেই। দ্বিতীয়ত, ভারত ও ভারতের বাইরে ৮০টি কাগজে শাণিত, যুক্তিপূর্ণ ভাষায় অন্য কেউ নির্দ্বিধায় নিজের মত আর পথের কথা বলেছেন, নিঃশব্দে বলে গেছেন— এ তথ্য চোখে ভাসছে না।
এখানেও কুলদীপ গ্র‌্যান্ডমাস্টার।
এরকম সর্বগামী, আন্তর্জাতিকের পূজারি, প্রতিবেশী প্রেমের অন্তহীন জাদুকরকে আমরা প্রায় নিঃশব্দে যে–‌ভাবে বিদায় জানালাম, কার্পণ্য আর উদাসীনতাকে উঁচু করে, তা সাংবাদিকতার চলমান ইতিহাস, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের সজাগ চোখ অবাক বিস্ময়েই দেখল। নিছক শোকবার্তা, টুইটই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট?‌ সামান্য, যৎসামান্য বা অসামান্য রাজনীতিকের মৃত্যুতেও আমাদের তোপধ্বনির অভাব হয় না। কিন্তু যে–‌সব সাংবাদিক জীবনকে বাজি রেখে, মৃত্যুকে, সন্ত্রাসকে, কদর্য হামলাকে তুচ্ছ করে, তাঁদের পেশা আর দেশপ্রেমকে, মানবপ্রীতিকে, দেশের নিশানকে নিভৃত, জাগ্রত আরাধনার স্তরে নিয়ে যান, তাঁদের বেলায় রাষ্ট্র আর সমাজের ভূমিকা কেন এত ক্ষুদ্র, সংক্ষিপ্ত?‌ অবজ্ঞা আর অবহেলাই কি তাঁদের পুরস্কার?‌ গণতন্ত্রের সাচ্চা জবরদস্ত রক্ষী হলেও সংসদে, গণতান্ত্রিকতার অন্যান্য মঞ্চে তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতি নেই কেন?‌ রাজা যায়, রাজা আসে। থেকে যায় সাংবাদিকতার স্বাক্ষর। এই বোধোদয় কবে ঘটবে।  ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top