শেখ হাসিনা, লেখক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা‌‌‌‌‌‌‌: দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত, অবহেলিত গ্রামের মানুষের দুঃখ–‌যন্ত্রণা যাঁকে পীড়া দিত, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন তিনি। গরিব–‌দুঃখী মানুষকে অকাতরে সাহায্য করতেন। 
তখন এদেশে ব্রিটিশদের শাসন চলছে। ভিনদেশ থেকে এসে এদেশের মানুষের ওপর শাসনভার চাপিয়ে দেওয়া তিনি মানতে পারেননি। স্বদেশি আন্দোলন তখন চলছে। অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয় যখন তাঁর পিতা চাকুরির সুবাদে বদলি হয়ে যান মাদারিপুরে। তাঁর গৃহশিক্ষক তাঁকে ব্রিটিশদের শোষণের কথা বলতেন। এর বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ যে আন্দোলন করছে, সে সম্পর্কেও জানতে পারেন। নিজেও ছোটবেলা থেকে মানুষের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের কাহিনি শুনেছেন। বাড়িতে নিয়মিত পত্রিকা–‌ম্যাগাজিন রাখা হত। সেখানে বিখ্যাত কবি–‌সাহিত্যিকদের লেখা পড়ার সুযোগ পেতেন। 
স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ)। কলকাতায় এসে যোগ দেন ব্রিটিশ–‌বিরোধী আন্দোলনে। 
স্কুল জীবনে সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর। সুভাষচন্দ্র বসুর আন্দোলন সম্পর্কে জেনেছেন এবং উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
কলকাতায় পড়তে এসে হোসেন শগিদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। মহাত্মা গান্ধী ও মুহম্মদ আলি জিন্নাহ–‌র সাক্ষাৎ পান। যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে দারুণ প্রভাব ফেলে।
বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেন। মানুষের এই দুঃখ–‌যন্ত্রণা তাঁকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। গ্রামের বাড়িতে এসে তিনি গোলার ধান গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন।
পাকিস্তান অর্জনের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন। ব্রিটিশদের কূটচালে যখন হিন্দু–‌মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়, তখন তিনি মানুষকে বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে এ বিষয়ে অনেক অজানা বিষয় আমরা জানতে পারি। 
কলকাতা থেকে ডিগ্রি নিয়ে তিনি চলে আসেন পূর্ববঙ্গে। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের জন্য। সেখানে এসে যে বৈষম্য দেখেন, তা তাঁকে বিচলিত করে। অন্যায়–‌অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক অধ্যায়, বাংলার মানুষকে কীভাবে মুক্ত করবেন শোষণ–‌বঞ্চনা থেকে। 
পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ববঙ্গের মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্র্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ মুজিব। এর ফলে বারবার কারাবরণ করতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু তিনি থাকেন তাঁর সঙ্কল্পে অটল। 
মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে জীবন দিয়েছে এদেশের মানুষ। শহিদের রক্তাক্ষরে লেখা হয়ে যায় যে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে চাই। রাজনৈতিক নেতা, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, জ্ঞানী গুণিজন অনেকেই বাংলার মানুষের মুক্তির কথা বলে গেছেন। চেয়েছেন এ ভূখণ্ডে স্বাধীনতা। 
সকলের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে বাংলার মানুষকে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপরিচয় এবং একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছেন যে ক্ষণজন্মা পুরুষ, তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
ছাত্রজীবন থেকেই এই বাংলার দরিদ্র–‌শোষিত–‌বঞ্চিত মানুষের দুঃখ–‌যাতনা তাঁকে নাড়া দিত। যে মানুষগুলি দিনের পর দিন একবেলা খাবার জোগাড় করতে পারত না, মাথা গোঁজার ঘর ছিল না, যেখানে মায়ের কোলে রোগেশোকে ধুঁকে ধুঁকে শিশুর মৃত্যু হত, এক ফোঁটা ওষুধ জুটত না, শরীরে হাড়–‌চামড়া ছাড়া কিছুই ছিল না, হাড্ডিসার কঙ্কালসম দেহ—  এসব বঞ্চিত–‌নিগৃহীত মানুষের মুক্তির দূত হিসেবে তাঁর আগমন ঘটেছিল। 
তাঁর জন্ম হয়েছিল বাঙালির মুক্তির জন্য, একটি স্বাধীন–‌সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য, বিশ্বসভায় একটা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালি জাতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তিনি সফল হয়েছেন।
স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার লক্ষ্যে তিনি চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। ‘‌বাংলার মানুষ অন্ন পাবে, বস্ত্র পাবে, উন্নত জীবন পাবে,’‌ — এই ছিল তাঁর প্রত্যয়।
বাংলার মানুষকে ক্ষুধা–‌দারিদ্র–‌বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি দিতে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন, যাতে স্বাধীনতার সুফল বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছতে পারে।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তখন ৮২% ভাগ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। তাদের দারিদ্রের কষাঘাত থেকে মুক্তি দিয়ে উন্নত জীবন নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। তাই তিনি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
গণবিপ্লবের পর প্রতিটি সমাজে ও দেশে একটা বিবর্তন আসে। যার ফলে সমাজের কিছু মানুষ হঠাৎ অর্থবিত্তের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। আবার যাঁরা সৎপথে জীবনযাপন করেন অথবা আগে থেকেই বিত্তশালী থাকেন, তাঁরা তাল মেলাতে পারেন না। তাছাড়া, বাংলাদেশে গেরিলাযুদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানিরা এবং তাদের হাতেগড়া দালাল— রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতায় শুধু করেনি, গণহত্যা, লুঠপাট, নারী নির্যাতন এবং অগ্নিসংযোগ–‌সহ নানা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা রাতারাতি ভোল পাল্টে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যায়। অনেকে সর্বহারা দল, চরমপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির সঙ্গে মিশে গিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে শুরু করে। স্বাধীনতার অর্জনকে ব্যর্থ করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয়। যে–‌কারণে তাদের দুটি রূপ ছিল। প্রকাশ্যে এক আচরণ আর অন্ধকারে চরম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে বিজয়কে ব্যর্থ করতে তারা ছিল মরিয়া। 
একদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলা, শহিদ পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসন, যুদ্ধাহতদের এবং নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, বিধবা–‌এতিমদের পুনর্বাসন–‌সহ যুদ্ধ–‌পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে একটা স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা, অন্যদিকে এসব অপশক্তিকে মোকাবিলা করা ছিল জাতির পিতার কঠিন দায়িত্ব।
যুদ্ধ চলাকালে কৃষকেরা খেতে কোনও ফসল ফলাতে পারেননি। খাদ্যগুদামে যেটুকু খাদ্যশস্য মজুত ছিল, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তা পুড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যাঙ্কে কোনও কারেন্সি নোট ছিল না। বলতে গেলে শূন্য হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন।
বন্ধুপ্রতিম দেশগুলি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। মুক্তিকামী মানুষ এবং আওয়ামি লিগের নেতা–‌কর্মীরা কোমর বেঁধে নামে দেশ গড়ার কাজে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি যেন মরুভূমিতে ফুল ফোটান। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করেন। কিন্তু তারপর বারবার বাধা আসতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। যার আঘাত বাংলাদেশে এসে পড়ে। আর এই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী কিছু সরকারি কর্মচারী ও লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতাবিরোধীরা তৎপর হয়ে উঠে। নির্বাচিত সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে আওয়ামি লিগ, ছাত্র লিগ–‌সহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে হত্যা শুরু করে। ইদের জামাতে নামাজ পড়া অবস্থায় কুষ্ঠিয়ার সংসদ সদস্য জনাব কিবরিয়াকে হত্যা করে। এভাবে আরও সংসদ সদস্য এবং আওয়ামি লিগ নেতাদের ওপর আঘাত আসে। এমনকী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠপুত্র মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন ছাত্রকে হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় থানা লুঠ, পাটের গুদামে আগুন দেওয়া। তারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। 
খাদ্য জাহাজ ফিরিয়ে দিয়ে দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি করা হয়। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে অনেকেই সম্পৃক্ত ছিল। একজন সচিব যে খাদ্যশস্যের দায়িত্ব ছিল, তাকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী সামরিক শাসকদের সরকারে সে মন্ত্রিত্ব পায়। দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে মানুষ মারার জন্য পুরস্কৃত হয় সে। 
দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একদিকে এসব দেশদ্রোহীকে দমন করে সমাজে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, অপরদিকে দ্রুত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। 
দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার সপক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন যার নাম দেন ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামি লিগ’।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করার জন্য ১৯টি জেলার মহাকুমাগুলিকে জেলায় রূপান্তরিত করে ৬০টি জেলা গঠন করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনকে ঢেলে সাজান। জেলা গভর্নর নিয়োগ করেন, তাঁদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেন। স্ব স্ব জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন।
জনগণের ভোটের অধিকার সুরক্ষিত করার লক্ষ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন তিনি। এ ব্যবস্থায় নির্বাচনে যাঁরা প্রার্থী হবেন, তাঁদের কোনও অর্থ ব্যয় করতে হবে না। রাষ্ট্র তা বহন করবে। একই পোস্টারে সকল প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হবে। প্রার্থীরা লিফলেট, পুস্তিকা ছাপতে পারবেন, ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইতে পারবেন। ভোটের মালিক জনগণ। তার সুরক্ষা করা এবং গণতন্ত্র চর্চা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই ছিল এই পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য, যাতে অর্থ ও অস্ত্র যেন নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি হয়ে না উঠে। একজন সৎ, দেশপ্রেমিক মানুষ যেন নির্বাচিত হয়ে দেশ গড়ায় অবদান রাখতে পারেন, সে ব্যবস্থাই তিনি করে গিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‌আমার মানুষ আছে, মাটি আছে— এই দিয়েই দেশ গড়তে পারব।’‌ মাটি ও মানুষকে নিয়েই তিনি দেশ গড়তে  শুরু করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এর সুফল মানুষ পেতে শুরু করে।
আর সে সময় দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি যখন ৭ ভাগের ওপরে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদাপ্রাপ্ত, বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছে আশার আলো, তাঁরা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, আর তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট চরম আঘাত হানল শত্রুরা।
কী ঘটেছিল সেদিন?
৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলির আওয়াজ। কামাল নীচে নেমে আসে। সামনে অতি পরিচিত সেনা অফিসার। কামাল কেবল বলতে শুরু করেছে: ‘‌আপনারা এসে গেছেন, দেখুন কারা যেন বাড়ি আক্রমণ করেছে?’‌ কথা শেষ হতে না হতেই এক ঝাঁক গুলি; কামাল লুটিয়ে পড়ল সামনের বারান্দায়।
খুনিরা উঠে গেল দোতলায়। সেই চেনামুখ সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জিজ্ঞেস করলেন: ‘কী চাস তোরা?’ চিনেছিলেন ঘাতককে। জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘তুই না ... নেতার ছেলে?’ সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়ে মোসলেমউদ্দীন ও নুর চৌধুরি। সক্রিয় হয়ে উঠে ঘাতকদের অস্ত্র। সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়লেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাংলার দুঃখী মানুষের কান্ডারি। 
বেগম মুজিব ছুটে এলেন বঙ্গবন্ধুর আওয়াজ শুনে। গুলি করে তাঁর বুকও ঝাঁঝরা করে দেয় নরপিশাচরা। তাঁকে ঘাতকেরা বলেছিল: ‘আপনি চলেন আমাদের সঙ্গে।’ তিনি বলেছিলেন: ‘আমি কোথাও যাব না। তাঁকে মেরেছ, আমাকেও মার, আমি এক পা–‌ও নড়ব না।’‌ এই সাহসী উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে খুনিরা অস্ত্র চালায় তাঁর ওপর। এরপর শেখ জামাল ও তার নবপরিণীতা স্ত্রী পারভিন জামাল রোজি এবং শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামালকে হত্যা করে। রাসেলকে নিয়ে গৃহকর্মী রমা (রহমান) নীচে নেমে যায়। রাসেল কাঁদছিল ‘মায়ের কাছে যাব, মায়ের কাছে যাব বলে।’ একজন ঘাতক বলে: ‘চলো তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই।’‌ সে রাসেলকে ওপরে নিয়ে যায় বাবা–‌মা–‌ভাইয়ের লাশ ডিঙিয়ে। ওই ছোট্ট শিশুটির মনের কী অবস্থা হতে পারে? তাকে গুলি করে শেষ করে দেয়। অপর গৃহকর্মী আবদুল (সেলিম), সে–‌ও গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশ অফিসার এএসপি-এসবি ঘাতকদের ওপরে যেতে বাধা দিয়েছিলেন। তাঁকে তারা হত্যা করে। গুলির আঘাতে আহত হয় আরেক পুলিশ কর্মকর্তা।
বঙ্গবন্ধুর মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিল ছুটে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের খবর পেয়ে। মিরপুর রোডের ওপরই গাড়ির ভিতরে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে।
একদল সেনা আক্রমণ করে আমার মেজ ফুফুর ধানমন্ডির বাসা অর্থাৎ শেখ মণির বাড়ি। সেখানে ঘাতকেরা শেখ মণিকে গালি দিতে দিতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে। তাঁর দিকে অস্ত্র তাক করে। ঠিক সে সময় ছুটে আসে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি। দুজনই ঘাতকের বুলেটে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।
মিন্টু রোডে আমার সেজ ফুফা আবদুর রব সেরনিয়াবাতের সরকারি বাড়ি আক্রমণ করে একদল আর্মি। গুলি করতে করতে তারা বাড়ির দোতলায় মন্ত্রীর শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে। সেখানে পরিবারের সদস্যরা জড়ো হয়েছিল। ঘাতকেরা তাদের নীচে নামিয়ে আনে ড্রইং রুমে। তারপর ব্রাশফায়ার করে। একবার গুলি চালিয়ে বের হয়ে যায়। সকলের মৃত্যু নিশ্চিত করতে দ্বিতীয়বার এসে গুলি করে। সেখানে তারা হত্যা করে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর মেয়ে বেবি (১৩), ছেলে আরিফ (১০), নাতি সুকান্ত (৪), ভ্রাতুষ্পুত্র শহিদ সেরনিয়াবাত, ভাগনে নঈমউদ্দিন রিন্টুকে। 
নারী গৃহকর্মী ও তার ছোট ছেলে পোটকা, আমার ফুফু হেলেন, তাঁর মেয়ে বিউটি, বীণা, ছেলে খোকন, পুত্রবধূ সাহানা গুলিবিদ্ধ হয়। নাতনি কান্তা (৭) গুলিবিদ্ধ লাশের নীচে চাপা পড়ে বেঁচে যায়। কামরার মেঝে রক্তে ভেসে যায়। 
ওই কামরায় একটা অ্যাকুরিয়াম ছিল। যেখানে রঙিন মাছ ভেসে বেড়াত। গুলির আঘাতে অ্যাকুরিয়াম ভেঙে পানি মেঝেতে গড়িয়ে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। আর মাছগুলি ওই রক্তমেশা পানিতে ছটফট করতে থাকে। গুলি খাওয়া মানুষগুলি যাঁরা তখনও বেঁচে ছিলেন, তাঁরাও একইভাবে ছটফট করছিলেন। ছোট্ট শিশু কান্তা মৃতস্তূপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসে অবাক বিস্ময়ে একবার আপনজনের লাশ আরেকবার সেই রক্তে ভেজা মেঝেতে রঙিন মাছের দৃশ্য দেখে বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে এক বীভৎস দৃশ্য!
ঘাতকের দল উল্লাস করতে করতে বেরিয়ে যায়। এরপর রেডিও স্টেশন থেকে ঘোষণা: ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’
যাঁর হাত ধরে একটি দেশের সৃষ্টি, সে দেশের মানুষের হাতেই তাঁর মৃত্যু হল। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হল। সেই মানুষগুলিকে তিনি ভালবাসা দিয়েছিলেন অকাতরে। যাদের অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর বাড়িতে। 
ঘাতকেরা এখানেই থেমে থাকেনি। জাতির পিতাকে হত্যার পর শুরু হয় অপপ্রচার। নিজেদের কুকীর্তি ঢাকার জন্যই এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হল এই অপপ্রচার।
শুরু হয় বিকৃত ইতিহাস প্রচার। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলা হল। যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে, যে চেতনার অগ্নিমশাল জ্বালিয়ে শত্রুদের পরাস্ত করা হয়েছিল, সেই পরাজিত শক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধীরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় সমাসীন হল। 
‘শেখ মুজিব’, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ হল বাংলাদেশে। এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশ। সুবিধাবাদীরা ঘাতকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় পরাজিত শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়, যে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ নয় বরং পাকিস্তানের একটা প্রদেশ।
‘স্বাধীনতা পছন্দ নয়, গোলামি করতেই মন চায়’— এই বিকৃতমনারা হল দেশের কর্ণধার, যা দেশের জন্য, জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর ঘটনা। যে সামরিক জুন্টার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল বাঙালি জাতি, সেই লাখো শহিদের রক্তের সঙ্গে চরম বেইমানি করা হল। জানি না মানুষ নিজের অর্জনকে এভাবে বিসর্জন দিতে পারে কীভাবে?
ঘাতকদের ও তাদের দোসরদের ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ভেদ করে বাংলাদেশ আজ জেগে উঠেছে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এই বাংলাদেশ আজ পালিত হচ্ছে আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। বছরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। 
২০২০ এবং ২০২১, বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নিয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তাঁরই হাত ধরে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ বছর ১৭ মার্চ পূর্ণ হয়েছে তাঁর জন্মের একশো বছর। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূরণ হবে। তাই ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬–‌এ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে উদযাপনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের কর্মসূচি। সকল শ্রেণি–‌পেশার মানুষ এই আনন্দ উৎসবের আয়োজন করছে। ইউনেসকো জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি অমর হয়ে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায়। কবিগুরুর ভাষায়: “নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দানক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”
 

জনপ্রিয়

Back To Top